পুতিনের অভিযোগ: বিশ্বযুদ্ধের উসকানি দিচ্ছে পশ্চিমারা
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১১:৩৫
রাশিয়াকে ধ্বংসে পশ্চিমারা বিশ্বযুদ্ধের উসকানি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলেছেন, পশ্চিমা দেশগুলো আঞ্চলিক একটি যুদ্ধকে বৈশ্বিক সংঘাতের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায়। এর যথাযথ জবাব দেওয়া হবে। কারণ, এটা রাশিয়ার অস্তিত্বের বিষয়। মঙ্গলবার (২১ ফেব্রুয়ারি) তার বার্ষিক ভাষণ ‘স্টেট অব দ্য ন্যাশন’-এ তিনি এ কথা বলেন। পুতিনের ভাষণের চুম্বক অংশ ও আমেরিকা-ইউক্রেনের প্রতিক্রিয়া নিয়ে মিলন গাজী‘র প্রতিবেদন
রাশিয়া নতি স্বীকার করবে না: ইউক্রেনে সংঘাত বৃদ্ধির জন্য পশ্চিমা বিশ্ব পুরোপুরি দায়ী বলে মন্তব্য করে পুতিন বলেছেন, ইউক্রেন সংঘাতে ইন্ধন জোগানো, এর তীব্রতা বৃদ্ধি ও নিহতের সংখ্যার হিসাব সম্পূর্ণভাবে পশ্চিমাদের ওপর নির্ভর করে। ইউক্রেন যুদ্ধ পশ্চিমারাই শুরু করেছে বলে মন্তব্য করে ভাষণে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, আমরা এই সমস্যাটি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু আমাদের পেছনে ভিন্ন পরিকল্পনা করা হয়েছে। পশ্চিমাদের বৈশ্বিক সংঘাতের বিষয়ে সতর্ক করে পুতিন বলেছেন, রাশিয়াকে এই যুদ্ধে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। যুদ্ধে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাঁদের পরিবারের দুঃখ-কষ্ট তিনি অনুধাবন করেন। তিনি বলেন, রাশিয়াকে পরাজিত করা অসম্ভব। ৭০ বছর বয়সী ক্রেমলিনের এই প্রধান বলেন, রাশিয়া কখনই তার সমাজকে বিভক্ত করার পশ্চিমা প্রচেষ্টার কাছে নতি স্বীকার করবে না। বেশিরভাগ রাশিয়ানই যুদ্ধ সমর্থন করছেন বলে জানান তিনি।পুতিন বলেন, পশ্চিমারা বিশৃঙ্খলা আর যুদ্ধের বীজ বপন করে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বোতল থেকে ভ‚তকে বের করে দিয়েছে। তিনি বলেন, ইউক্রেনের জনগণ কিয়েভের বর্তমান শাসক গোষ্ঠী ও তাদের পশ্চিমা তাবেদারদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। যারা দেশটিকে রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পুরোপুরি দখল করে আছে। তিনি আরও বলেন, যে রাশিয়ানরা বিশ্বাসঘাতকতার পথ বেছে নিয়েছিলেন তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। যারা রাশিয়ার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার পথে হাঁটছেন তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় জবাবদিহি করতে হবে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ ছিল অনিবার্য বিষয়। রাশিয়া এই যুদ্ধ শুরু করেনি। বরং যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে।

আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু অস্ত্র চুক্তি স্থগিত: আমেরিকার সঙ্গে হওয়া পরমাণু অস্ত্র চুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কিয়েভ সফরের একদিন পর তিনি এ ঘোষণা দিলেন। পরমাণু অস্ত্র সীমিত রাখতে ২০১০ সালে প্রাগে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে ‘নিউ স্টার্ট’ নামে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এর মেয়াদ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এ বিষয়ে পুতিন বলেন, এ ব্যাপারে আমি বলতে চাই রাশিয়া এ চুক্তিতে নিজেদের অংশগ্রহণ স্থগিত করছে। চুক্তিতে আমেরিকা এবং রাশিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক ওয়ারহেড, স্থল ও সাবমেরিন-ভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক বোমাবাহী বিমান মোতায়েনের লাগাম টানা হয়। বিশ্বে বর্তমানে রাশিয়ার কাছে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশটির কাছে প্রায় ৬ হাজার ওয়ারহেড রয়েছে। নিউ স্টার্ট চুক্তি অনুযায়ী, এই দুই দেশের কেউই এক হাজার ৫৫০টির বেশি কৌশলগত পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েন করতে পারতো না। যৌথভাবে রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে; যা এই বিশ্বকে বহুবার ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। পুতিন তার বক্তৃতায় আবারও বলেন, পাশ্চাত্য পচে গেছে। তারা আধ্যাত্মিক বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তিনি বলেন, তারা ঐতিহাসিক তথ্য বিকৃত করছে, অব্যাহতভাবে আমাদের সংস্কৃতি, রুশ অর্থোডক্স চার্চ এবং আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী ধর্মগুলোর ওপর হামলা করছে।
প্রত্যাখ্যান করেছে আমেরিকা-ইউক্রেন: এদিকে, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের ভাষণ প্রত্যাখ্যান করেছে আমেরিকা ও ইউক্রেন। এক সিনিয়র মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ভাষণে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পুতিন যেভাবে পশ্চিমা ও কিয়েভকে দায়ী করেছেন তা ‘অযৌক্তিক’। হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সালিভান বলেন, কেউ রাশিয়াকে আক্রমণ করছে না। ইউক্রেন বা অন্যদের পক্ষ থেকে এক ধরনের সামরিক হুমকি রয়েছে বলে অযৌক্তিক ধারণা রাশিয়ায় কিছুমাত্রায় বিরাজ করছে। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির এক সিনিয়র উপদেষ্টা মিখাইলো পডোলিয়াক বলেছেন, পুতিনের ভাষণ প্রমাণ করছে তার ‘অপ্রাসঙ্গিকতা এবং বিভ্রান্তি’। তিনি বলেছেন, পুতিন জোর দিয়ে বলছেন রাশিয়া অচলাবস্থায়, কোনও সমাধান নেই এবং থাকবে না। কারণ সবজায়গায় নাৎসী, মঙ্গললীয়রা এবং ষড়যন্ত্র রয়েছে। যুদ্ধের জন্য পশ্চিমা ও কিয়েভকে দায়ী করায় অস্ট্রিয়ায় নিযুক্ত ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রদূত পুতিনকে ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর বিষয়ে পুতিন ভাষণে তার বলেছেন, ইউক্রেন ও দোনবাস একটি মিথ্যার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি আবারও বলছি, তারা যুদ্ধ শুরু করেছে। আমরা আমাদের সেনাদের দিয়ে তা থামানোর চেষ্টা করছি। পুতিনের দাবি, যুদ্ধ শুরুর আগে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনবাস অঞ্চলে হামলার জন্য সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল কিয়েভ। ইউক্রেনের এ অঞ্চলটি নিয়ে ইউক্রেন বাহিনীর সঙ্গে রুশ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরোধ রয়েছে।
ইউডি/এজেএস

