পশ্চিমবঙ্গের লস্কর আটি গ্রাম রাতবিরাতেও নিরাপদ

পশ্চিমবঙ্গের লস্কর আটি গ্রাম রাতবিরাতেও নিরাপদ

হানজালা শিহাব, কলকাতা থেকে । সোমবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৩ । আপডেট ২০:৩০

ঘড়ির কাটায় তখন রাত তিনটা। নির্জন অন্ধকার রাস্তা, লাইট পোস্ট নেই। কিছুক্ষণ পর পর হেডলাইট জ্বালিয়ে ছোট পিকআপ বা মোটরসাইকেল দ্রুত গতিতে চলে যাচ্ছে। সে রাস্তা দিয়েই হেঁটে যাচ্ছেন এক তরুণী। পরনে টু পিস। তার চলাচলে কোনো ভয় বা শঙ্কার ছাপ নেই। এলাকাটিতে শহরের হাওয়া আছে তবে এটি পাড়া গ্রামই বলা যায়। রাস্তাটি পাকা; দূরে কিছু বড় ভবন আছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। কিছুটা দূরত্বে রাস্তার পাশে ছোট ছোট ঝুপড়ি দোকানও আছে। এই গভীর রাতে যেগুলো একেবারেই নীরব। কোনোটিতে মিটমিট করে আলো জ্বলছে। আবার কোনোটি অন্ধকারে ঢাকা। ভুতের বাড়ির মতো। হোক রাত তিনটা, হোক নির্জন অন্ধকার পথ-বিশোর্ধ্ব তরুণী এই রাস্তায় সম্পূর্ণ নিরাপদ। তিনি এতোটুকু নিশ্চিত যে, এই পথে কেউ হিংস্রের মতো তাকে আক্রমণ করবে না। অর্থাৎ এখানে সামাজিক নিরাপত্তা রয়েছে। এই তরুণীর মত অনেকেই এভাবে রাতে পথ চলছেন শঙ্কা মুক্ত হয়ে। এখানকার এই জনপদ এমন নিরাপদ।

ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে কলকাতা নগরীর কাছেই নিউটাউন, টাটা ইকোনমিক জোন গেট ওয়ান, পাশের লস্কর আটি এবং এর আশপাশের জনপদের চিত্র এমনটি। বিশেষ করে লস্কর আটি একটি গ্রাম। এটি কোনো পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের অধীন নয়। পঞ্চায়েত শাসিত একটি এলাকা।
গভীর রাতে শুধু তরুণীই নন, বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ চলাফেরা করেন এখানে। ছিনতাই, ধর্ষণ বা নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা নেই কারো মনে। কেউ আপনাকে জিজ্ঞাসা করবে না, আপনি কে? কোথা থেকে আসছেন? কোথায় যাচ্ছেন? আপনি পথ চলতে পারেন একেবারে নির্ভাবনায়।

মুসলিম অধ্যুষিত এই জনপদের অধিবাসীরা সবার জন্য এমন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। বিষয়টি অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। এটি নিজ চোখে দেখার সুযোগ হলো প্রথমবারের মতো ইন্ডিয়া সফরে এসে। সেদিন ছিল ৯ এপ্রিল, রবিবার। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসে এই গ্রামের একটি বাড়িতে ভাড়ায় উঠলাম। পবিত্র রমজান মাস। ভোর রাতে সাহরি খাওয়ার জন্য বের হলাম। সাথে আমার সাবেক কলিগ ইব্রাহিম খলিল। গভীর অন্ধকারে মোবাইল ফোনের আলোতে নির্জন পথে দুজনে কিছু দূর যাওয়ার পর একটি দোকান খোলা পেলাম। বেশ কয়েকজন যুবক সেখানে দেখতে পেলাম। তরুণীও আছে। তারা আড্ডা দিচ্ছে, গল্প করছে, খাচ্ছে। আমরা ভাত খেতে চাইলাম। কিন্তু সেখানে ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। তবে আরও বেশ কিছু দূরত্বে টাটা ইকনোমিক জোনের গেট ওয়ান-এর সামনে খাবার পাওয়া যাবে বলে আমাদের সন্ধান দেওয়া হলো। আমরা জানতে চাইলাম, এত রাতে আমাদের হেঁটে যাওয়ার পথে কোনো নিরাপত্তা শঙ্কা আছে কিনা! এক যুবক আমাদের আশ্বস্ত করলেন, কেউ প্রশ্নও করবে না; আমরা কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত সাহস করে হাঁটতে শুরু করলাম। একটা ফ্লাইওভার পার হয়ে প্রায় ১৫ মিনিটের পথ হেঁটে পৌঁছলাম গেট ওয়ানের সামনে। অনেকগুলো দোকান। সবগুলোই তরুণ তরুণীতে ঠাসা। তরুণীদের বেশিরভাগই টু পিস পরিহিত। সর্ট স্কার্ট আর টি-শার্ট বা টপস পরা মেয়েদের সংখ্যাও কম নয়। অনেকে গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পরে ছেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছেন, খাচ্ছেন। দোকানগুলোতে নানা রঙের লাইট জ্বলছে, সেই সাথে হিন্দি গান বাজছে। সড়কের পাশে প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল পার্ক করে রাখা; সংখ্যায় অনেক।

আমরাও ওই খাবার হোটেলগুলোর একটিতে ঢুকে খালি টেবিলে বসে পড়লাম। বাসমতি চালের সাদা ভাত, সবজি আর আন্ডা (ডিম) ভাজা দিয়ে এ রাতের সাহরি করলাম। জানলাম, এভাবেই সারারাত জেগে থাকে পশ্চিমবঙ্গের নিউটাউন আবাসিক এলাকার গেট ওয়ান। ফেরার পথে একটি টি শার্ট ও সালোয়ার পরা তরুণীর সাথে দেখা। লস্কর আটির গভীর অন্ধকার নির্জন সড়কে নির্বিঘ্নে পথ চলছেন একাই।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading