আমেরিকার ব্যাংক খাতে একের পর এক ধস: বিশ্বজুড়ে আর্থিক খাতে অস্থিরতা বাড়ছে
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২২ মার্চ ২০২৩ । আপডেট ১২:৪২
আমেরিকার ব্যাংকিং খাতে বড় বিপর্যয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর উপরে চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সংকট বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিনিয়োগকারী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বৃদ্ধির কৌশল হাতে নিয়েছিল। সেটিই এখন ব্যাংকিং খাতের ওপর পাল্টা আঘাত হেনেছে। এ নিয়ে বিনয় দাসের প্রতিবেদন
আমেরিকান ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট: সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক ও সিগনেচার ব্যাংকের ধস নামার একটি প্রধান কারণ মোকাবিলা করতেও ফেডারেল রিজার্ভ জরুরি ভিত্তিতে অর্থ ধার দিয়েছে। ওই কারণটি হলো, ব্যাংক দুটি মোটামুটি নিরাপদ হিসাবে বিবেচিত ট্রেজারি এবং অন্যান্য বন্ডে বিনিয়োগ করেছিল, যেখানে সুদ ছিল খুব কম। নগদ অর্থের সংকটে পড়া আমেরিকান ব্যাংকগুলো গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের কাছ থেকে ৩০ হাজার কোটি ডলার ধার করেছে। তবে এ অর্থের প্রায় অর্ধেক পেয়েছে দুটো হোল্ডিং কোম্পানি, যাদের মালিকানাধীন দুই ব্যাংক আমেরিকান কর্তৃপক্ষ এক সপ্তাহের মধ্যে বন্ধ ঘোষণা করেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ফেডারেল রিজার্ভের তথ্য বলছে, সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক ও সিগনেচার ব্যাংকের দুই হোল্ডিং কোম্পানি সব মিলিয়ে ১৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ধার করেছে। এ দুটি ব্যাংকের ধসের ঘটনা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আর্থিক বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। তবে ৩০ হাজার কোটি ডলারের বাকি অর্থ আর কোন কোন ব্যাংক ধার করেছে কিংবা কতগুলো ব্যাংক অর্থ ধার করেছে, সে ব্যাপারে ফেডারেল রিজার্ভ কিছু জানায়নি। ব্যর্থ দুই ব্যাংকের দায়িত্ব নিয়েছে ফেডারেল ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স করপোরেশন (এফডিআইসি)। তাদের হোল্ডিং কোম্পানিরা যে অর্থ ধার করেছে, তা ব্যবহার করা হয়েছে বিমাবিহীন আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে। ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা বন্ড এ ক্ষেত্রে জামানত হিসেবে রাখা হয়েছে।
নগদ অর্থ তুলে নিচ্ছে আমানতকারীরা: গত সপ্তাহের শেষে ব্যাংকে ধস নামার পর অনেক ছোট ব্যাংক থেকে বড় ব্যাংকে আমানত চলে গেছে। বেশি কিছু বড় ব্যাংক, ব্যাংক অব আমেরিকা এ ধরনের তথ্য জানিয়েছে। সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক ও সিগনেচার ব্যাংক ব্যর্থ হওয়ার পর উদ্বিগ্ন আমানতকারীরা বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা তাদের হিসাব থেকে অর্থ তুলে নেওয়া শুরু করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধার করা অর্থের একটি অংশ সম্ভবত আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যবহার করছে।
সব ধরনের আমানতে বিমা দেয়ার দাবি: আমেরিকার মধ্যম সারির ব্যাংকগুলোর মধ্যে রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে এসব ব্যাংকের জোট দেশটির ফেডারেল ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স করপোরেশন বা এফডিআইসিকে অনুরোধ করেছে, শুধু আড়াই লাখ ডলার পর্যন্ত নয়, সব ধরনের আমানতেই যেন আগামী দুই বছর পর্যন্ত বিমা দেওয়া হয়। খবর সিএনসিবির মিডসআইজ ব্যাংক কোয়ালিশন অব আমেরিকা (এমবিসিএ) নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ অনুরোধ জানিয়েছে। সিএনবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিঠিতে এমবিসিএ বলেছে, এ মুহূর্তে সব অঙ্কের আমানতে বিমা দেওয়া হলে ছোট ও মাঝারি ব্যাংকগুলো থেকে গ্রাহকদের আমানত তুলে নেওয়ার হিড়িক থামবে। এতে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং এ খাতের ওপর মানুষের আস্থা ফিরবে।

‘ভঙ্গুর’ অবস্থায় রয়েছে আরও অন্তত ২০০ ব্যাংক: যে কারণে আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক (এসভিবি) কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, একই কারণে দেশটির আরও অন্তত ২০০টি ব্যাংক ‘ভঙ্গুর’ অবস্থায় রয়েছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। ওই গবেষণার বরাতে নিউ ইয়র্ক পোস্ট বলছে, আমেরিকার অন্তত ১৮৬টি ব্যাংক টালমাটাল হয়ে যেতে পারে যদি এগুলোর অর্ধেক গ্রাহক তাদের আমানত হঠাৎ তুলে নিতে শুরু করে। এতে এমনকি ব্যাংকগুলোর ‘পতনও’ ঘটতে পারে। এক সপ্তাহে আমেরিকার এসভিবি ও সিগনেচার ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধের পর বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাজারে দরপতনের মধ্যে সোশাল সায়েন্স রিসার্চ নেটওয়ার্কের (এসএসআরএ) এ গবেষণার তথ্য সামনে আনল নিউ ইয়র্ক পোস্ট। আমেরিকা ও ইউরোপ তোলপাড় করা এমন খবরের মধ্যে আমেরিকার ব্যাংকগুলোর দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে এসএসআরএ এর গবেষণায়। এতে বলা হয়, এমনকি ওই ১৮৬ ব্যাংকের বীমার আওতায় থাকা আমানতকারী অর্থাৎ যাদের জমা রাখা টাকার পরিমাণ আড়াই লাখ ডলার বা এর কম, তারাও টাকা পেতে সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন। যদি এসব ব্যাংকে এসভিবি এর মতো সংকট তৈরি হয়। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত এক অর্থনীতিবিদ বলেছেন, তাদের গবেষণা অনুযায়ী এই ব্যাংকগুলো অন্য সরকারি হস্তক্ষেপ বা পুনমূলধনের ব্যবস্থা না করা গেলে এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি কোনোভাবেই কমবে না।

বিপর্যয়ের ভয় বাড়াচ্ছে ক্রেডিট সুইসের পতন: আমেরিকার ব্যাংকিং সেক্টরে ব্যর্থতার পর ক্রেডিট সুইস ব্যাংকের শেয়ারের মূল্য এতোটাই পড়ে গেছে যে তা ইউরোপের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় ঋণপ্রদানকারী সংস্থাগুলোর ওপর প্রভাব ফেলছে আর এতে বিশ্বের ব্যাংকিং খাতে আরও গভীর সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই অস্থিরতার কারণে সুইস শেয়ার মার্কেটে ক্রেডিট সুইসের শেয়ার বাণিজ্য ভীষণ বাধার মুখে পড়ে। পাশাপাশি অন্যান্য ইউরোপীয় ব্যাংকের শেয়ারেরও দর পড়ে যায়, কোনো কোনোটির দরপতন দুই অঙ্কে গিয়ে পৌঁছায়।এদিকে, ওয়াল স্ট্রিটে শেয়ারের দরপতনের কারণে আবারও আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ে ব্যাংকগুলোর সামর্থের বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।আমেরিকার ট্রেজারি বিভাগ জানায়, তারা সুইস ব্যাংকটির সঙ্কটের দিকে দৃষ্টি রাখছে আর এ বিষয়ে বিশ্বের অন্যান্য সহযোগি সংস্থার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে।
বাইডেনের আশ্বাসেও মিলছে না সুফল: এদিকে, আমানতকারীদের আশ্বস্ত করতে এগিয়ে এসেছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সম্প্রতি তিনি জানিয়েছেন, সব গ্রাহক তাদের অর্থ ফেরত পাবেন। এছাড়া ব্যাংক কাøের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। বাইডেন জানিয়েছেন, সিলিকন ভ্যালি এবং সিগনেচার ব্যাংকের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা যেন তাদের সঞ্চিত অর্থ ফিরে পান সেজন্য অর্থমন্ত্রী জানেত ইয়েলেন এবং জ্যেষ্ঠ অর্থ উপদেষ্টা লায়েল ব্রেইনার্ড তার নির্দেশক্রমে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আমি খুশি তারা একটি সমাধানে পৌঁছেছে, যেটি ছোট ব্যবসা ও মার্কিনিদের অর্থ রক্ষা করবে এবং আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিরাপদ রাখবে। এই সমাধান আরও নিশ্চিত করেছে করদাতাদের অর্থ ঝুঁকিতে পড়বে না। তিনি আরও বলেছেন, এই বিশৃঙ্খলার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করব এবং এ ধরনের পরিস্থিতিতে যেন আমরা আর না পড়ি সেজন্য আমাদের ব্যাংতের নীতি আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কাজ করে যাব।

এশিয়া-ইউরোপে শেয়ারবাজারে পতন: আমেরিকার ব্যাংক খাতে অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে এশিয়ায়ও। দুটি মার্কিন ব্যাংকটি বন্ধ হওয়ার মধ্যে দিয়ে বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা সামনে আসে। ছোট ব্যাংকগুলোর সমস্যা ক্রেডিট সুইসের সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে। ঋণদাতা ও বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি সম্পর্কে উদ্বিগ্ন। ব্যাংকগুলো হয়তো তহবিল সংগ্রহে হিমশিম খাবে, যা বিশ্বব্যাপী এসএমই ও স্টার্টআপগুলোকে ব্যয় মেটানোর সমস্যায় ফেলবে। টোকিওর কেইও ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক সায়ুরি শিরাই বিবিসিকে এসব কথা বলেছেন। গত সপ্তাহে এশিয়াজুড়ে শেয়ারবাজারে ব্যপক দরপতন হয়েছে। ব্যাপক পতনের ফলে জাপান, হংকং ও অস্ট্রেলিয়ার শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকের ১ শতাংশের বেশি দরপতন হয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং জায়ান্ট ক্রেডিট সুইসের শেয়ারের দরপতনের পর ব্যাংক খাতে তীব্র সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর্থিক বিবরণীতে ‘দুর্বলতা’ খুঁজে পাওয়ার পরই ক্রেডিট সুইস ব্যাংকটির শেয়ারের পতন শুরু হয়। খবর বিবিসির। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং জায়ান্ট ক্রেডিট সুইস জানিয়েছিল, পতন ঠেকাতে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ নিচ্ছে। আর ক্রেডিট সুইসের এই ঘটনার মধ্যে এশিয়ার শেয়ারবাজারের এ খবর আসল।এদিকে গত সপ্তাহে ইউরোপের স্টক্স ইউরোপ ব্যাংকিং সূচকের পতন হয়েছে ৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে ডাও জোনস সূচকের পতন হয়েছে শূন্য দশমিক ৯ ও এসঅ্যন্ডপি সূচকের পতন হয়েছে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের এফটিএসই সূচকের পতন হয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
ইউডি/এজেএস

