ইউক্রেন যুদ্ধ: পারমানবিক সংঘাতের দিকে মোড় নিচ্ছে?
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২৭ মার্চ ২০২৩ । আপডেট ১৪:১০
বেলারুশে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র স্থাপনের কথা জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। পুতিনের এভাবে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র স্থাপন বাকি বিশ্ব, বিশেষ করে পশ্চিমাদের জন্য একটি বিশেষ বার্তা। তবে কী ইউক্রেন যুদ্ধ পারমানবিক সংঘাতের দিকে মোড় নিতে চলেছে? এ নিয়ে মিলন গাজী’র প্রতিবদেন
বেলারুশে পারমানবিক অস্ত্র মোতায়নের ঘোষণা পুতিনের: ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝির পর এই প্রথম রাশিয়া অন্য কোনো দেশে নিজেদের পারমানবিক অস্ত্র মোতায়ন করতে যাচ্ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বেলারুশে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র স্থাপনের কথা জানিয়েছেন, তবে মস্কো নিজেদের অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ মিনস্কের কাছে হস্তান্তর করবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি। যদিও পুতিন রাশিয়ার রাষ্ট্রায়াত্ত সংবাদ মাধ্যমে বলেছেন, তার এই পদক্ষেপ পরমাণু অপ্রসারণ চুক্তি লঙ্ঘন করবে না। তিনি বরং তুলনা টেনে বলেন, কয়েক দশক ধরে আমেরিকা ইউরোপে তাদের (পরমাণু) অস্ত্র স্থাপন করেছে। এটা তেমনই। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্ক রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ইউক্রেইনে রাশিয়ার আগ্রাসনের একনিষ্ঠ সমর্থক। লুকাশেঙ্ক অনেক দিন ধরেই বেলারুশে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র স্থাপনের কথা বলে আসছেন জানিয়ে পুতিন আরো বলেন, ‘এখানেও অস্বাভাবিক কিছু নেই। প্রথমত, গত কয়েক দশক ধরে আমেরিকা এটা করে আসছে। তারা দীর্ঘদিন ধরেই তাদের মিত্র দেশগুলোর ভ‚মিতে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র স্থাপন করেছে। আগামী ১ জুলাইয়ের মধ্যে রাশিয়া বেলারুশে তাদের কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রাগারের নির্মাণের কাজ শেষ করবে বলেও জানান পুতিন। তিনি আরও বলেন, পরমাণু অস্ত্র উৎক্ষেপণের জন্য অল্প কিছু ইস্কান্দার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এরইমধ্যে বেলারুশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে কবে নাগাদ কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র বেলারুশে পাঠানো হবে সে বিষয়ে কিছু জানাননি এই নেতা। ১৯৯১ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর জন্ম নেওয়া চারটি নতুন স্বাধীন দেশ রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ ও কাজাখস্তানে পরমাণু অস্ত্র ছিল। ওইসব পরমাণু অস্ত্র ১৯৯৬ সালের মধ্যে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। স¤প্রতি ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তার পশ্চিমা মিত্রদের কাছে যুদ্ধের জন্য আরো সামরিক সহায়তা চেয়েছেন। এরপরই পুতিনের এই ঘোষণা এলো।

‘রুশ-মার্কিন পরমাণু যুদ্ধের সর্বোচ্চ ঝুঁকি রয়েছে’: আমেরিকার সঙ্গে রাশিয়ার পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। রুশ উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ সম্প্রতি এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। মস্কোয় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এমন মন্তব্য করেন বলে রুশ বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে। রিয়াবকভ জানান, গত ফেব্রæয়ারি মাসে রাশিয়া পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক নিউ স্টার্ট চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছে সেটি নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে গোপনে বা প্রকাশ্যে কোনো আলোচনা হবে না। তিনি মস্কোর প্রতি ওয়াশিংটনের ‘বিদ্বেষ নীতি’র তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, এই মুহূর্তে ওই চুক্তিতে রাশিয়ার ফিরে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তিনি একথাও বলেন যে রাশিয়া বিশ্বকে পারমাণবিক যুদ্ধ থেকে ‘মুক্ত ও নিরাপদ’ রাখার প্রতিশ্রুতিতে অটল রয়েছে। তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকা সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত হওয়ায় ওই প্রতিশ্রুতি কতক্ষণ রক্ষা করা যাবে সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রাশিয়ার ঘোষণা আমলে নিচ্ছে না আমেরিকা: পুতিনের এই ঘোষণার পর আমেরিকা বলেছে, রাশিয়া পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমনটা তারা বিশ্বাস করে না। আমেরিকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে আরো বলা হয়, আমরা আমাদের নিজস্ব কৌশলগত পারমাণবিক অবস্থানের মধ্যে সামঞ্জস্য আনার কোন কারণ দেখিনি। আমরা নেটো জোটের সম্মিলিত প্রতিরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মার্কিন এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, রাশিয়া এবং বেলারুশ বিগত কয়েক বছর ধরেই এমন কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এখনো আমরা এমন কোনও লক্ষণ দেখিনি যা দেখে মনে হতে পারে রাশিয়া কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে যাচ্ছে। ওই শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, আমরা বেশ কয়েকবার মস্কো এবং মিনস্কের মধ্যে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র স্থানান্তরের বিষয়ে আলাপ হয়েছে বলে জেনেছি। তিনি বলেন, এ অবস্থায় আমাদের কৌশলগত পরমাণু অস্ত্রগুলোর অবস্থান পুনরায় সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি না। কারণ, রাশিয়া পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করবে এমন কোনো লক্ষণ দেখতে পাইনি।

পশ্চিমা সহায়তা ছাড়া যুদ্ধ করবেন না জেলেনস্কি: ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, পশ্চিমারা আরও সামরিক সহায়তা না পাঠানো পর্যন্ত রাশিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ শুরু করা যাবে না। জাপানের একটি সংবাদপত্রকে তিনি বলেছেন, আরও ট্যাংক, আর্টিলারি ও হিমারস রকেট লঞ্চার ছাড়া সৈন্যদের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হবে না। ইয়োমিউরি শিম্বুনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, পূর্ব ইউক্রেনের পরিস্থিতি ‘ভালো নয়’। আমরা আমাদের মিত্রদের কাছ থেকে গোলাবারুদ আসার অপেক্ষা করছি। সাক্ষাৎকারে পাল্টা আক্রমণ সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলেনস্কি বলেন, আমরা এখন পাল্টা আক্রমণ শুরু করতে পারি না। কারণ আমাদের কাছে ট্যাংক, আর্টিলারি ও দূরপাল্লার রকেট নেই। এগুলো ছাড়া আমরা আমাদের সাহসী সৈন্যদের ফ্রন্ট লাইনে পাঠাতে পারি না। পশ্চিমা নেতাদের উদ্দেশ্য করে জেলেনস্কি বলেন, আপনাদের যদি রাজনৈতিক ইচ্ছা থাকে তাহলে আমাদের সাহায্য করার উপায় খুঁজে পাবেন। আমরা যুদ্ধের মধ্যে আছি, অপেক্ষা করতে পারি না। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী তাদের প্রতিপক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলতে পাল্টা আক্রমণের কথা বলছে। তারা চায় যে, রাশিয়ান কমান্ডাররা তাদের সৈন্যদের পূর্বের শহর বাখমুতের মতো নির্দিষ্ট স্থানে কেন্দ্রীভ‚ত করার পরিবর্তে রুশ বাহিনীকে সামনের লাইনে ছড়িয়ে দিক।

