তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে এরদোয়ান

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে এরদোয়ান

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৩ । আপডেট ১৪:৪৫

তুরস্কে আগামী ১৪ মে প্রেসিডেন্ট এবং সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দেশটিতে আসন্ন এ নির্বাচনকে ঘিরে রয়েছে টানটান উত্তেজনা। ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কামাল কিলিচদারোগ্লু’র অধীনে একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ নিয়ে এ নিয়ে বিনয় দাস’র প্রতিবেদন

এরদোয়ানের আবারও ক্ষমতায় আসার পথে বাঁধা কোথায়? প্রেসিডেন্ট থাকার ক্ষেত্রে এরদোয়ানের পথে প্রধান কাঁটা হলো, জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মানুষের ক্ষোভ। শুধু যে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে তা নয়, দেশটির অর্থনীতিও সংকটে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের কথা না শুনে এরদোয়ান নিজের আর্থিক নীতিতে চলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যার কারণে সংকট আরও বেড়েছে। তার প্রভাব গিয়ে পড়েছে মানুষের জীবনে, কর্মসংস্থানে। তাছাড়া গত ৬ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণপূর্ব তুরস্কে পরপর দুটি বিধ্বংসী ভূমিকম্পে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ মারা যান। বিরোধীদের অভিযোগ, সরকারের অবহেলায় হাজার হাজার ভবন নির্মাণে দুর্নীতি হয়েছিল, যেগুলো ধসে পড়ায় এই বিপুল প্রাণহানি হয়েছে। এছাড়া পরিস্থিতি অনুযায়ী যেভাবে ত্রাণ ও উদ্ধারের কাজে সরকারের ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত ছিল, সেটিও হয়নি। পরে উদ্ধারকাজে দেরির জন্য এরদোয়ান নিজেই জনগণের কাছে ক্ষমা চান। বিরোধীরা মূলত কয়েকটি দাবিতে একজোট হয়েছেন- এরদোয়ানকে সরাতে হবে, জিনিসপত্রের দাম কমাতে হবে ও অর্থনীতির হাল ফেরাতে হবে। এক্ষেত্রে কেমাল কিরিচদারোলুর কৃতিত্ব হলো, তিনি অনেকগুলো বিরোধী দলকে একজোট করতে পেরেছেন। এর সাধারণ সূত্র ছিল- এরদোয়ানের বিরোধিতা। তাছাড়া কেমাল অন্য দলের অধিকাংশ দাবি মেনে নিয়েই তাদের জোটে টেনে এনেছেন।

কামাল কিরিচদারোগ্লু নিবেন রাজনৈতিক পরীক্ষা: এবারের নির্বাচনে এরদোয়ানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হবেন কামাল কিরিচদারোগ্লু। সাবেক এই আমলা সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে তুর্কি জনগণের কাছে বেশ পরিচিত। চাকরিজীবনে কঠোরভাবে দুর্নীতির মোকাবিলা করতে চেয়েছেন, একাধিকবার তাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। বছর দুয়েক আগেও ভাবা যায়নি, প্রধান বিরোধী প্রার্থী হয়ে এরদোয়ানকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবেন কেমাল। কিন্তু আজ সেটাই বাস্তব। এরদোয়ান এই মুহূর্তে কিছুটা চাপের মধ্যে রয়েছেন সত্য। তবে তাকে হারানো ও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিরোধীদের জন্য সহজ হবে না। কিলিচদারুগ্লুর নেতৃত্বে বিরোধীরা যে প্রচারণা চালাচ্ছে তাতে মূল কথা হচ্ছে- তুরস্কে এক ব্যক্তির শাসনের অবসান ঘটানো, আইনের শাসন ও সবার জন্য সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা। কিলিচদারুগ্লু প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অন্যদিকে এরদোয়ানের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন জোট তাদের প্রচারণায় বলছে – বিরোধী জোটের মতো বহু দল যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ হবে। তারা বলছে বিরোধীরা তাদের প্রার্থী দিতেই এক বছর সময় নিয়েছে। কখনো জোট ভেঙে গেছে, পরে আবার জোড়া লেগেছে। এরকম মতবিরোধ নিয়ে তারা কিভাবে দেশ পরিচালনা করবে? ফলে এধরনের কোয়ালিশন সরকার বেশি দিন টিকতে পারবে না। তুরস্কে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় দুই পর্যায়ে। প্রথম ধাপে যদি কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পান, তখন সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া দু’জন প্রার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমীক্ষার পাল্লা কোন পক্ষে: দ্য গার্ডিয়ানের খবর অনুসারে, অধিকাংশ সমীক্ষায় কামালকে সামান্য হলেও এগিয়ে দেখা যাচ্ছে। অন্তত, তিনি লড়াই করছেন। দীর্ঘদিন পরে এরদোয়ান যে লড়াইয়ের মুখে পড়েছেন, তা সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যাচ্ছে। এরদোয়ানের অনেক সমর্থকও বলছেন, জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় তারা ক্ষুব্ধ। তাই এবার এরদোয়ানের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন। কেমাল প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি ভোটে জিতলে তুরস্কে আবার সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করবেন। কারণ, একজনের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত হোক, তা তারা চান না। এরদোয়ান প্রবর্তিত এক ব্যক্তির শাসনের কুফল মানুষ বুঝতে পারছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
আমেরিকার ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলছেন, প্রথম পর্যায়ের ভোটে এরদোয়ানের ভোট যদি ৫০ শতাংশের নিচে রেখে দেওয়া যায়, তাহলে তিনি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যেতে পারেন। আঙ্কারার সাংবাদিক সরোয়ার আলম বলছেন, বিরোধী জোটের প্রার্থী কেমাল কিলিচদারুগ্লুর চেয়েও এরদোয়ানের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বেশি। কিন্তু বিরোধীরা যদি তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

‘চাপে’ থাকলেও এরদোয়ানকে হারানো কি সহজ হবে? এরদোয়ান এই মুহূর্তে কিছুটা চাপের মধ্যে রয়েছেন তা সত্য। তবে তাকে হারানো ও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিরোধীদের পক্ষেও সহজ কাজ নয়। বেশ কয়েকটি সমীক্ষায় বলছে, পার্লামেন্টে বিরোধীরা একেপি পার্টিকে সামান্য ব্যবধানে হারাতে পারলেও এরদোয়ানকে হারাতে পারবেন না কেমাল। তার পক্ষে এরদোয়ানের মতো ঝানু রাজনীতিককে হারানো খুবই কঠিন। তাছাড়া তুর্কি প্রেসিডেন্টের অনুগামীর সংখ্যাও কম নয়। তাদের একটি অংশ নিঃসন্দেহে ক্ষুব্ধ, কিন্তু শেষপর্যন্ত তারা সত্যিই এরদোয়ানের বিরুদ্ধে ভোট দেবেন কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবু আশাবাদী জোট গড়া ছয়টি বিরোধী দল। তাদের দাবি, জনগণের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে, কেমালই কামাল করতে পারেন।

নির্বাচনের আগে গণগ্রেফতার কি ভয় দেখানোর কৌশল? নির্বাচনের আগে তুরস্কের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে গ্রেফতার অভিযান শুরু করেছে তুর্কি পুলিশ। দেশটির গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, কথিত জঙ্গি সম্পর্কের অভিযোগে ১১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কুর্দিপন্থি একজন আইনপ্রণেতা বলেছেন, ১৪ মে নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিবিদ, আইনজবীবী ও সাংবাদিক। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, গ্রেফতার অভিযানটির মূল মনোযোগ ছিল কুর্দি অধ্যুষিত দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের বৃহত্তম শহর দিয়ারবাকিরকে কেন্দ্র করে। নিষিদ্ধ ঘোষিত কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে) জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ২১টি প্রদেশেই অভিযান চালানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে এই অভিযানটি পরিচালনা করা হলো। ২০০২ সালে একে পার্টির নেতা রিসেপ তাইয়্যেব এরদোয়ান ক্ষমতায় আসার পর এবারই সবচেয়ে কঠিন নির্বাচনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (এইচডিপি) আইনপ্রণেতা তাইপ টেমেল টুইটারে লিখেছেন, নির্বাচনের প্রাক্কালে, ক্ষমতা হারানোর ভয়ে, তারা আবার গ্রেফতার অভিযানের আশ্রয় নিয়েছে। তিনি আরও লিখেছেন, দিয়ারবাকিরে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে তার দলের সিনিয়র সদস্য, সাংবাদিক, শিল্পী ও আইনজীবীসহ কয়েক ডজন রাজনীতিবিদ রয়েছেন। দিয়ারবাকিরের প্রসিকিউটর কার্যালয় গ্রেফতার অভিযান নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। একটি গোয়েন্দা সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে,২১৬ জনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউটররা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার পর পুলিশ ১৮৬টি ঠিকানায় একযোগে অভিযান চালিয়েছে। কিছু ডিজিটাল সামগ্রী জব্দ করেছে। মার্কিন মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার সহযোগী পরিচালক এমা সিনক্লেয়ার-ওয়েব বলেন, তদন্তের নথি পাওয়া যাচ্ছে না। এটি নির্বাচনের আগে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ভয় দেখানোর কৌশল।

আমেরিকা-রাশিয়া: কার নজর কোন দিকে? তুরস্কে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে বিশ্বের দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যেও ‘রেষারেষি’ দেখা যাচ্ছে। বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তুরস্কের নির্বাচনকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। সম্প্রতি ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদনে বলা হয়, এক সময়ের শত্রু ও বর্তমানের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ রাশিয়া চায় বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবার ক্ষমতায় আসুক। অন্যদিকে, আমেরিকা ও এর মিত্রদের সমর্থন আছে এরদোয়ানের প্রতিদ্বন্দ্বী ও পশ্চিমপন্থি জাতীয়তাবাদী নেতা কামালের প্রতি।নির্বাচনে কামাল কিলিজদারগলুর ৬ দলীয় জোট ‘নেশন অ্যালায়েন্স’ চায় পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক আগের পর্যায়ে উন্নীত করতে। এই জোট চায় ইউরোপীয় মানবাধিকারনীতি মেনে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তুরস্কের সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে। শুধু তাই নয়, এই জোট আমেরিকার সঙ্গে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি নিয়ে দ্বন্দ্বও মেটাতে চায়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, তুরস্কের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমের দেশগুলো নীরব থাকলেও এ কথা ধরে নেওয়া যে, আমেরিকা ও ইউরোপ এরদোয়ানের প্রতিদ্বন্দ্বী কামালের বিজয়ে খুশি হবে। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষক জেফরি মানকফ বলেন, পশ্চিমের দেশগুলোর বহু কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতা তুরস্কের এরদোয়ানের ওপর বিরক্ত। তাকে নিয়ে তারা হতাশা প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন যে, পশ্চিমের সঙ্গে তুরস্কের দূরত্ব বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ এরদোয়ান। তিনি সবকিছু ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে সস্তা জনপ্রিয়তার পথে হেঁটেছেন।’ তবে মানকফ মনে করেন, ভোটারদের মধ্যে পশ্চিমবিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে দিয়ে আবার বিজয়ী হওয়া এরদোয়ানের মতো রাজনীতিকের জন্য কঠিন কিছু নয়।

ওয়াশিংটন ডিসির সেন্ট লরেন্স ইউনিভার্সিটি ও মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের তুরস্কবিষয়ক বিশ্লেষক হওয়ার্ড ইসেনস্টাট ফরাসি গণমাধ্যম ফ্রান্স টোয়েন্টিফোরকে বলেন, রাশিয়া এরদোয়ানের বিজয় চায়। তিনি মনে করেন, এরদোয়ান আবারও নির্বাচিত হলে তুরস্কের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসবে না। জার্মান মার্শাল ফান্ডের আঙ্কারা ব্যুরোর পরিচালক ওজগুর উনলুহিশারজিকলি সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘সেই শীতল যুদ্ধের যুগ থেকেই ওয়াশিংটনের পর মস্কো আঙ্কারার দ্বিতীয় পছন্দ। তবে আমেরিকা ও তুরস্কের সম্পর্কে ফাঁক খোঁজার চেষ্টা মস্কো কখনই বন্ধ করেনি।’

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading