আজ সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি পর্তুগাল: জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় সি-আর সেভেন
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২ । আপডেট ১২:৪৫
কাতার বিশ্বকাপে আজ অল-ইউরোপীয়ান ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। আসরে টিকে থাকতে হলে এ ম্যাচে জ্বলে উঠতে হবে রোনালদোকে। আসরে এখনও নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি সিআরসেভেন। তাই আজ তার জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় পর্তুগিজ ভক্তরা। বিস্তারিত লিখেছেন আবদুল্লাহ সিফাত
চাপমুক্ত থাকতে চায় পর্তুগাল: জার্মানি বিশ্বকাপে চতুর্থ হওয়া পর্তুগাল এবার রোনালদোর জন্য অন্তত শেষ চেষ্টাটা করতে চায়। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে ইউসেবিওর পর্তুগাল তৃতীয় হয়েছিল। কিন্তু কখনই বিশ্বমঞ্চের ফাইনালে ওঠা হয়নি। শেষ তিনটি আসরের দুটিতেই নকআউট পর্বের ম্যাচেই বিদায় ঘটেছিল। দলের গোল মেশিন খ্যাত রোনালদোর ফর্ম ও ফিটনেস নিয়ে শুরু থেকেই শঙ্কা নিয়ে বিশ্বকাপে এসেছে পর্তুগাল। নক আউট পর্বে পরিচিত প্রতিদ্ব›দ্বীর বিরুদ্ধে কোন চাপ নিয়ে খেলতে চায়না সান্তোসের দল। সর্বশেষ এ বছরের শুরুতে উয়েফা নেশন্স লিগে সুইসদের মোকাবেলা করেছিল পর্তুগাল। লিসবনের ম্যাচে পর্তুগাল দাপটের সাথে ৪-০ গোলে জয়ী হয়েছিল, যে ম্যাচটিতে রোনাল্ডো প্রথমার্ধে দুই গোল করেছিলেন। হেড টু হেড পরিসংখ্যানে পর্তুগিজদের চেয়ে এগিয়ে সুইসরা। ১১ বার পর্তুগিজদের হারিয়েছে সুইজারল্যান্ড। পর্তুগালের জয় ৯টি, বাকি ৫ ম্যাচ ড্র। তবে শেষ দুই সাক্ষাতে একটি করে জয় তাদের। দুই দলের সবশেষ দেখা উয়েফা নেশন্স লীগে, গত জুনে। লিসবনে সুইজারল্যান্ডকে ৪-০ গোলে হারায় পর্তুগাল। সপ্তাহ খানেক পর জেনেভায় সুইসরা জেতে ১-০ গোলে। বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত একটায় লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে।
সুইসদের বিপক্ষে খেলবে পর্তুগালের মূলদল: বিশ্বকাপে চোট সমস্যা বেশ ভোগাচ্ছে পর্তুগালকে। শেষ ষোলোয় সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে লড়াইয়ের আগে চোটে বাইরে থাকা ওতাভিওকে নিয়ে সুসংবাদ পেল দলটি। সব ঠিক থাকলে এ ম্যাচে খেলতে পারেন এই মিডফিল্ডার। ঊরুর চোটে বাইরে আছেন ওতাভিও। মিস করেছেন উরুগুয়ে ও দক্ষিণ কোরিয়া ম্যাচ। এ ম্যাচে তার ফেরারও সম্ভাবনা রয়েছে। অনুশীলনে পাঁজরের তিনটি হাড় ভেঙে যাওয়ায় উরুগুয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে যান ডিফেন্ডার দানিলো পেরেইরা। এজন্য খেলতে পারেননি দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষেও৷ এই দুই ম্যাচে পেরেইরার জায়গায় অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার পেপেকে খেলান কোচ ফের্নান্দো সান্তোস। সুইসদের বিপক্ষে আজকের ম্যাচেও তিনি জায়গা ধরে রাখবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডিফেন্সে পেপের সঙ্গে জুঁটি বাধবেন ম্যানচেস্টার সিটি সেন্টার-ব্যাক রুবেন দিয়াস। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলে হারের ম্যাচে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল তাকে। উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে পাওয়া চোটে নুনো মেন্দেস টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যান। লেফট ব্যাক-পজিশনে তাই পরিবর্তন আনতে বাধ্য হন কোচ সান্তোস।

কোচ সান্তোসের স্পষ্টবার্তা-ভাবনায় বিশ্বজয়: পর্তুগাল কোচ ফের্নান্দো সান্তোস দলের বিশ্বকাপ ভাবনা নিয়ে দিয়েছেন স্পষ্টবার্তা। তিনি বলেছেন, বিশ্বকাপে শতভাগ মনোযোগ দিচ্ছি আমরা। আমাদের করণীয় সম্পর্কে সবাই সচেতন। আমরা এমন একটি চ্যাম্পিয়নশিপে আছি যা প্রতিটি খেলোয়াড়ের স্বপ্ন এবং এটি এমন একটি টুর্নামেন্ট যেখানে প্রতিটি খেলোয়াড় খেলতে চায়। তিনি আরও বলেন, আমাদের বিশ্বজয়ের উচ্চাকাক্সক্ষা রয়েছে। আমি এতটুকু বিশ্বাস করি যে আমাদের এটির জন্য লড়াই করার সক্ষমতা আছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে হারার পর তিনি দলের পারফরম্যান্স নিয়ে বলেন, আমরা চিন্তিত। ভাল ফুটবল খেলতে চেয়েছিলাম, যাতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। যদিও আত্মবিশ্বাস এখনও হারায়নি। এই দল আরও দূরে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু ওই হার আমাদের কাছে একটা বিরাট সতর্কবার্তা।
ইতিহাস গড়তে চাই আর মাত্র দুই গোল: ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপটা শুরু করেছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ইতিহাসে যে আর কখনো কোনো খেলোয়াড়ের টানা পাঁচ বিশ্বকাপে গোলের নজির ছিল না! রোনালদো সেই রেকর্ডটাই গড়েপণন এবার ঘানার বিপক্ষে গ্রæপ পর্বেই। এই রেকর্ড কেবলই তার। এবার নিজেকে আরও ওপরে নিয়ে যাবেন আর একটি গোল পেলেই। বিশ্বমঞ্চে পর্তুগালের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোল করেছেন ইউসেবিও। এই কিংবদন্তি ৯টি গোলই করেছিলেন ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে। ওই একটি আসরেই খেলেছিলেন তিনি। বিশ্বকাপে রোনালদোর রয়েছে ৮ গোল। আজ একটি গোল করলে তাকে স্পর্শ করবেন সিআরসেভেন। আর দুটি গোল করলে ইতিহাস গড়বেন এই সুপারস্টার। এই পর্তুগিজ স্ট্রাইকার গত তিনটি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একটিও গোল করেননি। এবারের বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত তার গোল সংখ্যা ১টি, যা তার নামের সঙ্গেও বেমানান। আর তাই আজ চাইবেন সেই অপূর্ণতা যেন পূর্ণ হয়। সিআরসেভেন যে নকআউটের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নিজেকে মেলে ধরতে চাইবেন সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সমালোচকদের ধুয়ে দিলেন রোনালদো: পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে নিয়ে সমালোচনার যেন শেষ নেই। এছাড়াও নানা বিতর্ককে সঙ্গি করেই মাঠে নামেন এই সুপারস্টার। তবে এবারের বিশ্বকাপ আসরে সমালোচকের তুলোধুনা করতে ছাড়েননি তিনি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যা সমালোচনা করার, প্রশ্ন করার, আমায় করুন, আমি বুলেটপ্রুফ, আমি লোহার বর্ম পরে থাকি, সমালোচনা আমার গায়ে লাগে না। কিন্তু আমার সতীর্থদের আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে প্রশ্ন করে তাদের বিব্রত করবেন না। আমরা বিশ্বকাপে ভালো ফল করার লক্ষ্য নিয়ে এসেছি। সেদিকেই সকলে লক্ষ্য স্থির। তিনি বলেন, অন্যরা আমাকে নিয়ে কী ভাবে, এ নিয়ে আমি দুশ্চিন্তা করি না। আমি যখন চাই, কথা বলি। সবাই জানে আমি কে, কী বিশ্বাস করি। ধারণা করা হচ্ছে কাতার বিশ্বকাপই রোনালদোর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে পর্তুগালের জার্সিতে তাকে নাও দেখা যেতে পারে। ৩৭ বছর এই তারকা আরও বলেন, আমি যখন চাই, কথা বলি। আসলে ক্রিস্টিয়ানোর চারপাশে থাকা সবকিছু নিয়েই বিতর্ক তৈরি হয়। কিন্তু তিনি বারবার বলেছেন দলের সবার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক। এদিকে, পর্তুগিজ সংবাদপত্র ‘এ বোলা-র’ এক জরিপ বলছে, সুইসদের বিপক্ষে শুরুর একাদশে রোনালদোকে খেলাতে চান স্রেফ ৩০ শতাংশ। বাকি ৭০ শতাংশ মনে করছেন, বদলি নামা উচিত এই ফরোয়ার্ডের। একটা সময় গোলের বন্যা বইয়ে চলা, রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়া রোনালদো এখন আর সেরা ছন্দে নেই, এটা পরিষ্কার। বয়সের ভার তাকে জেঁকে ধরেছে। আর এই বয়সে এটা স্বাভাবিকই। এটাই রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ, এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি পর্তুগালের হয়ে তার অধ্যায়ের সমাপ্তিও দেখে ফেলছেন অনেকে।

বাংলাদেশের জন্যও ভালোবাসা, শুভকামনা: বাংলাদেশকে চেনেন ও লাল-সবুজ দেশ সম্পর্কে ভালো খবরই রাখেন পর্তুগিজ তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। গত সেপ্টেম্বর মাসে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে নৈশভোজে বাংলাদেশি শেফের হাতে পিৎজা খেয়ে ফটোসেশনের সময় কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, আই নো বাংলাদেশ, আই লাভ বাংলাদেশ।অভিজাত রেস্টুরেন্টটির শেফ ইসমাইল হোসাইন রায়হান গণমাধ্যমকে জানান, তিনি সিআরসেভেনকে বলেছিলেন যে তিনি একজন বাংলাদেশি, বাংলাদেশে তার (রোনালদোর) অসংখ্য ভক্ত রয়েছে। এর উত্তরে পর্তুগিজ সুপারস্টার জানিয়েছেন, আমি জানি। আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি। তোমরা খুবই পরিশ্রমী। শুভকামনা রইলো। ইসমাইল আরও জানান, রোনালদো নিজ কণ্ঠে তাদের গান শুনিয়েছিলেন। প্রায় ৫ ঘণ্টা মনে হলো জীবনের একটা অসাধারণ মুহূর্ত কাটালাম। তিনি আর জানান, রোনালদোর আগমনে তারা ব্যাপক নার্ভাস ছিলেন।কেননা তার সিকিউরিটি ও মুখে স্বাদ লাগানো ছিল আমাদের মুখ্য বিষয়।
ইউডি/এজেএস

