উচ্চশিক্ষা নিয়ে নতুন ফতোয়া: তালেবানের রোষানলে নারী অধিকার
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৩:৩৫
আফগানিস্তানে নারীদের স্বাধীনতা, অগ্রযাত্রা ও বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে শেটির কট্টরপন্থি তালেবান সরকার। উচ্চশিক্ষা নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে তারা এবার নারীদের মৌলিক অধিকারেও হস্তক্ষেপ করলো। তালেবানের রোষানলে পড়েছে দেশটির নারী অধিকার। এ নিয়ে সাদিত কবিরের বিশ্লেষণ
প্রতিশ্রুতি দিয়েও রক্ষা করে নি তালেবান: ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর নারীদের বিভিন্ন রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তালেবান। কিন্তু সময় যতই এগোয় তাদের নিষেধাজ্ঞার তালিকা ততই বাড়ে। তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি সব মিথ্যা প্রমাণিত হয়। প্রথমে নারীদের মাধ্যমিক শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় তারা। এরই ধারাবাহিকতায় এবার উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা জারি করলো কট্টরপন্থি তালেবান। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীদের নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে তালেবান বলেছে, ‘জাতীয় স্বার্থ’ ও ‘সম্মান’ বজায় রাখতে এমনটি করা হয়েছে। তালেবানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আর কোনো নারী শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা বিবিসি বুধবার (২১ ডিসেম্বর) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তালেবান শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষা কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে একটি চিঠি ইস্যু করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় চিঠিতে জানিয়েছে, তাদের এ সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক কার্যকর করা হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে না। আফগানিস্তানে আবারও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদ শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা করে তালেবান। এছাড়া নারী শিক্ষার্থীদের শুধুমাত্র নারী ও বৃদ্ধ প্রফেসররা লেকচার দিতে পারবেন এমন নিয়ম জারি করে। এবার সেই বিধিকে আরও কঠিন করে নারী শিক্ষাকেই নিষিদ্ধ করলো তারা। প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট আশরাফ গনিকে হটিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসে তালেবান।
আমেরিকার হুঁশিয়ারি-পরিণাম ভালো হবে না: আফগানিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী শিক্ষা নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে আমেরিকা। একইসঙ্গে এই সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে আফগানিস্তানের কট্টরপন্থি শাসকগোষ্ঠীকে (তালেবান) ভয়াবহ পরিণাম ভোগেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটি। বুধবার (২১ ডিসেম্বর) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে ইন্ডিয়ান বার্তাসংস্থা পিটিআই।
আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন বলেছেন, বিতর্কিত এই সিদ্ধান্ত আফগানিস্তানের কট্টরপন্থি শাসন ব্যবস্থার জন্য ‘পরিণাম’ নিয়ে আসবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নারীদের নিষিদ্ধ করার, মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখার এবং আফগানিস্তানে নারী ও মেয়েদের তাদের মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা প্রয়োগ করার ক্ষমতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা নিয়ে তালেবানের অযোগ্য সিদ্ধান্তের কঠোর নিন্দা জানাচ্ছে আমেরিকা।জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই সিদ্ধান্তে ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’ বলে জানিয়েছেন তার মুখপাত্র। এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেছেন, এ ঘোষণা স্পষ্টতই তালেবানদের আরেকটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ। তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে শিক্ষাসহ জনপরিসরে নারীদের জায়গা ছোট হয়ে আসছে। এছাড়া অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) তালেবানের এই নিষেধাজ্ঞার নিন্দা করে বলেছে, এটি ‘সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে নষ্ট করছে’।

ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের রাস্তায় বিক্ষোভ: উচ্চশিক্ষা তথা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হারিয়ে আফগান নারী শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নারীশিক্ষার অধিকারের াবিতে রাস্তায় নামে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা তারে অধিকার হারিয়ে তালেবান শাসকদের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানান। নারী শিক্ষার্থীরা বার্তা সংস্থাকে জানান, মনে করেন, তালেবান নারী ও নারীর শক্তিকে ভয় পায়। তারা আরও জানান, নারীদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিচ্ছে তালেবানরা।
ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারি? আমরা বিশ্বাস করতাম যে পড়াশোনা করে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করতে পারব, জীবনে আলো আনতে পারব। কিন্তু তারা তা ধ্বংস করে দিয়েছে। তালেবানের ক্ষমতা খলের পর আফগানিস্তানের শিক্ষা খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত বছর আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তান ছাড়ার পর শেটির প্রশিক্ষিত অনেক শিক্ষাবিদ দেশত্যাগ করেন।

নারীরা আরও বলেছেন, তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর শুধু পড়াশোনা চালিয়ে নিতেই অনেক অসুবিধার মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। নারীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বিবিসির ক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি ইয়োগিতা লিমায়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ধারণা করা হচ্ছিলো যে, তালেবান সরকার নারীরে জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা নিষিদ্ধ করবে। আর এবার তাই সত্যি হলো। গত মাসে (নভেম্বর) নারীদের পার্ক, জিম এবং সুইমিং পুল থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আফগান নারীরা জানিয়েছেন, তাদের একটি আশার আলো ছিল, যা এখন নিভে গেছে।
ইউডি/এজেএস/সুস্মিত

