ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত: নতুন বছরেও কতটা পোড়াবে বিশ্বকে?
দেলোয়ার হোসেন । শুক্রবার , ০৬ জানুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ০৭:৩০
২০২২ সাল শুরু হয়েছিল কোভিড-উত্তর বিশ্বের স্বপ্ন নিয়ে, যেখানে দেশগুলো করোনার ভয়াবহতা থেকে বের হয়ে আসার আশা করছিল। ভ্যাকসিন আবিষ্কার থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে বিশ্ব একটি সুশৃঙ্খল অবস্থায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। বস্তুত, কোভিড-পরবর্তী আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বকে করোনার ভয়াবহতাকে পেছনে ফেলে একটি ইতিবাচক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক আক্রমণের ফলে বিশ্ব একটি বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়। বিশ্ব ২০২২ সালের শুরু থেকেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে এক মহাসংকটে পতিত হয়।
সব মিলে ২০২২ সালকে বলা যায় মহাসংকটের বছর। সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে বৈশ্বিকভাবে এত ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোরিয়া যুদ্ধ হয়েছে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ হয়েছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে গৃহযুদ্ধ এবং নানা ধরনের সামরিক সংঘাত ও উগ্রবাদ আমরা দেখেছি। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকটও আমরা দেখেছি। বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধকালীন দুই পরাশক্তির মধ্যে যে উত্তেজনা ও বৈরিতা ছিল, সেটাকে বর্তমান সময়ের সংকটের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী কখনোই এতটা ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেনি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বকে একটি অনিবার্য পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর বিশ্বজুড়েই যে একটি সংকট উপস্থিত হতে যাচ্ছে এবং অর্থনীতির ওপর আঘাত আসতে পারে, সে উত্তাপ আগেই পাওয়া গিয়েছিল। ইউক্রেন যুদ্ধের পক্ষ হিসাবে আমরা যদি রাশিয়ার বিপরীতে পশ্চিমা বিশ্বকে দেখি, তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, এ যুদ্ধ একটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতোই ঘটনা। কারণ পশ্চিমা বিশ্ব ব্যাপক শক্তি দিয়ে রাশিয়াকে মোকাবিলা করছে এবং সেখানে আমরা জি-সেভেন, ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরব ভূমিকা দেখতে পাই। ফলে দেখা যাচ্ছে, ঐক্যবদ্ধ পশ্চিমা বিশ্বের বিপরীতে রাশিয়া একটি পক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া তার সামরিক শক্তি পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করছে। একইভাবে পশ্চিমা শক্তি রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে ব্যাপকভাবে সামরিক সাহায্য দিচ্ছে। এ বাস্তবতায় ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে এবং ২০২২ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নজিরবিহীনভাবে সমগ্র বিশ্বকে প্রভাবিত করছে।
এ যুদ্ধের কারণে বিশ্বে অনেক ধরনের নতুন প্রবণতা আমরা লক্ষ করছি। একদিকে নতুন করে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা, সামরিকীকরণ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকট। ফলে বিশ্বের বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা, অবিশ্বাস ও অসহযোগিতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বে নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে। এই মেরুকরণের একদিকে রাশিয়া ও চীন, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্ব। তবে নিরাপত্তার জন্য শুধু পশ্চিমা বিশ্ব বা রাশিয়া নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব সামরিকীকরণের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এ যুদ্ধ একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য। অর্থনৈতিক সংকটের অগ্রভাগে রয়েছে জ্বালানি সংকট, খাদ্য সংকট, মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং সাপ্লাই চেইন প্রায় ভেঙে পড়া। ২০২২ সালে আমরা দেখতে পেয়েছি, অর্থনীতির সূচকগুলো ক্রমান্বয়ে নিুগামী হয়েছে।
গত বছরের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নতুন বছরেও অধিকাংশ ঘটনা চলমান থাকবে। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধের শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। তাইওয়ান সংকট সমাধানের কোনো লক্ষণ নেই। ২০২৩ সালে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যকার যে প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বৈরিতা, তা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। নতুন করে একটি স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হওয়ার যে প্রবণতা, সেটির ভিত্তি ২০২২ সালে তৈরি হয়েছে এবং ২০২৩ সালে আমরা বলতে পারি স্নায়ুযুদ্ধ নতুন মাত্রা পেতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, যেহেতু বিশ্ব পূর্ণাঙ্গভাবে একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে, সেহেতু বৈশ্বিক যে ঘটনাগুলো মানুষ ও রাষ্ট্রগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, সেখান থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা ২০২৩ সালে চলমান থাকবে। এর অংশ হিসাবে ইউক্রেন যুদ্ধ সমাপ্ত করার জন্য পশ্চিমা বিশ্ব ও রাশিয়ার মধ্যে শান্তি আলোচনা অথবা যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা শুরু হতে পারে। একইসঙ্গে অনেক দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বিশেষ করে ভারত ও চীনের মধ্যকার বৈরিতা ও প্রতিযোগিতা কিছুটা হ্রাস পেতে পারে এবং সীমিত সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তবে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, ২০২৩ সালে ভূ-রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীনের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক শক্তি প্রদর্শন নীতি নতুন করে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের দূরত্ব আরও বৃদ্ধি করতে পারে। ফলে ২০২৩ সালেও বিশ্ব একটি সামরিক উত্তেজনা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, মেরুকরণ ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে পারে।
লেখক: অধ্যাপক, সমাজ গবেষক।
ইউডি/কেএস

