বিদায় নিয়েও দেশজুড়ে তুমুল আলোচনায় আবদুল হামিদ

বিদায় নিয়েও দেশজুড়ে তুমুল আলোচনায় আবদুল হামিদ

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৩ । আপডেট ১৩:১৫

বিদায় নিয়েও টক অব দ্য কান্ট্রি সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় টানা দশ বছর ৪১ দিন দায়িত্ব পালন শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভবন ছেড়েছেন দেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। আর বঙ্গভবনও প্রথমবারের মতো কোনো রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছে আনুষ্ঠানিক বিদায়। বঙ্গভবন ছেড়ে নিজ বাসায় উঠলেও সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে আলোচনা এখনও তুঙ্গে। তিনি পরবর্তী জীবন কিভাবে কাটাবেন তা ঘিরে জল্পনা। টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের ৫২ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনও রাষ্ট্রপ্রধানকে রাষ্ট্রীয় বিদায় জানালো বঙ্গভবন। গত ৫২ বছরের ইতিহাসে এর আগে বঙ্গভবনে এমন কোনও বিদায় অনুষ্ঠান হয়নি। কারণ, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আগে এ ধরনের অনুষ্ঠান করার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি। নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানের পরপরই বিদায়ী রাষ্ট্রপতি হামিদ তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিকুঞ্জে নিজ বাসভবনে চলে যান। আবদুল হামিদকে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর (এসএসএফ) তত্ত্বাবধানে একটি মোটর শোভাযাত্রায় তার নিকুঞ্জের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) একটি চৌকস দল বিদায়ী রাষ্ট্রপতিকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। বিদায় অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর একটি ব্যান্ড দল অংশ নেয়। দুই দলে বিভক্ত বঙ্গভবনের কর্মকর্তারা গাড়ির দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। বঙ্গভবনের প্রধান ফটক থেকে বাইরের গেটের ফোয়ারা পর্যন্ত খোলা জিপে ফুলের পাপড়ি ছুড়ে আবদুল হামিদকে বিদায় জানান তারা। সেখান থেকে বেলা পৌনে ২টার দিকে তাকে শেষবারের মতো মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে নিকুঞ্জের বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়।

সাংসদ, স্পিকার ও রাষ্ট্রপতি..এবং তারপর? মো. আবদুল হামিদ ১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলার কামালপুরে জš§গ্রহণ করেন। ১৯৫৯ সালে তৎকালীন ছাত্রফ্রন্ট ছাত্রলীগে যোগদানের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ১৯৬৯ সালের শেষ দিকে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আবদুল হামিদ নবম জাতীয় সংসদে স্পিকার নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সংসদ সদস্য আবদুল হামিদ এর আগে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সাতবার সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন।
মো. আবদুল হামিদ প্রথম দফায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল শপথ নিয়ে সেদিনই বঙ্গভবনে উঠেছিলেন। যদিও এর আগে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের অসুস্থতার সময় এবং তার মৃত্যুতে জাতীয় সংসদের স্পিকার থাকার কারণে মো. আবদুল হামিদ ৪১ দিন ভারপ্রাপ্ত ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে সে সময় তিনি বঙ্গভবনে ওঠেননি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পরই মো. আবদুল হামিদ বঙ্গভবনে উঠেছিলেন। ২০১৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদেও তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করার গৌরব অর্জন করেন তিনি। সংবিধান অনুসারে, দুই মেয়াদের বেশি কেউ রাষ্ট্রপতি পদে থাকতে পারেন না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবদুল হামিদ ছাড়া আরও ১৬ জন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আবদুল হামিদ স্বাধীন বাংলাদেশে সাতবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি সংসদে নিজের এলাকা কিশোরগঞ্জের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও স্পিকারের দায়িত্বও পালন করেছেন। এ ছাড়া সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে অবসর নেয়ার পর এখন তিনি কি করবেন, কিভাবে সময় কাটাবেন তা ঘিরে আলোচনা।

