শেকল ভেঙে বাঙালির মুক্তির জয়গান

শেকল ভেঙে বাঙালির মুক্তির জয়গান

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২৬ মার্চ ২০২৩ । আপডেট ১১:৪০

আজ বাঙালির গৌরবদীপ্ত দিন মহান স্বাধীনতা দিবস। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ১৯৭১ সালের এই দিনে বিশ্বের বুকে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর সেই ঘোষণার পথ ধরেই ৩০ লাখ শহিদ আর চার লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশ। এ অর্জন কালের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার। এ গর্ব বাঙালির। স্বাধীনতা ও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা নিয়ে আসাদুজ্জামান সুপ্ত’র প্রতিবেদন

মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলার মানুষের জনযুদ্ধ

২৫ মার্চ মধ্যরাতের আগে আগে পাকিস্তানিরা শুরু করে গণহত্যা। সেদিন মধ্যরাতের পর পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’ এই ঘোষণার পরে নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের সিঁড়ি বেয়ে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ চ‚ড়ান্ত বিজয় লাভ করে বাংলাদেশ। প্রতি বছর বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতায় দিনটি পালন করা হয়। স্মরণ করা হয় স্বাধীনতার জন্য আত্মদানকারী দেশের বীর সন্তানদের। জাতি শ্রদ্ধা জানায় মহান স্বাধীনতার রূপকার বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জাতীয় চার নেতা, নৃশংস গণহত্যার শিকার লাখো সাধারণ মানুষ এবং সম্ভ্রম হারানো মা-বোনের প্রতি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্তরের সব মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলার মানুষের জনযুদ্ধ। সশস্ত্র জনযুদ্ধের মধ্য দিয়েই মূলত বাংলার মানুষ বর্বর হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম চলেছে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বে। নিয়মিত বাঙালি সেনাবাহিনী, আধা সামরিক বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের দ্বারা গঠিত মুক্তিফৌজ মুজিবনগরের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দ্বারা সম্পূর্ণভাবে পরিচালিত হয়েছে। গণমানুষের জনআকাঙ্ক্ষার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। এ অর্জনকে অর্থবহ করতে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে হবে। পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামসদের মানবতাবিরোধী ভ‚মিকাকে যেন আমরা একটুও ভুলে না যাই। পাকিস্তানি হানাদারদের প্রেতাত্মারা আজও স্বাধীন বাংলাদেশে ছদ্মবেশে সক্রিয় দেশবিরোধী অপকর্মে, তাদের চিহ্নিত করে সতর্ক থাকাটাও বিশেষ জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু

স্বাধীনতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধাপে ধাপে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর বাঙালিরা অনুভব করে, তারা পাকিস্তান নামক নতুন ঔপনিবেশ পরাধীনতার নাগপাশে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পাকিস্তানি শাসনের শুরুতেই ভাষার প্রশ্নে একাত্ম হয় বাঙালি। বায়ান্ন পেরিয়ে চুয়ান্ন, বাষট্টি, ছেষট্টির পথ বেয়ে আসে ১৯৬৯। প্রবল গণ-অভ্যুত্থানে কেঁপে ওঠে তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুবের মসনদ। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো-বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা- পদ্মা মেঘনা যমুনা, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গ্রাম-শহর, জনপদ। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ওই রাতেই তৎকালীন পূর্ব বাংলার পুলিশ, ইপিআর ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা শুরু করে প্রতিরোধ যুদ্ধ, সঙ্গে যোগ দেয় সাধারণ মানুষ। ৯ মাসের যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর দেশ শত্রুমুক্ত হয়।

চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিশ্বের বুকে স্বনির্ভর এক রাষ্ট্র

বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই বিশ্বের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার এক দেশ। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিশ্বের বুকে এক স্বনির্ভর রাষ্ট্র। উন্নয়নের ধারাবাহিকতার প্রতীক। শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, শিল্প, কৃষি, মানব উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ প্রগতির মডেল। তাই স্বাধীনতার ৫২ বছরে বাঙালি আজ শ্রদ্ধায় স্মরণ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তার দেখানো সোনার বাংলার স্বপ্নের পথ ধরেই আজকের বাংলাদেশ। যার নেতৃত্বে আছেন বঙ্গবন্ধুরই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাথা পিছু আয় বৃদ্ধি, রিজার্ভের পরিমান বহুলাংশে বৃদ্ধি ও জিডিপিতে বাংলাদেশ আজ অনেক দেশকেই অতিক্রম করে চলেছে। যমুনা নদীর উপর বংগবন্ধু সেতু,পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল নির্মান এখন বাস্তবতা। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে,রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা বন্দর, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দরসহ মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। শতাধিক ইকোনোমিক জোন, চট্রগ্রাম -কক্সবাজার রেললাইন আর জেলায় জেলায় ফেরির বদলে বড় বড় সেতু এখন বাস্তবতা। বাংলাদেশের জন্মের বেদনা ছিট মহল সমাধান ও সমুদ্রে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা শেখ হাসিনা সরকারের বা স্বাধীন দেশের বিরাট অর্জন। খাদ্য ও বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, তথ্য প্রযুক্তিতে স্বপ্নের চেয়ে এগিয়ে যাওয়া, এক যুগের বেশি সময় ধরে প্রাথমিকের চার কোটি বই বছরের প্রথম দিনে ছাত্র ছাত্রীদের হাতে তুলে দেয়া। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা, সামাজিক বেষ্টনীর আওতায় বিধবা ভাতা, বয়স্ক ও স্বামী পরিত্যাক্ত ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বিশ হাজার টাকা নির্ধারণ করা, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়াসহ নানা ধরণের সামাজিক সুরক্ষামুলক কাজ করে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আর এগুলোই শহিদদের আত্মত্যাগের স্বার্থকতা।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৬ মার্চ ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা

উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে

বাংলাদেশের নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও দেখা যায় তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা, উৎকর্ষের প্রমাণ। তরুণ প্রজন্ম সব সময় সৃষ্টিশীল কাজ করে। তাদের মাঝে নিত্যনতুন আবিষ্কারের প্রবণতা আমরা নিশ্চয় লক্ষ করে থাকি। আমরা যে সীমাবদ্ধতা নিয়ে বড় হয়েছি, তা ছাড়িয়ে যাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। কারণ তাদের মাঝে সম্ভাবনা আছে। বিশেষ করে করোনা-উত্তর যে পৃথিবী, এখানে আমাদের তরুণদের ওপর নির্ভর করতে হবে। বিশ্লেষকগণ বলেন, করোনা-উত্তর পৃথিবী কিন্তু একেবারেই নতুন হবে। কাজেই এই নতুন পৃথিবীতে তরুণ প্রজন্মকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। তাই তাদের প্রস্তুত করতে হবে এবং তারাই দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেবে। এটিই প্রত্যাশা করি। নিশ্চয়ই আমরা আমাদের দেশমাতৃকার প্রতি প্রকৃত দায়িত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। বীর শহীদেরা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে, এ দেশ কি তা দিতে পেরেছে? কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে আমরা কি পৌঁছাতে পেরেছি? এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মতামতও প্রণিধানযোগ্য। তারা বলেছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকেই দেশমাতৃকাকে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে রক্ষার জন্যে কলম ছেড়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছিলেন। বর্তমান প্রজন্মকে অস্ত্র ধরতে হবে না। তাদের কলম যুদ্ধ করতে হবে, মেধার যুদ্ধ করতে হবে। সেই যুদ্ধ হবে দেশের ভিতরে এবং দেশের বাইরে। আর সেই যুদ্ধের মাধ্যমে গৌরব ছিনিয়ে আনতে হবে।

স্বাধীন রাষ্ট্র মানচিত্র আর পতাকা বাঙালি জাতির চির গৌরবের

দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে এগিয়ে যাবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বিশ্বের বুকে বাংলার মানচিত্র জÍল জÍল করবে, লাল-সবুজের পতাকা উড়বে। সারা বিশ্বের বাঙালি আবারও গর্বভরে গাইবে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading