শব্দদূষণ: বধিরতায় ভুগছেন ৯.৬ শতাংশ মানুষ
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ০৫ মার্চ ২০২৩ । আপডেট ১৩:০০
অতিরিক্ত শব্দ কানের ভেতরের বিশেষ এক ধরনের কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে স্থায়ীভাবে শ্রবণের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঢাকায় শব্দের যে মাত্রা তাতে অধিকাংশ মানুষ দীর্ঘদিন রাজধানীতে বসবাস করলে ধীরে ধীরে কানে কম শুনতে পারেন বলে চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন।
ঢাকার সব এলাকাতেই শব্দের মাত্রা এখন অনেক বেশি। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬-তে উল্লেখিত আদর্শমান অতিক্রম করেছে প্রায় সব জায়গাতেই। শহরের বিভিন্ন স্থানে সাধারণভাবে শব্দের গ্রহণযোগ্য মানমাত্রা পরীক্ষা করে দেখা যায়, প্রায় ১.৩ থেকে ২ গুণ বেশি শব্দ হচ্ছে। দূষণ রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এমন পরিস্থিতিতে দেশে শুক্রবার (০৩ মার্চ) পালিত হয়েছে বিশ্ব শ্রবণ দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উদ্যোগে ২০০৭ সালের এই দিনে প্রথমবারের মতো পালিত হয় বিশ্ব শ্রবণ দিবস। প্রতিবছরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি নতুন স্লোগান ঘোষণা করে। ২০২৩ সালের স্লোগান হলো ‘সকলের জন্য কান ও শ্রবণ যত্ন’।

শব্দদূষণ
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) সম্প্রতি এক গবেষণায় বলা হয়, ঢাকা শহরে আশঙ্কাজনকভাবে শব্দদূষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
গবেষণা অনুসারে, রাজধানীর প্রায় সব এলাকাতেই শব্দের মাত্রা শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬-তে উল্লেখিত আদর্শমান অতিক্রম করেছে। নগরের বিভিন্ন স্থানে সাধারণভাবে শব্দের গ্রহণযোগ্য মানমাত্রার থেকে প্রায় ১.৩ থেকে ২ গুণ বেশি শব্দ পাওয়া যায়।
এরমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় শব্দের মাত্রা পাওয়া গেছে ৭৬.৮০ ডেসিবেল। সবচেয়ে বেশি নিউ মার্কেট মোড়, নয়া পল্টন মোড় এবং প্রেসক্লাব মোড়ে, এসব জায়গায় শব্দদূষণের মাত্রা যথাক্রমে ১০০.৬৫ ডেসিবেল, ৯২.২২ ডেসিবেল এবং ৯০.০৩ ডেসিবেল।
আর সবচেয়ে কম দূষণ ছিল আবুল হোটেল মোড়, দৈনিক বাংলা মোড় এবং জিরো পয়েন্ট মোড়ে। সেখানে শব্দদূষণের মাত্রা যথাক্রমে ৭৮.২৭ ডেসিবেল, ৭৭.৯২ ডেসিবেল এবং ৭৭.৬০ ডেসিবেল।

এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় শব্দের মাত্রা পাওয়া গেছে ৮০.৫৬ ডেসিবেল, যা দক্ষিণের চেয়ে বেশি। সবচেয়ে বেশি শব্দ পাওয়া গেছে মোহাম্মদ বাসস্ট্যান্ড মোড়, শিয়া মসজিদ মোড় ও মাসকট প্লাজা মোড়ে, সেখানে শব্দদূষণের মাত্রা যথাক্রমে ৯৯.৭৭ ডেসিবেল, ৯৩.০৫ ডেসিবেল ও ৯০.২৭ ডেসিবেল।
আর সবচেয়ে কম মিরপুর বেড়িবাঁধ মোড়, রবীন্দ্রসরণি মোড় ও গুলশান-২ মোড়ে, সেখানে শব্দদূষণের মাত্রা যথাক্রমে ৭৪.৮৬ ডেসিবেল, ৭৫.২৫ ডেসিবেল এবং ৭৬.০১ ডেসিবেল।
শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ অনুযায়ী ঢাকার জন্য দিনের বেলায় শব্দের আদর্শমান (সর্বোচ্চ সীমা) ৬০ ডেসিবেল। সেক্ষেত্রে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় শব্দের তীব্রতা মানমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
ঢাকা শহরে শব্দদূষণের উৎস
সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে যানবাহনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ায় শব্দদূষণের মাত্রাও বাড়ছে।
সাধারণত যানবাহন চলাচলের শব্দ (হর্ন, ইঞ্জিন, চাকার ঘর্ষণ ও কম্পনের শব্দ), রেলগাড়ি চলাচলের শব্দ, বিমান উঠানামার শব্দ, নির্মাণকাজ যেমন- ইট ও পাথর ভাঙার মেশিন ও টাইলস কাটার মেশিনের শব্দ, ভবন ভাঙার শব্দ, কলকারখানার শব্দ, জেনারেটরের শব্দ, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের মাইকিংসহ ইত্যাদি উৎস হতে শব্দ উৎপন্ন হয়।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, ‘দেশে শব্দদূষণ রোধে আইন থাকলেও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।’
স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘শব্দদূষণ রোধে ঢাকা শহরকে হর্নমুক্ত ঘোষণা করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এর পাশাপাশি যাত্রী, চালক ও গাড়ির মালিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।’

কী বলছেন চিকিৎসকরা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অটোল্যারিঙ্গোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর আবুল হাসনাত জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘বাংলাদেশের ৯.৬ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো স্তরের বধিরতায় ভুগছেন।’
তিনি বলেন, ‘শব্দ দূষণ আমাদের কানে দুইভাবে প্রভাব ফেলে। শব্দ দূষণ কানের শ্রবণ ক্ষমতা ধীরে ধীরে নষ্ট করে সরাসরি বধিরতা সৃষ্টি করে। উচ্চ শব্দ মাত্রার সংস্পর্শে বছরের পর বছর বধিরতা হতে পারে’, যোগ করেন তিনি।
ইউডি/এ