বঙ্গভবন ছেড়ে কোথায় থাকবেন.. কি করবেন? বঙ্গভবন ছেড়ে রাজধানীর নিকুঞ্জে নিজের বাড়িতে উঠেছেন আবদুল হামিদ। আসবাবপত্রসহ সব সরঞ্জাম এরইমধ্যে সেই বাসায় ওঠানো হয়েছে। ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর নিকুঞ্জ-১ আবাসিক এলাকার দুই নম্বর সড়কে তিন কাঠা জমি পান আব্দুল হামিদ। ২০০০ সালের শেষ দিকে সেখানে বাড়ির কাজ ধরেন। কয়েক বছর কাজ শেষে তৈরি হয় তিনতলা বাড়ি। নিজ বাড়িতে উঠে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, অনেক সময় বলেছি, আমি বন্দি জীবনে আছি। এর থেকে আমি মুক্তি পাচ্ছি। এখন সাধারণ নাগরিক হিসেবে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব। এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।
দুই মেয়াদে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে দায়িত্ব পালনের ঘটনা প্রতিবেশী দেশগুলোয় হয়নি। এ নিয়ে আবদুল হামিদ বলেন, এটা বাংলাদেশে হয়নি, পার্শ্ববর্তী ইন্ডিয়ায় দুবার হয়েছে, কিন্তু ১০ বছর কেউ ছিল না। আবার পাকিস্তানে তো পাঁচ বছরের ওপরে কেউ ছিল না। সুতরাং এ উপমহাদেশেই আমার মনে হয় আমিই সবচেয়ে বেশি সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। কারণ, ১০ বছর ছাড়াও আরও বোধ হয় ৪১ দিন বেশি আছে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়।’ অবসরের সময়টুকু তিন জায়গায় কাটাতে চান সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তবে সবচেয়ে বেশি সময় কাটাবেন হাওরে। তিনি বলেন, তবে অবসরকালীন সময়ে আমার সবচেয়ে বেশি হাওর এলাকায় থাকার ইচ্ছা। এরপর ঢাকাতে এবং কিশোরগঞ্জে সময় দেবো। অবসরের সময়টুকু আমি তিনটা ভাগে ভাগ করতে চাই। একটা হলো ঢাকা, দ্বিতীয়টা কিশোরগঞ্জ এবং হাওর এলাকায়। আমি চেষ্টা করবো হাওর এলাকায় বেশি থাকার। আমার গ্রহণযোগ্যতার পেছনে মিডিয়ার অবদান কোনোদিন অস্বীকার করতে পারবো না। এজন্য আমি আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি বলেন, আমার যেটুকু সফলতা এজন্য আমি সমগ্র দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমার ওপর দেশবাসীর দোয়া ছিল। আমার জেলা, আমার এলাকার মানুষেরও দোয়া ছিল। বিশেষ করে আপনাদের প্রতিও আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমি বিভিন্ন সময়ে যাই বলেছি, সেটাকে টুইসট (বিকৃত) না করে সত্যিকারভাবে প্রকাশ করেছেন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি কি কি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন: সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. আবদুল হামিদ আইন অনুযায়ী অবসর ভাতা, চিকিৎসার সুবিধাসহ আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা পাবেন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শেষে কী কী সুবিধা পাওয়া যায়, তা উল্লেখ করা হয়েছে ‘দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমিউনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস) অ্যাক্ট, ১৯৭৫ (মে ২০১৬ পর্যন্ত সংশোধিত)’ শিরোনামের আইনে। আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি পদে কমপক্ষে ছয় মাস দায়িত্ব পালন শেষে পদত্যাগ করলে অথবা মেয়াদ শেষ হলে মৃত্যুর আগপর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে সর্বশেষ যে মাসিক বেতন পেতেন, তার ৭৫ শতাংশ হারে মাসিক অবসর ভাতা পাবেন। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এ হিসাবে অবসরের পর মো. আবদুল হামিদ মাসে ৯০ হাজার টাকা অবসরভাতা পাবেন।
আইনানুযায়ী, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আগে অন্য কোনো চাকরি বা পদ থেকে অবসরে গিয়ে অবসর ভাতা গ্রহণ করলে তিনি ওই অবসর ভাতা এবং রাষ্ট্রপতির অবসর ভাতার মধ্যে তার ইচ্ছা অনুযায়ী যেকোনো একটি পাওয়ার যোগ্য হবেন। রাষ্ট্রপতি অবসর ভাতা গ্রহণ করে মারা গেলে তার বিধবা স্ত্রী অথবা ক্ষেত্রমতে বিপত্নীক স্বামী তার প্রাপ্য অবসর ভাতার দুই-তৃতীয়াংশ হারে আমৃত্যু মাসিক ভাতা পাবেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে আরও কিছু সুবিধাও পাবেন আবদুল হামিদ। আইনানুযায়ী তিনি একজন ব্যক্তিগত সহকারী ও একজন অ্যাটেনডেন্ট (সাহায্যকারী) পাবেন। দাপ্তরিক ব্যয়ও পাবেন, যার মোট বার্ষিক পরিমাণ সময়ে সময়ে সরকার নির্ধারণ করবে। একজন মন্ত্রীর প্রাপ্য চিকিৎসাসুবিধার সমপরিমাণ চিকিৎসাসুবিধাদি পাবেন তিনি। সরকারি অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য বিনা মূল্যে সরকারি যানবাহন ব্যবহার, আবাসস্থলে একটি টেলিফোন সংযোগ পাবেন এবং সরকার সময়ে সময়ে নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত এর বিল পরিশোধ থেকে অব্যাহতি দেবে। সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে একটি কূটনৈতিক পাসপোর্টও পাবেন মো. আবদুল হামিদ। তখন তিনি দেশের ভেতর ভ্রমণকালে সরকারি সার্কিট হাউস বা রেস্টহাউসে বিনা ভাড়ায় অবস্থানের সুবিধা পাবেন। আইনানুযায়ী, চিকিৎসাসুবিধা, কূটনৈতিক পাসপোর্ট এবং দেশের ভেতরে সরকারি সার্কিট হাউস বা রেস্টহাউসে বিনা ভাড়ায় অবস্থানের সুবিধা মো. আবদুল হামিদের স্ত্রীও পাবেন।

