২ মিনিটে এক মৃত্যু: গর্ভধারণ-নিরাপদ প্রসব নারীর প্রাপ্য অধিকার

২ মিনিটে এক মৃত্যু: গর্ভধারণ-নিরাপদ প্রসব নারীর প্রাপ্য অধিকার

মহসিনা মান্নান এলমা । শুক্রবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১৩:০০

নিরাপদ মাতৃত্ব হচ্ছে এমন একটি পরিবেশ বা অবস্থা সৃষ্টি করা যাতে একজন নারী তার সন্তান ধারণ করার পর গর্ভ ও প্রসব সংক্রান্ত জটিলতা ও মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব সেবা নিশ্চিতভাবে পেতে পারেন। একজন গর্ভবতী মা গর্ভধারণের পর থেকে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগ পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন। নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে হলে বেশকিছু সেবা প্রাপ্তির প্রতি বিশেষ জোর দিতে হবে। যেমন- গর্ভকালীন অথবা প্রসব-পূর্ববর্তী সেবা, নিরাপদ প্রসব ব্যবস্থা, জরুরি প্রসূতি সেবা এবং গর্ভোত্তর বা প্রসব পরবর্তী সেবা। নিরাপদ মাতৃত্বে কিছু বাধাও রয়েছে। সামগ্রিকভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পল্লী অঞ্চলের লাখ লাখ অবহেলিত, দরিদ্র ও অশিক্ষিত মায়েদের গর্ভাবস্থায় এবং প্রসবের সময় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতিও ভিন্নতর নয়।

গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসব সংক্রান্ত জটিলতায় বিশ্বজুড়ে প্রতি দুই মিনিটে এক নারীর মৃত্যু হয়। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ এ তথ্য জানিয়েছে। তবে ২০ বছরের ইতিহাসে মাতৃত্বজনিত মৃত্যু এক-তৃতীয়াং কমেছে। ২০০০ সাল থেকে ২০১৫ পর্যন্ত এই মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমলেও ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কমতির হার অনেক কম। তবে কিছু এলাকায় তা বেশ কমেছে। ২০ বছরে বিশ্বে গড় মাতৃত্বজনিত মৃত্যুহার ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। ২০০০ সালে যেখানে এক লাখ সন্তান জন্মদানের ঘটনায় ৩৩৯ মায়ের মৃত্যু ঘটত, ২০২০ সালে এসে তা ২২৩ জনে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ তথ্য জানানো হয়ে।

এর মানে ২০২০ সালে প্রতিদিন ৮০০ নারীর মৃত্যু হয়েছে অর্থাৎ প্রতি দুই মিনিটে একজন। বেলারুশ এক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে। দেশটিতে মাতৃত্বজনিত মৃত্যু সাড়ে ৯৫ শতাংশ। অন্যদিকে ভেনিজুয়েলায় এই কারণে সবচেয়ে বেশি নারীর মৃত্যু হয়েছে। তবে আমেরিকাতে মাতৃত্বজনিত মৃত্যু ব্যাপকহারে বেড়েছে। ডব্লিউএইচও প্রধান ডা. টেড্রস আধানম গ্যাব্রিয়াসুস বলেন, গর্ভধারণ যেখানে নারীর সবচেয়ে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা ও আশাবাদী হওয়ার সময়, সেখানে এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি নারীর জন্য এটিই সবচেয়ে আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা হিসেবে রয়ে গেছে। নতুন পরিসংখ্যান বলছে, নারী ও মেয়েদের গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। তাহলে তারা সুষ্ঠুভাবে সন্তান জন্মদানের অধিকার চর্চা করতে পারবেন।

নিরাপদ মাতৃত্ব হলো- গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে একজন নারীর জন্য নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত জটিলতার কারণে প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার নারীর মৃত্যু হয় এবং ২৬ লাখ শিশু মৃত জন্ম নেওয়াসহ ৩০ লাখ নবজাতক অকাল মৃত্যুবরণ করে। বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন ৮৩০ জন মা মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৫ হাজার ৪৭৫ জন মা এবং প্রতিদিন প্রায় ১৫ জন মা মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে দেশে প্রতি ১ লাখ জীবিত সন্তান জন্ম দিয়ে ১৭২ জন মা মৃত্যুবরণ করেন। মোট মাতৃমৃত্যুর ৭৩ শতাংশই ঘটে প্রসব-পরবর্তী সময়ে। যাদের ৫৬ শতাংশই মারা যায় প্রসবের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। এসব মাতৃমৃত্যুর ৩১ শতাংশই ঘটে রক্তক্ষরণের কারণে। ২৪ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী খিঁচুনি বা অ্যাকলাম্পসিয়া। এছাড়া ৩ শতাংশ মায়ের মৃত্যু ঘটে বাধাগ্রস্ত বা অবিরাম প্রসবব্যথার কারণে। মোট মাতৃমৃত্যুর ৫৩ শতাংশই ঘটে থাকে বাড়িতে প্রসবের কারণে। বর্তমানে ৩৭ শতাংশ মা কমপক্ষে চারটি প্রসবপূর্ব সেবা গ্রহণ করে থাকেন। দেশে বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার ৪৭ শতাংশ। প্রসবের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রসব-পরবর্তী সেবা গ্রহণের হার ৩২ শতাংশ। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি লাখ নবজাতকের জন্মে মাতৃমৃত্যু ৭০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার।

আমাদের পুরুষশাসিত সমাজের নারীর নিরাপদ প্রসব অধিকার খর্ব হচ্ছে। একজন নারীর নিজের জীবনের ওপর অধিকার রয়েছে। মাতৃত্বের বিষয়ে নারীর নিজস্ব মতামত নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে পারে। গর্ভকালীন সেবা এবং সন্তান জন্মের ব্যাপারে নারীর স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারলে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস সার্থক হবে। গর্ভকালীন মাতৃস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা একজন মা এবং সুস্থ শিশুর জন্য আবশ্যক। গর্ভকালীন সময়ে পরিবারের সবাইকে সহানুভূতিশীল হতে হবে। মায়ের গর্ভকালীন এবং প্রসব-পরবর্তী সেবা নিশ্চিতকরণ করতে হবে। গর্ভবতী মায়ের বিপদ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে। বেশি বেশি ভিটামিন, মিনারেল ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিতকরণে সচেতন হতে হবে। প্রসবকালীন সময়ে জরুরি অর্থসহ সব ধরনের প্রস্তুতি রাখতে হবে। নিরাপদ প্রসব সুস্থ শিশুর জন্মের পূর্বশর্ত এবং নারীর প্রাপ্য অধিকার।

লেখক: কলামিস্ট ও সমাজ গবেষক।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading