পরাক্রমশালী কাতারে ইন্ডিয়ার অবস্থান দৃঢ় করার বার্তা
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১৩:১০
আগামী সেপ্টেম্বরে ইন্ডিয়ায় জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এরই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আজ থেকে দেশটিতে শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী ‘ভয়েস অব দ্য গ্লোবাল সাউথ সামিট’। প্রথমবারের মত অয়োজিত এই সম্মেলনে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত ১২০ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিনিধিরা ভার্চুয়ালি অংশ নেবেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সামিটের মাধ্যমে বিশ্বের বড় একটি অংশকে নেতৃত্ব দিয়ে পরাক্রমশালীদের কাতারে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার বার্তা দিতে চায় ইন্ডিয়া। এ নিয়ে আসাদ এফ রহমানের প্রতিবেদন
মোদি সরকারের নয়া কূটনীতি: ‘একই উদ্দেশ্য, একত্রিত কণ্ঠস্বর’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এই সামিটের আয়োজন করছে ইন্ডিয়া। এক বিবৃতিতে দেশটি জানায়, সামিটের মূল উদ্দেশ্য এশিয়া, আফ্রিকা লাতিন আমেরিকাসহ গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে একত্রিত করা। ‘সবার সঙ্গে, সবার উন্নয়ন, সবার বিশ্বাস, সবার চেষ্টা’ নরেন্দ্র মোদির এমন প্রতিপাদ্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই সামিটের আয়োজন করা হচ্ছে। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘গ্লোবাল সাউথ’ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলোর অধিকাংশই রাশিয়ার উপরে চাপানো আমেরিকা এবং ইউরোপের নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করে না। তারা ইউক্রেনে শান্তি ফেরাতে ইন্ডিয়ার মতোই সংলাপ এবং কূটনীতির পথে চলায় বিশ্বাসী। বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, এখানেই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে চাইছে ইন্ডিয়া। সম্প্রতি অস্ট্রিয়া সফরে গিয়ে ভিয়েনা থেকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছিলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বাইরেও অনেক সমস্যা রয়েছে বহু দেশের, যা ইউরোপ বা আমেরিকা কানে তোলে না। রাশিয়া যুদ্ধে নিরপেক্ষ কূটনীতির সাবধানি রাস্তায় থাকা নরেন্দ্র মোদী সরকার এবার চাইছে জি-২০-র মঞ্চে বিশ্বের এই বিশাল অংশকে (সাউথ) নিজেদের সঙ্গে রাখতে, আর তাতে ইন্ডিয়ার নিজস্ব রাশিয়া-ইউক্রেন নীতিকে আরও পোক্ত করবে।

সমৃদ্ধির রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা: মূলত দু-দিনের এই সম্মেলনের রাষ্ট্রপ্রধানদের গুরুত্বপূর্ণ ২২টি বিষয়ে আলোচনা হবে। সামিটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। শেখ হাসিনা ছাড়াও শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেও এই সামিটে যোগ ভার্চুয়ালি যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান ছাড়া অন্য সব দেশকে কোনও না কোনও পর্যায়ে ইন্ডিয়া আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তবে তার সবগুলো সরকারপ্রধান পর্যায়ে নয়। এছাড়াও সামিটে ৮টি মন্ত্রী পর্যায়ের অধিবেশন হবে। এগুলো হলো- অর্থমন্ত্রীদের অধিবেশনে থাকবে ‘জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়নে অর্থায়ন’ আলোচনা। পরিবেশ মন্ত্রীদের অধিবেশনে থাকবে ‘পরিবেশ বান্ধব লাইফস্টাইলের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখা। পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের অধিবেশনে থাকবে ‘গ্লোবাল সাউথের অগ্রাধিকার- একটি উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা’। জ্বালানি মন্ত্রীদের অধিবেশনে থাকবে ‘শক্তি নিরাপত্তা ও উন্নয়ন- সমৃদ্ধির রোডম্যাপ’ আলোচনা। স্বাস্থ্যমন্ত্রীদের অধিবেশনে আলোচনা হবে ‘স্থিতিস্থাপক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহযোগিতা’। শিক্ষামন্ত্রীদের অধিবেশনে আলোচনা হবে ‘মানব সম্পদ উন্নয়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি’। বাণিজ্যমন্ত্রীদের অধিবেশনে আলোচনা হবে ‘গ্লোবাল সাউথ-বাণিজ্য, প্রযুক্তি, পর্যটন এবং সম্পদে উন্নয়নশীল সমন্বয়’ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের অধিবেশনে ‘জি-২০: ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্সির জন্য প্রস্তাবনা’ নিয়ে আলোচনা হবে।
‘গ্লোবাল সাউথ’ নতুন মঞ্চ: জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে ‘ভয়েস অব দ্য গ্লোবাল সাউথ সামিট’ এই বিষয়টি নিয়ে আমেরিকা এবং ইউরোপ নয়াদিল্লির উপরে প্রবল চাপ তৈরি করবে এটা স্পষ্ট। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়া, আফ্রিকার দেশগুলোকে নিজেদের সঙ্গে রাখতে চাইছে সাউথ ব্লক। মূলত বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ইন্ডিয়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনও আমেরিকা-ইউরোপ, চীন, রাশিয়া থেকে অনেকটাই পিছিয়ে। কিন্তু তাদের নয়া এই পদক্ষেপে উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশগুলো ইন্ডিয়ার পক্ষে অবস্থান করলে পরাক্রমশালী দেশগুলোর কাছে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করবে মোদি সরকার। বিশ্বের উন্নয়নশীল আর স্বল্পোন্নত দেশগুলো এবং যেখানে অর্থনৈতিক ও শিল্পোন্নয়নের হার তুলনায় কম, সেই দেশগুলোকেই বোঝানো হয় ‘গ্লোবাল সাউথ’। আর এই সাউথ ব্লকের নেতৃত্ব দিয়েই বিশ্বে নিজেদের প্রচারের নয়া মাত্রা খোঁজার উদ্যোগ নিলো দেশটি।

যেহেতু ভৌগোলিকভাবে মূলত লাতিন আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা বা ওশেনিয়ার দেশগুলো আমেরিকা বা ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলোর দক্ষিণে অবস্থিত, তাই এই ধরনের নামকরণ। সামিটে বাকি দেশগুলোর মধ্যে আফ্রিকান ইউনিয়নের পাঁচটি দেশ অ্যাঙ্গোলা, ঘানা, নাইজেরিয়া, মোজাম্বিক, সেনেগাল, আসিয়ান জোটের তিনটি দেশ থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম এবং উজবেকিস্তান, মঙ্গোলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পাপুয়া নিউগিনির সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানরা এই সম্মেলনে অংশ নেবেন।
ইউডি/সুপ্ত/কেএস