সক্রিয় রাজনীতিতে আর দেখা যাবে? সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আর সক্রিয় রাজনীতি করবেন না। তিনি এখন অবসরজীবনে বাড়ি বসে লেখালেখি করবেন। এ বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমি তো এখন রিটায়ার্ড হয়ে গেছি। দোজ হু আর টায়ার্ড, দে গো ফর রিটায়ার্ড। এখন বাড়ি বসে থেকে কিছু লেখালেখি করতে পারি। কিন্তু সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করার পরিকল্পনা নেই। কারণ, দেশের মানুষ আমাকে এত বড় ইজ্জত দিয়ে দুই মেয়াদে দেশের সর্বোচ্চ পদে রাষ্ট্রপতি করেছে। সুতরাং আবার আমি রাজনীতি করা বা অন্য কোনো পদে যাব এটা করলে এ দেশের মানুষকে আমি হেয় করব। সুতরাং সেটা আমি করব না। তিনি বলেন, আজকে আমি এটাও বলতে চাই, প্রধানমন্ত্রী আমাকে যেভাবে মোটামুটি ফ্রি-লি কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন বা আমার কাজের ব্যাপারে কোনোরূপ বাধা সৃষ্টি হয়নি, এজন্য আমি তার প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি রাষ্ট্রপতি ছিলাম, তবে আমি নিজেকে সবসময়ই দেশের সাধারণ মানুষ বলেই মনে করি। আমি সারাজীবন রাজনীতি করেছি, সেটা এদেশের মানুষের কল্যাণে এবং আমি চেষ্টা করেছি যেন এদেশে সুষ্ঠু রাজনীতি প্রবর্তন করা যায়। সেটাতে সফল হয়েছি, একথা বলতে পারব না। তবে আমার চেষ্টার ত্রুটি ছিল না।

ইউডি/সুপ্ত/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading