তুরস্ক-সিরিয়ায় একের পর এক কম্পন: কেন এত ভূমিকম্প!

তুরস্ক-সিরিয়ায় একের পর এক কম্পন: কেন এত ভূমিকম্প!

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১৩:১৫

একের পর এক ভূমিকম্পে ধ্বংসের নগরিতে পরিণত হয়েছে তুরস্ক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। তুরস্কের দক্ষিণপূর্বাঞ্চল ও সিরিয়ার উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে আঘাতের পর দেশ ২টি তে আরও অন্তত ১০০ কম্পন অনুভূত হয়েছে। এতে দুটি দেশেই প্রাণহানির সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে আরও কয়েকদিন ৫ ও ৬ মাত্রার ভূকম্পন অনুভূত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে অঞ্চল দুটিতে। কেন এত ভূমিকম্পপ্রবণ এ অঞ্চল? এ নিয়ে বিনয় দাস’র প্রতিবেদন

ভূমিকম্পের আঁতুরঘর আনাতোলিয়ান প্লেট: বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ তুরস্ক। এর কারণ ভূখণ্ডটির অবস্থান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তুরস্কের বেশির ভাগ অংশ আনাতোলিয়ান টেকটোনিক প্লেটে অবস্থিত। এটি আবার দুটি প্রধান প্লেটের মধ্যে অবস্থিত। প্লেট দুটির মধ্যে একটি ইউরেশিয়ান ও আফ্রিকান এবং অপরটি আরবিয়। এই বড় দুটি প্লেট স্থানান্তরিত হওয়ার সময় মূলত শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়েছে এবং তুরস্ক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ দুটি টেকটোনিক প্লেটের মাঝে আছে ফল্ট লাইন। ভূমিকম্প সাধারণত এই ফল্ট লাইনের আশপাশে হয়ে থাকে। যেটি তুরস্ক-সিরিয়ায় ঘটেছে। এই পূর্ব আনাতোলিয়ান ফল্টকে আগেই খুব বিপজ্জনক বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও গত ১০০ বছরের বেশি সময়ে ওই ফল্টে খুব একটা প্রভাব দেখা যায়নি। ভূমিকম্পবিদদের মতে, পৃথিবীর আরও অনেক দেশ এ ধরনের দুই প্লেটের মোহনায় পড়েছে। সেসব দেশে কিন্তু তুরস্কের মতো এত ঘন ঘন বড় ধরনের ভূমিকম্প কম হয়। তুরস্কে হওয়ার অন্যতম কারণ, আনাতোলিয়ান প্লেটের পূর্ব ও উত্তরাংশে বড় ধরনের ফাটল রয়েছে। এই ফাটলটির কারণে মূলত দেশটিতে বড় ধরনের বেশি ভূমিকম্প হয়। তুরস্ক কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, দেশটিতে গত বছর ২২ হাজারেরও বেশি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা

মহা বিপর্যয়ের মুখে আড়াই কোটি মানুষ: তুরস্ক ও সিরিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। নিহতদের মধ্যে হাজারো শিশু থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ইউনিসেফ। সোমবার জেনেভায় এক ব্রিফিংয়ে ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার সাংবাদিকদের কাছে এ আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, এই মুহূর্তে ঠিক কতজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে তা নির্ধারণ করতে পারছে না সংস্থাটি। এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পে ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাদের মধ্যে পাঁচ মিলিয়ন মানুষ ভয়াবহ বিপদের মধ্যে রয়েছেন। মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫০০০। তুরস্ক ও সিরিয়া দুটি দেশেই হাজার হাজার ভবন ধসে পড়েছে। উদ্ধারকারীরা প্রচণ্ড শীত ও তুষারপাতের মধ্যে ধ্বংসস্তূপের পাহাড়ের মধ্য থেকে জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। তুরস্কের এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে এগিয়ে এসেছে বিশ্বের নানা দেশ। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পটি তুরস্কে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে একটি। ডবিøউএইচওর সিনিয়র ইমার্জেন্সি অফিসার ক্যাথরিন স্মলউড বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমরা সব সময় ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে একই জিনিস দেখতে পাই। দুর্ভাগ্যবশত শুরুর দিকে হতাহতের সংখ্যা যা থাকে, পরবর্তী সপ্তাহে বেশ উল্লেখযোগ্যভাবে তা বেড়ে যায়।’

ঝুঁকিতে বাংলাদেশও, রয়েছে ৫টি ফল্ট: তুরস্ক-সিরিয়ার ভূমিকম্পের জন্য দায়ী আনাতোলিয়ান ফল্টকে বহু আগে থেকেই বিপজ্জনক উল্লেখ করে সতর্ক করে আসছিলেন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা। তেমনি বাংলাদেশের মূল ভূ-ভাগসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় এরকম মোটামুটি ৫টি চ্যুতি (ফল্ট) আছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ভারত প্লেট, উত্তরে তিব্বত উপপ্লেট এবং পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে বার্মা উপপ্লেট। ভারত ও বার্মা প্লেটের সংযোগ বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে চলে গেছে। পূর্ব অংশটি বার্মা প্লেট এবং পশ্চিমাংশ ভারতীয় প্লেটের অন্তর্গত। শিলং মালভূমি ভারত প্লেটের মধ্যে ক্ষুদ্র একটি প্লেট। এটি দক্ষিণ দিকে এগিয়ে চলেছে ধীরে ধীরে। ভূতাত্ত্বিক গঠন ও টেকটোনিক কাঠামোর কারণেই বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। বিশেষ করে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। ভ‚মিকম্পের পূর্বাভাস যেহেতু আগে থেকে দেওয়া যায় না, তাই বিশ্লেষকদের মতে, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। সরকারকেই এ বিষয়ে মুখ্য দায়িত্ব পালন করতে হবে, যাতে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ন্যূনতম পর্যায়ে থাকে। ভবন নির্মাণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সব নিয়ম মেনে করছে কি না, তা কঠোরভাবে তদারকির তাগিদ বিশেষজ্ঞগণের।

ইউডি/আবা/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading