জলবায়ু পরিবর্তনের চেয়েও ‘বড় হুমকি’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

জলবায়ু পরিবর্তনের চেয়েও ‘বড় হুমকি’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ০৬ মে ২০২৩ । আপডেট ২১:০০

জলবায়ু পরিবর্তন থেকেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবতার জন্য বড় হুমকি। তাই এই হুমকি মোকাবিলায় আরও গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করা উচিত বলে মনে করেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গডফাদার হিসেবে পরিচিত জিওফ্রে হিন্টন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছেন তিনি। হিন্টন বলেন, ‘আমি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যাকে অবমূল্যায়ন করতে চাই না।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আপনার চিন্তা করা উচিত নয়, এমনটাও বলতে চাই না। কিন্তু এটিও (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) একটি বিশাল ঝুঁকি।’ অন্যদিকে জননিরাপত্তা প্রশ্নে এআইতে প্রয়োজনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ। গত বৃহস্পতিবার বিভিন্ন শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধানদের কাছে জনগণের সুনিশ্চিতভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার আহ্বান জানায় হোয়াইট হাউজ।

তিনি আরও বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আপনার কী করা উচিত, তা সুপারিশ করা খুব সহজ। আপনি কেবল কার্বন পোড়ানো বন্ধ করুন। আপনি যদি তা করেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য আপনার কী করা উচিত, তা মোটেও পরিষ্কার নয়।’ জিওফ্রে হিন্টন হলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি গত এক দশকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের গুগলকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি গবেষণায় সহায়তা করে এসেছেন। সম্প্রতি এই প্রযুক্তিসংক্রান্ত ভবিষ্যৎ শঙ্কা নিয়ে কথা বলতে তিনি গুগল ছেড়েছেন।

হিন্টনের কাজ সমসাময়িক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিকাশের ক্ষেত্রে অপরিহার্য বলে মনে করা হয়, নিউরাল নেটওয়ার্ককেন্দ্রিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে অবদান রাখায় ২০১৮ সালে তাকে টুরিং পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বড় অবদান রেখে এখন তিনি সেসব প্রযুক্তি নেতার দলে ভিড়েছেন, যারা এআই দ্বারা সৃষ্ট সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তারা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের থেকে বেশি বুদ্ধিমান হলে তারা পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে।

মাইক্রোসফট-সমর্থিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি ওপেনএআই গত বছরের নভেম্বরে মানুষের মতো কথোপকথনে সক্ষম চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি উন্মুক্ত করে। এটি দ্রুতই ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত বেশিসংখ্যক ব্যবহারকারীর অ্যাপে পরিণত হয়। প্রথম দুই মাসেই এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে যায়। গত এপ্রিল মাসে ওপেনএআইয়ের বানানো চ্যাটজিপিটির সংস্করণ ‘জিপিটি-৪’ উন্মোচিত হওয়ার পর টুইটারের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কসহ অনেক প্রযুক্তি ব্যক্তিত্বই জিপিটি-৪-এর চেয়ে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রশিক্ষিত করার ক্ষেত্রে ৬ মাসের বিরতির আহ্বান জানানো এক চিঠিতে স্বাক্ষর করেন।

স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন স্টেবিলিটি এআইয়ের প্রধান নির্বাহী এমাদ মোস্তাক। অ্যালফাবেটের মালিকানাধীন ডিপমাইন্ডের গবেষক ইয়োশুয়া বেঙ্গিও ও স্টুয়ার্ট রাসেল। তবে মানবজাতির জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হুমকি সৃষ্টি করতে পারে এমনটা মনে করলেও হিন্টন এসংক্রান্ত গবেষণা বন্ধের পক্ষপাতি নন। তার মতে, এটি সম্পূর্ণ অবাস্তব।

জননিরাপত্তা প্রশ্নে এআইতে প্রয়োজনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ: হোয়াইট হাউজ

বিভিন্ন শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানি প্রধানদের জনগণকে সুনিশ্চিতভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ। বৃহস্পতিবার এআই সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রধানদের হোয়াইট হাউজে ডেকে সমাজ রক্ষায় তাদের ‘নৈতিক দায়িত্বের’ বিষয়টি জানানোর কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বিবিসি। হোয়াইট হাউজ পরিষ্কার করে বলেছে, তারা এই খাতে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ আনতে পারে।

চ্যাটজিপিটি ও বার্ডের মতো সম্প্রতি আত্মপ্রকাশ করা বিভিন্ন এআই চ্যাটবট এরইমধ্যে জনগণের নজর কেড়েছে। এইসব চ্যাটবট সাধারণ ব্যবহারকারীদের ‘জেনারেটিভ এআই’ নামে পরিচিত এক ব্যবস্থার সঙ্গে কথোপকথনের সুযোগ দেয়। আর এগুলো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একাধিক সূত্র থেকে তথ্য সংক্ষেপে আনতে, কম্পিউটার কোড ডিবাগ করতে, প্রেজেন্টেশন লিখতে এমনকি বিভিন্ন এমন কবিতা শোনাতে পারে, যা খালি চোখে মানুষের লেখা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন স্থানীয় সময় বেলা ১১ টা ৪৫ মিনিটে শুরু হওয়া দুই ঘণ্টার ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন গুগলের সিইও সুন্দার পিচাই, মাইক্রোসফট প্রধান সাত্যিয়া নাদেলা, ওপেন এআই প্রতিষ্ঠাতা স্যাম অল্টম্যান, অ্যান্থ্রোপিকস-এর দারিও অ্যামোদেই। বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস, বাইডেনের চিফ স্টাফ জেফ জিয়েন্টস, ন্যাশনাল ইকোনোমিক কাউন্সিলের পরিচালক লায়েই ব্রেইনার্ড, মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সালিভান এবং বাণিজ্যমন্ত্রী জিনা রাইমন্ডো।

বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে জড়ো হওয়া প্রযুক্তি নির্বাহীদের জানানো হয়, নিজস্ব পণ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি নির্ভর করে কোম্পানির নিজের ওপরই। আর দেশটির প্রশাসন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নতুন প্রবিধান ও আইনের জন্যেও উন্মুক্ত বলে তাদের সতর্ক করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দপ্তর। চ্যাটজিপিটি’র নির্মাতা কোম্পানি ওপেনএআই’র প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান প্রতিবেদকদের বলেন, এআই নিয়ন্ত্রণে করণীয় বিষয়ে ‘চমকপ্রদভাবেই একমত ছিলেন’ নির্বাহীরা।

বৈঠকের পর আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস এক বিবৃতিতে বলেন, নতুন প্রযুক্তি জনগণের নিরাপত্তা, প্রাইভেসি ও নাগরিক অধিকারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে, এতে মানুষের জীবন উন্নত করার সম্ভাবনাও রয়েছে। তিনি আরও বলেন, নিজেদের পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বেসরকারি খাতের ‘একটি নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব’। এদিকে, সাতটি নতুন এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান চালুর উদ্দেশ্যে আমেরিকার ‘ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন’ থেকে ১৪ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে হোয়াইট হাউজ।

এর আগে বিভিন্ন রাজনীতিবিদ ও প্রযুক্তি নেতা উভয় পক্ষ থেকেই উদীয়মান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার নাটকীয় উত্থান নিয়ন্ত্রণের আহ্বান এসেছে। এই সপ্তাহের শুরুতে গুগলে নিজের চাকরী ছেড়ে দিয়ে এআই’র ‘গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত জেফ্রি হিনটন বলেন, তিনি এখন নিজের কার্যক্রমের জন্য অনুতপ্ত। বিবিসিকে তিনি বলেন, এআই চ্যাটবটগুলোর কয়েকটি বিপজ্জনক ব্যবস্থা ‘বেশ ভয়ানক’।

মার্চে ইলন মাস্ক ও অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ ওজনিয়াকের স্বাক্ষর করা এক চিঠিতে এই প্রযুক্তির বিকাশ সাময়িকভাবে স্থগিত করার আহ্বান জানানো হয়। আর গেল বুধবার ‘কীভাবে ও কী কারণে এআই নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন’, সে সম্পর্কে নিজের মতামত তুলে ধরেন আমেরিকার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি)’র প্রধান লিনা খান। অন্যদিকে, এআই দ্রুতই মানুষের ‘চাকরি নিয়ে নিতে’ পারে, এমন শঙ্কাও রয়েছে। সেইসঙ্গে চ্যাটজিপিটি ও বার্ডের মতো বিভিন্ন চ্যাটবট ভুল হতে পারে বা ভুল তথ্য প্রচার করতে পারে, এমন শঙ্কাও আছে।

জেনারেটিভ এআই দেশটির কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করতে পারে, এমন উদ্বেগও রয়েছে। আর জালিয়াতির মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে ‘ভয়েস ক্লোনিং এআই’। এ ছাড়া, এআই’র তৈরি বিভিন্ন ভিডিও ভুয়া খবর ছড়াতে পারে এমন শঙ্কার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বিবিসি। যাইহোক, বিল গেটসের মতো এআই সমর্থকরা এই ব্যবস্থায় ‘বিরতির আহ্বানের’ বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, এই ধরনের পদক্ষেপ সামনের দিকে আসন্ন বিভিন্ন ‘চ্যালেঞ্জের সমাধান’ করবে না। গেটসের যুক্তি হলো, কীভাবে এআই’র বিকাশের সর্বোত্তম ব্যবহার করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দিলে বেশি ভালো হয়।

ইউডি/এ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading