অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে বাড়ছে ধোঁয়াশা
কিফায়েত সুস্মিত । বুধবার, ১৭ মে ২০২৩ । আপডেট ০৮:০০
অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে বাড়ছে নানামুখী চাপ। এ নিয়ে দেশি-বিদেশি শক্তিগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বেশ তৎপর। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে তারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। পর্দার আড়ালেও চলছে দৌড়ঝাঁপ। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে পর্যবেক্ষক পাঠাবে না বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
মাঠপর্যায়ে নির্বাচন-পূর্ব পরিস্থিতি বিশেষ করে তা অংশগ্রহণমূলক হওয়ার পরিবেশ আছে কিনা তা মূল্যায়নে জুলাইয়ে একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল পাঠাচ্ছে ইইউ। সে সময় সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে তাদের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিতে সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নানামুখী চাপ বাড়লেও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিতে দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। উলটো নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে প্রধান দুদল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়ছে। অনেকটা দুই মেরুতে তাদের অবস্থান। আপাতত সংকট সমাধানের কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়া নিয়ে সংশয় আরও বাড়ছে। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন নিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রভাবশালী দেশগুলো। ভোটে সব দলের অংশগ্রহণ দেখতে চান তারা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা, যুক্তরাজ্যসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা এ নিয়ে ইসির সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আহ্বান জানানোর পাশাপাশি নানামুখী চাপও দেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ বিভিন্ন মহল মনে করে, কোন কোন দল অংশ নিলে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে সে ব্যাপারে ইইউ বা প্রভাবশালী দেশগুলো প্রকাশ্যে কিছু বলছে না। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো বড় দুটি দল অংশ নিলেই শুধু সেটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলা হয়ে থাকে। এর কোনো একটি দল ভোটে অংশ না নিলে সেটা একতরফা নির্বাচন হিসাবেই গণ্য হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও এ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়ার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হয়নি। সাধারণভাবে অংশগ্রহণমূলক বলতে সব দলের অংশগ্রহণ বোঝালেও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্বাচনে মূলত প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অংশ নেওয়াকেই বলা হয়ে থাকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে এ দুই দলের মতভিন্নতার কারণে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রশ্নে দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা।
বিএনপি বলে আসছে, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবে না তারা। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের বিষয়ে অনড়। এ ইস্যুতে দুই প্রধান দলের মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। অথচ নির্বাচন যেন অংশগ্রহণমূলক হয়, সে ব্যাপারে রয়েছে দেশি-বিদেশি চাপ। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য প্রভাবশালী দেশও বলছে, বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায় তারা। প্রশ্ন হলো, প্রধান দুই দল তাদের নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকলে কীভাবে সেটা সম্ভব হবে? দেশে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন জরুরি।
অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটতে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আগামীতে আমাদের সামনে নানা চ্যালেঞ্জ আসবে। তাই আমরা মনে করি, এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হওয়া জরুরি। এ ব্যাপারে সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে শুভবুদ্ধির পরিচয় দিতে হবে। দেশের রাজনীতি নির্ধারণ করবে এদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব-এটাই স্বাভাবিক। এ ব্যাপারে বিদেশিদের চাপ বাড়ছে, এটি দুর্ভাগ্যজনক। তবে অভ্যন্তরীণ যে চাপ, তা যুক্তিসংগত। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক অধিকার। সরকারের দিক থেকে এই চাপ মোকাবিলার উপায় হলো, তারা যেহেতু বলছেন সংবিধানের অধীনেই নির্বাচন হবে, তাই তাদেরকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হবে, যাতে বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণে উৎসাহবোধ করে। এই বিকল্প পদ্ধতিটি কী হতে পারে, তা ব্যাপকভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করতে হবে। এ আলোচনা হতে পারে সরকারের নিজেদের মধ্যে এবং নির্বাচনের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে এ আলোচনায় অবশ্যই অংশ নিতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের কোনো কোনো নেতার বক্তব্যে আলোচনার বিষয়ে যে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে, তা থেকে তাদের সরে আসা উচিত।
মনে রাখতে হবে, যে কোনো সমস্যার সমাধান আলোচনার টেবিলেই সম্ভব। তবে সেক্ষেত্রে আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের হতে হবে আন্তরিক। আমরা মনে করি, সদিচ্ছা থাকলে এ অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন কিছু নয়। সব পক্ষ এ ব্যাপারে আন্তরিকতার পরিচয় দেবে, এটাই কাম্য। এর মধ্য দিয়েই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়ে উঠতে পারে।

