লাশটি কোথায় যাবে, কবরে নাকি চিতায়? জানতে অপেক্ষা আরও ১ মাস
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৫ মার্চ ২০২৩ । আপডেট ১৪:৫০
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বাদামতল এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত যুবকের মরদেহটি আরো একমাস হাসপাতালের হিমঘরে থাকবে। তিনি হিন্দু নাকি মুসলিম ছিলেন- এ পরিচয়ের বেড়াজালে আটকে থাকা লাশটির ধর্ম পরিচয় নিশ্চিত করে আগামী ২০ এপ্রিলের মধ্যে পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য পটিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নির্দেশ দেন।
বুধবার (১৫ মার্চ) সকালে পটিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক বিশ্বেস্বর সিংহ এ আদেশ দিয়েছেন বলে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন আদালতের জিআরও রফিকুল ইসলাম।
এর আগে গত ৩০ জানুয়ারি পটিয়ার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মার্চের ১৩ তারিখের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৩ মার্চ আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেননি হাইওয়ে থানা পুলিশ। সেদিন তারা আবারও অধিকতর তদন্তের জন্য সময়ের আবেদন করে আদালতে একটি চিঠি দিয়েছেন। পটিয়া হাইওয়ে পুলিশের সময়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে বুধবার আদালত এ নির্দেশ দেন।
গত ২৯ জানুয়ারি দুপুর ২টার দিকে পটিয়া উপজেলার মনসা বাদামতল এলাকায় তেলবাহী লরির চাপায় পিষ্ট হয়ে মোটরসাইকেলআরোহী ওই যুবকের মৃত্যু হয়।
নিহত যুবকের মা সন্ধ্যারানী দাশ শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন, রতন দাশ নামের ওই যুবক ছিলেন হিন্দু। তাই হিন্দু ধর্মের নিয়ম মেনে শেষকৃত্য চিতায় সম্পন্ন করতে চান।
কিন্তু তার সহপাঠীদের দাবি, তিনি ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর চট্রগ্রামের লালখান বাজার এলাকার একটি মাদরাসায় মওলানা হারুন এজাহারের কাছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এরপর থেকে তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন ও ইসলাম ধর্মের সব নিয়মকানুন মেনে চলতেন। তাই তারা মুসলিম হিসেবে তার লাশ দাফন করতে আগ্রহী। এজন্য তারা সব নথিপত্র সংগ্রহ করে হাইওয়ে থানার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন হাফেজ ক্বারী আকরাম হোসাইন।
জানা যায়, নিহত যুবক তার মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় মুসলিম হওয়ার পরও তার মাকে নিয়ে নগরীর একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। আগ্রাবাদ এলাকায় একটি মোবাইল এক্সেসরিজ প্রতিষ্ঠানে চাকরিও করতেন। আর তার মৃত্যুর পরই বাঁধে বিপত্তি। তার মৃত্যুর দেড় মাস পার হয়ে গেলেও এখনো আদালতের রায়ের অপেক্ষায় নিহত যুবকের পরিবার ও সহপাঠীরা। আরো একমাস পাঁচ দিন পর জানা যাবে লাশটি কবরস্থানে যাবে, নাকি চিতায় পোড়ানো হবে।
এদিকে, হলফনামা সূত্রে জানা গেছে, ওই যুবকের নাম রতন দাশ (২৯)। বাড়ি মিরসরাই উপজেলার পূর্ব মায়ানী গ্রামে। তার বাবার নাম মনোরঞ্জন দাশ ও মায়ের নাম সন্ধ্যা রানী দাশ। নিহত যুবক দুই বছর আগে মুসলিম হিসেবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার জন্য জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে নাম পরিবর্তন করে আহমাদ নাম রেখেছেন। যার নোটারি নম্বর-১১০৫৪৪। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার বেশ কিছু ছবিও রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে পরিবার ও তার সহপাঠীদের মধ্যে বিপত্তি ঘটলে উভয়পক্ষ আর হাইওয়ে পুলিশে আদালতের দ্বারস্থ হন।
নিহত যুবকের সহপাঠী সিরাজুল মাওলা মিলাদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সে মনে-প্রাণে ইসলাম ধর্ম মেনে মুসলিম হয়েছে। আমরা সহপাঠীরা তার মৃত্যুর পর সে যে মুসলিম হয়েছে তার সব ধরনের কাগজপত্র সংগ্রহ করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছি। আমরা মনে করেছিলাম ১৩ মার্চ আদালতের দেওয়া সময়ের মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন।
‘কিন্তু সেদিন আমরা পটিয়া আদালতে এসে জানতে পারি, পুলিশ আরো সময় চেয়েছে। তাতেই আমরা হতাশ হয়েছি। আমরা রাষ্ট্রের কাছে আবেদন করছি, এ মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করে যেন আমরা আমাদের বন্ধুকে কবরস্থ করতে পারি’, বলেন সিরাজুল মাওলা।
নিহতের মা সন্ধ্যা রাণী দাশ বলেন, ‘আমি ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছি। পুলিশকে ফোন করলে তারা আমাকে বলেন কিছু হলে আমাকে তারা জানাবেন। এখন সবকিছু তো সরকার আর আদালতের জিম্মায় চলে গেছে।
‘আমি আর কী করব! আদালত যা সিদ্ধান্ত দেবে তা-ই হবে আরকি। আমি মহামান্য আদালতের কাছে আশা করছি- আমার ছেলের লাশ আমার কাছেই ফিরিয়ে দেবে’, যোগ করেন মা সন্ধ্যা রাণী।
হাইওয়ে থানার ওসি স্নেহাংশু বিকাশ সরকার বলেন, ‘চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি এখনো তদন্তাধীন আছে। আমাদের তদন্ত কর্মকর্তা নিহতের ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত করতে তার গ্রামের বাড়ি ও শহরে যে এলাকায় অবস্থান করতেন সেখানে গিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন। শিগগিরই আমরা আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারব। এরপর আদালত সিদ্ধান্ত দেবে, লাশটি কি কবরস্থানে যাবে, নাকি চিতায়।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) রুহুল আমিন বলেন, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি মামলাটির দায়িত্ব নিয়েছি। এরপর যেখানে যেখানে যাওয়া প্রয়োজন সেখানে গিয়ে বুঝতে পারলাম, হিন্দু ও মুসলিম দুই পক্ষই লাশটি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় আছে। পরবর্তীতে আমি সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য আরো সময়ের প্রয়োজন মনে করে ১৩ মার্চ আদালতে সময়ের আবেদন করেছি। আশা করছি, আদালত পরবর্তী যে তারিখ নির্ধারণ করে দিয়েছেন সে সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারব।
গত ৩০ জানুয়ারি পটিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক বিশ্বেশ্বর সিংহ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যতদিন পর্যন্ত ওই যুবকের ধর্ম শনাক্ত না হবে ততদিন পর্যন্ত মরদেহটি চমেক হাসপাতালের হিমঘরে রাখতে হবে।
ইউডি/এ

