বাফুফে সভাপতি সালাউদ্দিনের হাতে দেশের ফুটবল কোন পথে?
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৩ । আপডেট ১৬:৫০
বাংলাদেশের সাফজয়ী নারী ফুটবল দল অর্থের অভাবে মিয়ানমারে অলিম্পিক বাছাই পর্বে খেলতে যেতে পারে নি। এক যুগ ধরে টানা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি পদে থাকা কাজী সালাউদ্দিনের এমন বক্তব্য নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। শুধু তাই নয় তার মেয়াদকালে দেশের ফুটবলের অবস্থান নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। এক সময়ের দুর্দান্ত ফুটবলার সালাউদ্দিন বাফুফে’র ‘সভাপতি’ হিসেবে কতটা যোগ্য তাই নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার কমতি নেই। এ নিয়ে বিনয় দাস’র প্রতিবেদন
অলিম্পিক বাছাইয়ে নারী দলের যেতে না পারার দায় কার?
সাফজয়ী নারী ফুটবল দলকে মিয়ানমারে অলিম্পিক বাছাই পর্বে খেলতে না পাঠিয়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বেশ ঝড় তুলেছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত তার রেশ পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন সংবাদ সম্মেলন ডেকে জানিয়েছিলেন, বাফুফের কাছে এখন মেয়েদের এই দলটিকে মিয়ানমার পাঠানোর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ নেই। তিনি বলেন, বাফুফের খরচ বছরে কম করে হলেও ৬০ কোটি টাকা, কিন্তু রয়েছে ৩০ কোটির মতো। বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল চলতি মাসের ২৪ তারিখ এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনস – এফসি বাছাইপর্বে খেলতে সিঙ্গাপুর যাবে, তবে তার খরচ আসবে এএফসির তহবিল থেকে। বাফুফে প্রেসিডেন্ট চলতি মাসের তিন তারিখ এই সংবাদ সম্মলনে বলেন, তিনি ভেবেছিলেন অলিম্পিক কমিটি বাছাইপর্বে সফরের খরচ ফাইনান্স করবে। অথচ, এ বিষয়ে তিনি পূর্বে থেকে কোনো পরিকল্পনাই গ্রহণ করেন নি। শুধু তাই নয় নারী ফুটবল দলের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়া নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে বাফুফে নারী দলকে সঠিকভাবে পরিচালনা করছে না যেটা একটা আন্তর্জাতিক দলকে তরা হয়।
মেয়েদের সাথে একরকম অন্যায় করা হয়েছে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল গণমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন, অল্প কিছু টাকার জন্য ইচ্ছে করে বাফুফে অলিম্পিক বাছাইয়ে দল পাঠায়নি। মিয়ানমারে নারী ফুটবল দলকে পাঠানোর খরচ বাবদ অর্থ চেয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ২৭শে মার্চ ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু ২৯ তারিখই তারা বিবৃতি দেয় যে নারী দলটিকে তারা সফরে পাঠাতে পারছে না, এতে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বলছে এটা ‘বাফুফের অজুহাত’। এই অলিম্পিক বাছাইয়ে ইন্ডিয়া উত্তীর্ণ হয়েছে, বাংলাদেশেরও সুযোগ ছিল, এখন ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বলছে, এটা মেয়েদের সাথে একরকম অন্যায়’। ক্রীড়া মন্ত্রণালয় মনে করছে, বাফুফে এই বিষয়টি নিয়ে অবহেলা করেছে এবং যখন আর কোনও সুযোগ নেই তখন তারা বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ওপর দোষ চাপিয়ে দিয়েছে। এমন ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিৎ বলে মনে করেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। এ বিষয়ে বুধবার (১২ এপ্রিল) জরুরি বৈঠক শেষে বাফুফে থেকে জানানো হয়েছে, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। তবে দূরত্ব তৈরি হয়নি। কাজ করতে গেলে ভুল হয়। ভুল না হলে সংশোধনের সুযোগই বা কোথায়। এমন কথাই জানিয়ে গেলেন বাফুফের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান মানিক।
থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হওয়ায় নারীদের বেতন নেই! বাংলাদেশ দলের এক নারী ফুটবলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, সাফের পর আর তাদের বেতন দেয়া হয়নি। সাফের আগে ১০ হাজার টাকার মতো দেয়া হতো। এ বিষয়ে বাফুফের একজন মুখপাত্র বলেন, এই নারী ফুটবলারদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে বাফুফে তাই বেতন নিয়ে আলাদা করে ভাবা হয়নি। মিয়ানমার সফর যখন বাতিল হয়েছে ওই সময়ে বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা একটা বিদ্রোহের ডাক দিয়ে তিনদিন অনুশীলন থেকে দূরে ছিলেন। বাফুফের কাছে নারী ফুটবলারদের পাঁচটি দাবি ছিল। যার মধ্যে বেতন ছিল প্রধান ইস্যু, এছাড়া বোনাস ও ম্যাচ ফি চেয়েছেন তারা এবং ক্যাম্পের খাবারের মান নিয়েও অভিযোগ করেন নারী ফুটবলাররা। বাংলাদেশ ফুটবল দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশের নারী ফুটবলে পেশাদারিত্ব নেই। পেশা হিসেবে তাই অনেকেই ফুটবল নিতে চাইবেন না। বাস্তবতা অনেকটা এমনই, পেশাদারিত্বের অভাবে বাংলাদেশের নারী ফুটবলকে অল্প বয়সে বিদায় জানিয়েছেন অনেকেই।
সালাউদ্দিনের ব্যর্থতাগুলো সফলতার চেয়ে অনেক গুরুতর: সাবেক ফুটবলার রাশেদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, কাজী সালাউদ্দিন যে সার্বিকভাবে ব্যর্থ হয়েছেন তা নয় কিন্তু তার ব্যর্থতাগুলো তার সফলতার চেয়ে অনেক গুরুতর। তিনি উদাহরণ হিসেবে টানেন ২০০৯ সালের কোটি টাকার সুপার কাপকে, এই টুর্নামেন্টটি বাংলাদেশের ফুটবলে আবারও দর্শক ফিরিয়েছিল। কিন্তু বাফুফে এটা ধরে রাখতে পারেননি, নানা সময় ক্লাব ও পৃষ্ঠপোষকদের আস্থা হারিয়েছে বাংলাদেশ ফুটবলের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বাফুফের বাজেট ঘাটতি আড়াই কোটি টাকা: টাকার অভাবে মিয়ানমারে অলিম্পিক বাছাইয়ে সাফজয়ী নারী ফুটবল দলকে পাঠাতে না পারায় আগামীতে যেন এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয় সেজন্য সজাগ ফুটবল ফেডারেশন। আগামী আসরগুলোতে যেন এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয় তা নিয়ে বুধবার (১২ এপ্রিল) বাফুফে ভবেনে আলোচনায় বসেছিলেন কর্তাব্যাক্তিরা। এ বছরে মেয়েদের বাকি সফরের জন্য সম্ভাব্য বাজেটও নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ঘাটতি রয়েছে প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণের জন্য আবারও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়েছে বাফুফের পক্ষ থেকে। বাফুফের জরুরি সভা ফেডারেশনের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের বাইরে থেকে অনলাইনে যোগ দিয়েছিলেন অন্যতম সহসভাপতি কাজী নাবিল আহমেদ। জরুরি সভা শেষে বাফুফের সহসভাপতি আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মেয়েদের ফুটবলে সূচি আছে। এই বছরে মেয়েদের টুর্নামেন্টে অংশ নিতে আর্থিক বিষয়গুলো আছে। ফিফা-এএফসি ও স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ ছাড়াও যে ঘাটতি থাকে তা দ্রুত বাজেট তৈরি করে বোর্ডে আবার আলোচনা করবো এবং প্রয়োজনে এই অর্থ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে চাইবো। যেন ভবিষ্যতে সমস্যা না হয়।
বিদেশি কোচদের বেতন নিয়ে চলে গড়িমসি: শুধু তাই নয় বিদেশি কোচদের বেতন নিয়ে গড়িমসির খবরেও বাফুফে বিভিন্ন সময় এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন্স ও ফিফার ‘কারণ দর্শানো নোটিশ’ পেয়েছে। রাশেদুল ইসলাম আরও বলেন, সাফে খেলে ৫ থেকে ৮টি দল। এমন একটি টুর্নামেন্টেও টানা চার-পাঁচ আসরে বাংলাদেশ সেমিফাইনালও খেলতে পারেনি। এতে বোঝা যায় কাজী সালাউদ্দিনের আমলে বাংলাদেশের পুরুষ ফুটবল দলটি কোন অবস্থায় আছে। তবে তিনি যোগ করেছেন, এই সময়ে নারী ফুটবলে উল্লেখযোগ্য উন্নতি নিয়ে এসেছে বাফুফে। কিন্তু তাতে আসলে ফুটবলারদের জীবনে খুব বেশি পরিবর্তন আসছে না।

ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে বাফুফে’র প্রতিযোগীতা না হিংসে?
সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলনে বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন অনেকটা আচমকাভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসানকে ইঙ্গিত করে ‘ব্যক্তিগত আক্রমণ’ করে বসেন। এরপর চুপ থাকেননি ক্রিকেট বোর্ড প্রেসিডেন্ট। তিনিও কাজী সালাউদ্দিনকে পাল্টা কথা ছুঁড়ে দিয়েছেন। চলতি এপ্রিল মাসের তিন তারিখের সেই সংবাদ সম্মেলনে, প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে টাকা নিয়ে নারী ফুটবল দলকে মিয়ানমারে পাঠানো যেতো কিনা এমন প্রশ্নে সালাউদ্দিন কানে ফোন নেয়ার মতো ভঙ্গি করে, লোক দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ফোন দেয়া আমার চরিত্র নয়। তার সেই ভঙ্গি ও কথায় ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসানের প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল। এই বক্তব্য নিয়ে নাজমুল হাসান বলেন, প্রধানমন্ত্রী যখনই ফোন দেবেন আমি ধরবোই। গত বছর বাংলাদেশের নারী ফুটবল দল সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা জয়ের পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ৫১ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে দলটির জন্য। বিসিবি গত সপ্তাহে এই অঙ্কের চেক নারী ফুটবল দলের হাতে তুলে দেয়। নাজমুল হাসান পাপন এ নিয়ে বলেন, চেক অনেক আগেই রেডি ছিল, এটা নিতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কেউই যোগাযোগ করেননি। তিনি আরও বলেন, এই অল্প টাকার জন্য মেয়েরা একটা টুর্নামেন্টে যেতে পারেনি, এটা শুনে তিনি কষ্ট পেয়েছেন। আমাদের ক্রিকেটারদের কাউকে বললেও ২০ লাখ টাকা ম্যানেজ হয়ে যেত।
ইউডি/কেএস