পুতিনকে যুদ্ধ শেষ করার আহ্বান এরদোয়ানের: বিশ্বব্যাপী খাদ্য মূল্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কৃষ্ণ সাগর দিয়ে শস্য চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোকে ইতিবাচক মনোভাব বলে মন্তব্য করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান। ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপে এ কথা বলেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। এসময় অবিলম্বে যুদ্ধ শেষ করতে পুতিনের প্রতি আবারও এর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। তুরস্কের যোগাযোগ অধিদফতর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তুরস্ক আলোচনার মাধ্যমে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের অবসান চায়। এর গুরুত্ব পুতিনের কাছে তুলে ধরেছেন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। কৃষ্ণ সাগর দিয়ে শস্য রফাতানি নিয়ে যে চুক্তি হয়েছে, তা পুনরায় বাড়ানোর জন্য রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনকে ধন্যবাদ জানান তুর্কি প্রেসিডেন্ট। ইউক্রেনের শস্য চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রেও তুরস্কের গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা ছিল। কৃষ্ণসাগর হয়ে ইউক্রেনীয় খাদ্যশস্য রফতানি পুনরায় শুরু করতে গত বছরের ২২ জুলাই ওই চুক্তিতে উপনীত হয় রাশিয়া ও ইউক্রেন। চুক্তিতে ইউক্রেনীয় খাদ্যশস্যের পাশাপাশি রাশিয়ায় উৎপাদিত খাদ্যশস্য এবং সারও বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে এই চুক্তি। আঙ্কারার পক্ষ থেকে বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, তুরস্ক ও রাশিয়ার সম্পর্ক আরও মজবুতে আলোচনা করেছেন এরদোয়ান-পুতিন।
রাশিয়াকে ঠেকাতে এক হচ্ছে চার দেশের বিমান বাহিনী: রাশিয়ার বাড়তে থাকা হুমকি মোকাবিলার লক্ষ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ নর্ডিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে যাচ্ছে সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড এবং ডেনমার্ক। নর্ডিক অঞ্চলের এ চার দেশের বিমান বাহিনীর কমান্ডাররা ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি চিঠিতে সই করেছেন। চারটি দেশের সশস্ত্র বাহিনী সম্প্রতি এক বিবৃতিতে জানায়, ন্যাটোর মতোই আমরা যৌথভাবে কাজ করবো। সে উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাচ্ছি। ডেনিশ বিমান বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল জান ড্যাম বলেন, ইউক্রেনে গত বছরের ফেব্রুয়ারি রুশ আগ্রাসনের পর বিমান বাহিনীকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়। আমাদের সম্মিলিত বহরকে একটি বড় ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। নরওয়ের কাছে আছে ৫৭টি এফ-১৬ ফাইটার জেট, ৩৭টি এফ-৩৫ ফাইটার কেনার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ফিনল্যান্ডের ৬২টি এফ/এ-১৮ হর্নেট জেট রয়েছে, ৬৪টি এফ-৩৫ যুক্ত হবে দ্রুত। এ ছাড়া ডেনমার্কের রয়েছে ৫৮টি এফ-১৬ এবং চাহিদা দেওয়া আছে আরও ২৭টি এফ-৩৫ ফাইটার জেটের। আর সুইডেনের ৯০টিরও বেশি গ্রিপেন জেট রয়েছে। এসব বিমানের মধ্যে কতটি বিমান চালু আছে, তা স্পষ্ট নয়। গত সপ্তাহে জার্মানির রামস্টেইন বিমান ঘাঁটিতে যখন চিঠিতে সই হচ্ছিল, তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন ন্যাটো এয়ার কমান্ডের প্রধান জেনারেল জেমস হেকার। এই হেকার এই অঞ্চলে মার্কিন বিমান বাহিনীকে দেখভাল করেন। সুইডেন এবং ফিনল্যান্ড গত বছর ট্রান্সআটলান্টিক সামরিক জোটে যোগদানের জন্য আবেদন করেছিল। তবে তুরস্কের বাধায় প্রক্রিয়াটি আটকে গেছে। একই বিপদে আছে হাঙ্গেরিও। নর্ডিক এয়ার ফোর্স কমান্ডাররা গত নভেম্বরে সুইডেনে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার বিষয়ে প্রথম আলোচনা করেছিলেন। ড্যাম বলেন, ‘আমরা আমাদের আকাশপথের নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে চাই। একে অপরের নজরদারি সিস্টেম থেকে ডেটা ব্যবহার করে তা সম্মিলিতভাবে ব্যবহার করতে চাই।
ইউডি/এজেএস

