অবৈধ উপায়ে বিদেশে বাড়ি-গাড়ি-সম্পদ ও দোষীদের বিচার: আদৌ কিছু হবে?
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১৩:৩০
অর্থ পাচার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বিষফোঁড়া। দেশের অর্থ লুটপাট করে বর্তমান ও সাবেক অনেক সংসদ সদস্য, আমলা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদরা অবৈধ উপায়ে বিদেশে বাড়ি বানিয়েছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জাতীয় সংসদেও এই বিষয়ে বিচারের তাগিদ দিচ্ছেন বিরোধী দলসহ বেশ ক’টি দলের সংসদ সদস্যগণ। দোষীদের চিহ্নিত করা ও আইনের আওতায় আনার বিষয়ে আদেৈ কিছু হবে? এ নিয়ে আরেফিন বাঁধনের প্রতিবেদন
কঠোরহস্তে আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই: অবৈধ উপায়ে বিপুল অর্থ উপার্জনকারীদের বেশিরভাগই প্রবাসে করছেন তাদের ‘সেকেন্ড হোম’। উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে স্থায়ীভাবে পাড়ি জমাচ্ছেন সে-সব দেশে। যে তালিকায় রয়েছে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, আরব আমিরাত, থাইল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন ও আমেরিকা। এসব দেশ নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করলেই বিদেশীদের স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ সম্পদশালীই এ সুযোগ নিয়ে প্রবাসে তাদের দ্বিতীয় আবাস বা সেকেন্ড হোম বানিয়েছেন। বিশ্লেষকগণ বলছেন, এক সময় এই অর্থ পাচারকারীরা দেশের সব সম্পত্তি বিক্রি করে চলে যাবেন। এর কারন হিসেবে তারা সুশাসনের অভাব, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও আস্থাহীনতাকেই দায়ী করেন। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ও আসন্ন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নানা পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। এমন সংকটকালীন সময়ে সরকার যেখানে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিচ্ছে তখন একটি গোষ্ঠীর এমন কর্মকাণ্ড দেশের অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাই সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অর্থ পাচার করে বিদেশে সম্পদ যারা করছেন তাদের তালিকা প্রকাশ করে বিচারের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকগণ। অর্থ পাচারকারীদের প্রতিরোধে বিএফআইইউ, দুদক ও সিআইডিকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সর্বোপরি অর্থ পাচার প্রতিরোধে সব নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কঠোরতার কোনো বিকল্প নেই।
কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরনোর শঙ্কা: গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান জাতীয় সংসদে অভিযোগ করে বলেছেন, এ সংসদের বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্য, আমলা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ অনেকেই বাংলাদেশের অর্থ লুটপাট করে বিভিন্ন দেশে বেগমপাড়া, সেকেন্ড হোম, থার্ড হোম তৈরি করেছেন। তিনি আরও বলেন, এ সেকেন্ড হোম নিয়ে কথা বললে দেখা যাবে, কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসছে। তখন সরকার দলীয় নেতারা হয়ত বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যাবেন। এর আগে, গত জানুয়ারি মাসে জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু বলেছেন, বাংলাদেশিদের বিদেশে বাড়ি-গাড়ির সংবাদ প্রকাশিত হলে সরকারের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয় বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন। চুন্নু বলেন, আমরা বিরোধী দলে আছি। আমাদেরও তো ইমেজ নষ্ট হয়। মানুষ মনে করে এমপি-মন্ত্রীরা কোটি কোটি টাকা কামায়। বিদেশে বাড়ি-ঘর করে। বিষয়গুলোর তদন্ত হওয়া উচিত। জাপা মহাসচিব বলেন, এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর মুখ খোলা উচিত। তার বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ এগুলো কীভাবে কী হচ্ছে। একটা তদন্ত করে এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বক্তব্য দেওয়া উচিত।

কাজে আসছে না সরকারি উদ্যোগ: প্রতি বছর দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হলেও কোনো সংস্থার কাছে প্রকৃত হিসাব নেই। আবার পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎপরতাও কম বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অর্থ পাচারে বড় বড় রাঘববোয়াল ও প্রভাবশালী চক্র জড়িত থাকায় মামলার তদন্ত ও নিষ্পতিও হয় ধীরগতিতে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যারাবিয়ান বিজনেস জানিয়েছে, ২০২০-এর জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশিরা দুবাইয়ে ১২ কোটি ৩০ লাখ দিরহাম বা ২৮৮ কোটি টাকার জমি-বাড়ি কিনেছেন। অ্যারাবিয়ান বিজনেস জানিয়েছে, দুবাইয়ে যেসব দেশের মানুষ জমি-বাড়ি কিনছেন, তাদের মধ্যে বাংলাদেশিরা সামনের সারিতে। এই তালিকায় আছেন ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলারা। গত জানুয়ারি মাসে দুবাইয়ের ৪৫৯ বাংলাদেশির হাজার প্রপার্টির বিষয়ে বিএফআইইউ, দুদক, সিআইডি ও এনবিআর’কে এ বিষয়ে অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি খসড়া গাইডলাইন থেকে জানা গেছে, বিদেশে পাচার করা অর্থ বা সম্পত্তি চিহ্নিত করার পর জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করার কৌশল প্রণয়ন নিয়ে কাজ করছে সরকার। সরকারের পদক্ষেপে অবৈধ অর্থপাচার আগামীতে অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশাপ্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) পাচারকারী বা পাচারকৃত অর্থের বিষয়ে বিদেশি আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে দুর্নীতি দমন কমিশন, সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থাকে সরবরাহ করে আসছে।
ইউডি/এজেএস

