যে শহরের সৌন্দর্য মুগ্ধতা ছড়ায়

যে শহরের সৌন্দর্য মুগ্ধতা ছড়ায়

হানজালা শিহাব, কলকাতা থেকে । মঙ্গলবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৩ । আপডেট ০৮:০০

রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ নেই। আপনাকে ধরে কেউ গাড়ির কাগজপত্র চেক-এর নামে অযথা হয়রানি করছে না। জরিমানা করছে না। মামলা দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে না। কিন্তু গাড়িগুলো অটো সিগনালে দাঁড়িয়ে আছে। লাল বাতি জ্বললে বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা- কেউ সামনে যাওয়ার চিন্তা করে না।
আবার অযথা যেখানে সেখানে গাড়ি পার্কিং করছে না কেউ। যাত্রীবাহী বাসের পারাপারি নেই। রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে যানজট সৃষ্টির দৃশ্যও দেখা যাচ্ছে না। নির্ধারিত স্থানে যাত্রী ওঠানামা করছে। এক মিনিটের বেশি বাস কোথাও দাঁড়াচ্ছে না। ভাড়া নিয়ে বাসের কন্ডাক্টারের সাথে যাত্রীদের কোনো বিরোধ নেই। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এক টাকাও বেশি নিচ্ছে না কন্ডাক্টর। যাত্রীও এক টাকা কম দেয়ার চিন্তা করছে না। সবাই আইন মেনে চালছে।
এটি নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস বা পশ্চিমা কোনো দেশের গল্প নয়। বাংলাদেশেরই একেবারে কাছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা ও তার আশপাশের শহরগুলোর চিত্র। কলকাতা থেকে হাওড়া, শিয়ালদা, নিউটাউন এবং আশপাশের শহরগুলোতে চলাচলকারী বাসগুলোর বেশিরভাগই পুরনো মডেলের। তবে প্রতিটি বাসে পুরুষ যাত্রীর প্রায় সমপরিমাণ মহিলা যাত্রীর জন্য আসন সংরক্ষিত। ফলে মহিলারা বাসে উঠে সহজে সিট পেয়ে যাচ্ছেন। কোনো হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে না।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা শহর

কলকাতার পরিবেশ: যদি আপনি কলকাতা শহরে নতুন হন এবং ব্যানার্জি সড়ক ধরে নিউ মার্কেট, তালতলা, শিয়ালদা, সল্টলেক হয়ে নিউটাউন যেতে রাস্তা ও এর দুপাশের কিছু দৃশ্যও আপনাকে মুগ্ধ করবে। এর মধ্যে তালতলা, শিয়ালদা, নিউ মার্কেটসহ কাছাকাছি এলাকার দৃশ্যগুলো ঢাকার নিউ মার্কেট ও পুরান ঢাকার সাথে অনেকটাই সাদৃশ্য। এখানকার ঘরবাড়ি, দোকানপাট, রাস্তাঘাট, ফুটপাত- সবকিছুর সাথে ঢাকার নিউ মার্কেট আর পুরান ঢাকার সাথে বেশ মিল খুঁজে পাবেন। কিন্তু আপনার চোখ ছানাবড়া হবে যখন চিংড়িঘাটা মোড় হয়ে নিউটাউনের দিকে যাত্রা করবেন। এরপর চিংড়িঘাটা মোড় হয়ে নিউটাউন যেতে নিউটাউন মোড়, বিশ্ব বাংলা, টাটা মেডিকেল সেন্টার, টাটা ইকনোমিক জোন গেট ওয়ান, গট টু, ডিএলএফ আইটি পার্ক-২ এবং আশপাশের এলাকার প্রশস্ত সড়ক, সড়কের পাশে গাছপালা, ফ্লাইওভারগুলো যে কারো নজর কারবে। আবাসিক ও অর্থনৈতিক জোনের এই এলাকার পরিকল্পিত ও সুশৃংখল বহুতল বিশাল ভবনগুলো দেখে আপনার চিন্তার জগতে পরিবর্তন আসতে পারে। মনে হতে পারে, এই শহরে যদি আমার একটু আবাসন হতো! কিংবা আমার শহরটি যদি এমন পরিকল্পিত হতো, কতই না ভালো হতো!

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: কলকাতা পৌরসভাধীন নিউ মার্কেট, তালতলা বেলঘাটা, শিয়ালদা এলাকাগুলো হিন্দু অধ্যুষিত ও ঘনবসতিপূর্ণ। পাশের বিধান নগর পৌরসভাধীন উত্তর ২৪ পরগনা জেলার চিংড়িঘাটা মোড়, নিউটাউন, বিশ্ব বাংলা, রাজারহাটসহ পঞ্চায়েত শাসিত লস্কর আটি গ্রাম ও আশপাশের এলাকাগুলো মুসলিম অধ্যুষিত। তবে কোথাও কোনো ধর্মীয় বিরোধ নেই। রাজনৈতিক বিরোধ বা প্রতিহিংসা নেই। সবার ভেতরে ভ্রাতৃত্ববোধ, সম্প্রীতি বিরাজমান। মন্দির আছে, মসজিদ আছে। মসজিদের মাইকে আজান হয়, নামাজ হয়। মুসলমানরা স্বাধীনভাবে মসজিদে নামাজ পড়তে যায়। হিন্দুরা মন্দিরে পূজা করে। মুসলিম হোটেলগুলোতে অন্যান্য খাবারের সাথে গরুর গোশতও বিক্রি হচ্ছে, একেবারে সুলভ মূল্যে। গরুর গোশতের দোকান আছে এখানে প্রতি কেজি গরুর গোশত বিক্রি হচ্ছে ২৩০ থেকে ২৪০ রুপি।

মসজিদে জুতা চোর আসে না : বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহর থেকে শুরু করে গ্রামের একজন মুসল্লিকেও মসজিদে ঢোকার সময় জুতার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকতে হয়। অনেক সময় মসজিদের ভেতরের বাক্স থেকেও জুতা চুরি হয়ে যায়। যে কারণে মসজিদের ভেতর সিজদার স্থানের সামনে জুতা রেখে নামাজ পড়ার দৃশ্য বাংলাদেশে একেবারেই স্বাভাবিক। ভিন্ন চিত্র চোখে পড়বে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহর ও আশপাশের এলাকার মসজিদে। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা মসজিদে নামাজের সামনে জুতা রাখার কথা ভাবতেই পারেন না।

নারী পুরুষের একসাথে ইফতার: চিকিৎসার জন্য দুদিন আগে কলকাতা শহরে প্রথম আসা। মঙ্গলবার একটু কৌতূহলী মনোভাব নিয়ে ইফতার করতে গেলাম নিউ মার্কেট মসজিদে। ছোট আয়তনের তিনতলা মসজিদটি রোজাদারে তখন পুরনো হয় আঙিনায়ও ভিড়। পুরুষ রোজাদারের সাথে আছেন নারীরাও। মসজিদ থেকে সবার জন্য ইফতার সরবরাহ করা হলো। নারী-পুরুষ একসাথে পাশাপাশি বসে নির্বিঘ্নে ইফতার করলেন। এমন অভিজ্ঞতা আমার জীবনে এটি প্রথম।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading