নাইকো দুর্নীতি মামলায় বিচার শুরু: অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি পেতে পারেন খালেদা জিয়া

নাইকো দুর্নীতি মামলায় বিচার শুরু: অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি পেতে পারেন খালেদা জিয়া

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২০ মার্চ ২০২৩ । আপডেট ১৪:২২

আলোচিত নাইকো দুর্নীতি মামলায় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াসহ বাকি আসামিদের বিরুদ্ধে রবিবার (১৯ মার্চ) অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হলো। এর আগে পৃথক দুটি মামলায় দণ্ডিত খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আবারও শাস্তির মুখে পড়তে পারেন তিনি। এ নিয়ে মিলন গাজী’র প্রতিবেদন

মামলার ১৫ বছর পর শুরু হলো বিচার: নাইকো দুর্নীতি মামলায় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াসহ আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯-এর বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান এই অভিযোগ গঠন করেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মোশারফ হোসেন কাজল গণমাধ্যমকে বলেন, অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়াসহ আটজনের বিচার কার্যক্রম শুরু হলো। আগামী ২৩ মে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনজীবী মাসুদ আহম্মেদ তালুকদার এদিন হাজিরা প্রদান করেন। আদালতে উপস্থিত ছিলেন মামলার আসামি খন্দকার শহীদুল ইসলাম, সি এম ইউছুফ হোসাইন ও ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুন।

সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতিসাধনের অভিযোগ: কানাডার কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতিসাধন ও দুর্নীতির অভিযোগে ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর খালেদা জিয়াসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। দুদকের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম বাদী হয়ে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় মামলাটি করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনটি গ্যাসক্ষেত্র পরিত্যক্ত দেখিয়ে কানাডার কোম্পানি নাইকোর হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে আসামিরা রাষ্ট্রের প্রায় ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার ক্ষতি করেছেন। ২০০৮ সালের ৫ মে এই মামলায় খালেদা জিয়াসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। এতে আসামিদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়।

অভিযোগভুক্ত বাকি আসামি যারা: অভিযোগপত্রভুক্ত অন্য আসামিরা হলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব খন্দকার শহীদুল ইসলাম, সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব সি এম ইউছুফ হোসাইন, বাপেক্সের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মীর ময়নুল হক, বাপেক্সের সাবেক সচিব মো. শফিউর রহমান, ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুন, বাগেরহাটের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ এইচ সেলিম ও নাইকোর দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশেম শরীফ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন ও বাপেক্সের সাবেক সচিব মো. শফিউর রহমান মারা যাওয়ায় মামলার দায় থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

এফবিআই

আদালতে উপস্থিত হয়ে চার আসামির ‘নির্দোষ’ দাবি: রবিবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বন্ধু এ মামালার আসামি গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। খন্দকার শহিদুল ইসলাম ও সি এম ইউছুফ হোসাইন আদালতে হাজির ছিলেন। আদালত অভিযোগ পড়ে শোনালে খালেদা জিয়ার পক্ষে তার আইনজীবী ও আদালতে উপস্থিত তিনজন নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। সাবেক সংসদ সদস্য এম এ এইচ সেলিমের পক্ষে তার আইনজীবী জাকারিয়া হায়দার সময়ের আবেদন করেন। আদালত সময়ের আবেদন নামঞ্জুর করে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন। অন্যান্য আসামি পলাতক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধেও নতুন করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। একই সঙ্গে তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার কাজ চলবে বলে আদালত আদেশে উল্লেখ করেন।

উচ্চ আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে খালেদার আইনজীবীরা: গত কয়েকটি তারিখের মতো রবিবারও খালেদা জিয়াকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়ার আবেদনের ওপর শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল। অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার ও আব্দুল হান্নান অব্যাহতির আবেদন শুনানির জন্য সময়ের আবেদন করেন। এ সময় আদালত বলেন, অনেক সময় দেওয়া হয়েছে। আপনারা মামলার বিচারিক কাজের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করছেন। এ সময় খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনজীবীরা বলেন, মামলায় জব্দকৃত আলামতের বিভিন্ন কাগজপত্রের জাবেদা নকল সরবরাহের জন্য কয়েকবার আবেদন করা হয়েছে। ওই আবেদনগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ায় শুনানি করা সম্ভব নয়। এই কারণে সময় চাওয়া হয়েছে। আদালত বলেন, ওই সব কাগজপত্রের ফটোকপি সরবরাহ করা হয়েছে। এর পরেও আপনারা সময় চাইছেন। এটা ঠিক নয়। আদালত খালেদা জিয়ার পক্ষে সময়ের আবেদন নামঞ্জুর করেন। পরে অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার খালেদা জিয়াকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে শুনানি করেন। একপর্যায়ে আদালত শুনানি সমাপ্ত ঘোষণা করে অভিযোগ গঠন করেন। অন্যান্য উপস্থিত আসামি ইতিপূর্বে মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন শুনানি করেছিলেন। আদালত খালেদা জিয়াসহ উপস্থিত আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নামঞ্জুর করেন। খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার গণমাধ্যমকে বলেন, আদালত অভিযোগ গঠন করেছেন। আমরা কিছুটা শুনানি করেছি। সময় চেয়েছিলাম আদালত সময় মঞ্জুর করেননি। এই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবেন কি না, সে প্রসঙ্গে মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, আমরা আদেশ এবং অন্যান্য কাগজপত্র পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।

এফবিআই-আরসিএমপি’র তদন্ত যা বলছে: ছাতক গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস তোলার অনুমতি পেতে নাইকো যে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে তার প্রমাণ পায় কানাডার রয়াল মাউন্টেড পুলিশের (আরসিএমপি) তদন্ত কর্মকর্তারা। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ‘নাইকো কানাডার’ বারবাডোজে নিবন্ধিত অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘নাইকো বাংলাদেশের’ দুর্নীতির বিষয়ে তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো হয়েছিল। সেই সূত্রে প্রতিষ্ঠানটির কানাডার ‘করাপশন অব ফরেন পাবলিক অফিসিয়ালস অ্যাক্টের’ লঙ্ঘন করেছে কিনা, তা খুঁজে বের করতে আরসিএমপি তদন্ত শুরু করে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা বাংলাদেশে এসেছিলেন সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও তথ্য সংগ্রহের জন্য। একই বিষয়ে পৃথক তদন্ত করেছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইও। নাইকোর দেওয়া অর্থে গিয়াস আল মামুন ঢাকায় একটি বিদেশি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলেন। সেই অ্যাকাউন্ট থেকে দুটি কার্ড (ডুয়েল কার্ড) নেন। একটি নিজের ব্যবহার করেন। অন্যটি ব্যবহার করতেন তারেক রহমান। এ কার্ডের মাধ্যমে তারেক রহমান সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড সহ বহু দেশে কেনাকাটা ও বিভিন্ন ব্যয়ে খরচ করেছেন বলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ও কানাডার পুলিশের তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০১১ সালেল ২৩ জুন কানাডার একটি আদালত বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তার সরকারের জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসাইনের দুর্নীতি মামলার বিষয়ে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ পেয়েছিল। মোশাররফ কানাডার কোম্পানী নাইকোকে অনৈতিকভাবে সুবিধা দেয়ার বিনিময়ে একটি দামি গাড়ি উপহার পেয়েছিল নাইকোর কাছ থেকে যার আর্থিক মূল্য ছিল কানাডিয়ান ডলারে ১,৯০,৯৮৪ ডলার।

গিয়াস উদ্দিন আল মামুন

নাইকো আরো ৫ হাজার কানাডিয়ান ডলার ঘুষ দিয়েছিল মোশাররফকে তার স্বপরিবারে আমেরিকা ভ্রমণের জন্য। আর নাইকো একেএম মোশাররফ হোসাইনকে ওই ঘুষ দিয়েছিল এটা নিশ্চিত করতে যে, নাইকো বাংলাদেশ থেকে তাদের ঠিক করা দামে গ্যাস কিনতে পারবে এবং তা বিক্রী করতে পারবে এবং গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরনের কারণে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত জরিমানা আরো কমানো হবে।। ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট রিট পিটিশনের ( পিটিশন নাম্বার: ৫৬৭৩) রায় দেয়। রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ, এফবিআই এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সমস্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, ২০০৩-০৬ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বকালীন সময়ে নাইকোর কাছ থেকে বড় ধরনের ঘুষ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছিল অনৈতিকভাবে তাদের সুবিধা দেয়ার নামে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আদেশের লক্ষণীয় বিষয় হলো, নাইকো একেবারে নির্লজ্জভাবে ঘুষ দিয়েছিল। নাইকোর এজেন্ট কাশিম শরীফকে ৪ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল। আর নাইকো তাদেরকে পরামর্শক হিসেবে এইসব টাকা দিয়েছিল যা তৎকালীন সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্তাদের প্রদান করতে এবং তাদের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। আর এইসব সকল তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করেছে রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। এই মামলা চলাকালীন সময়েই জিয়া পরিবারের দুর্নীতি নিয়ে এফবিআইয়ের সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি ডেবরা লাপ্রিভেট গ্রিফিথ বাংলাদেশের কাছে একটি তদন্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। ওই প্রতিবেদনে ছিল, ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যেভাবে দুর্নীতি হয়েছিল।

দুই মামলায় দণ্ডিত হয়ে সাজা খাটছেন খালেদা জিয়া: ইতিমধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়। আর একই বছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দুই মামলায় দণ্ডিত হয়ে তিনি ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় দুই বছর কারাগারে ছিলেন। খালেদা জিয়ার দণ্ড স্থগিত করে দুটি শর্তে সরকারের নির্বাহী আদেশে তাকে মুক্তি দেওয়া হয় ২০২০ সালের ২৫ মার্চ। তখন করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে তার পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর থেকে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ছয় মাস অন্তর অন্তর তার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। এই মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে আবারও শাস্তির মুখে পরতে পারেন বিএনপি নেত্রী।

উত্তরদক্ষিণ ১ম পৃষ্টা

গ্যাটকো দুর্নীতি মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি ১৭ মে: এদিকে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা গ্যাটকো দুর্নীতি মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি আগামী ১৭ মে তারিখ দিয়েছে আদালত। ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তেজগাঁও থানায় খালেদা জিয়াসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে গ্যাটকো দুর্নীতি মামলাটি করেন দুদকের উপপরিচালক গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী। ২০০৮ সালের ১৩ মে তদন্ত শেষে দুদকের উপপরিচালক জহিরুল হুদা খালেদা জিয়াসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। এ মামলায় আসামি ১৭ জন। এর মধ্যে সাত আসামির মৃত্যু হয়েছে।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading