সমকামিতার নামে ভয়ঙ্কর ফাঁদ!
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ১৯ মে ২০২৩ । আপডেট ১৪:৪০
অনলাইনে বিভিন্ন উপায়ে প্রতারণা যেন বেড়েই চলেছে। অর্থপ্রস্তাব, প্রেমের প্রস্তাব, লোভনীয় অফারসহ নানাভাবে ফাঁদ পেতে প্রতারক চক্রগুলো হাতিয়ে নেয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন কৌশল অবলম্বন করে তারা। সাম্প্রতিক সময়ে সমকামীদের টার্গেট করে ফেসবুক গ্রুপ, মেসেঞ্জারে সক্রিয় প্রতারকচক্র। ব্ল্যাকমেইল করে হাতিয়ে নেয়া হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। দাবি পূরণ না করলে অপহরণ ও হত্যার মতো কাজও করে। এ নিয়ে সাদিত কবির’র প্রতিবেদন
অনলাইনে সক্রিয় প্রতারক চক্র, দাবি পূরণ না হলে অপহরণ-হত্যা: সমকামীদের ফেসবুক গ্রুপ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে বন্ধুত্ব, কথা চালাচালির এক পর্যায়ে সমকামী সেজে ছবি আদান-প্রদান। তারপর শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব। রাজী হলেই দেয়া হতো বাসার ঠিকানা, বাসায় এলেই ফাঁদ পেতে ব্ল্যাকমেইল করে হাতিয়ে নেয়া হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। দাবি পূরণ না করলে অপহরণ ও হত্যার মতো কাজও করে। এমনই ভাবে প্রতারণার শিকার হয়ে প্রাণ হারায় নোয়াখালীর আমির হোসেন (২৫) নামের এক যুবক। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৭ ডিসেম্বর নোয়াখালী থেকে ঢাকায় আসেন আমির হোসেন। পাঁচদিন পর ২২ ডিসেম্বর দক্ষিণখানে বড়বোনের বাসায় ওঠেন তিনি। এর একদিন পর নিখোঁজ হন আমির। পরে ২৮ ডিসেম্বর আমিরের মোবাইল নম্বর থেকে তার আরেক বোনকে ফোন করে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এই ঘটনায় আমিরের বড় ভাই দক্ষিণখান থানায় ওই দিনই সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। গত ১৩ এপ্রিল একই থানায় অপহরণ মামলার দায়ের করেন তিনি (আমিরের বড় ভাই)। অপহরণের পাঁচ মাস পর গাজীপুরের শ্রীপুরের একটি বাড়িড় সেপটিক ট্যাংক থেকে আমিরের লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) দক্ষিণখান থানা পুলিশ। পুলিশ বলছে, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে এমন একটি চক্র যারা সমকামিতার কথা বলে ফাঁদ পাতে। ফাঁদে পা দেওয়া ব্যক্তিদের নানা রকম হুমকি দিয়ে টাকা আদায় করে। দাবি পূরণ না করলে অপহরণ ও হত্যার মতো কাজও করে। বৃহস্পতিবার (১৮ মে) রাজধানীর মিন্টো রোডে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম। তিনি আরও জানান, দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত বুধবার (১৭) নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপ থেকে চক্রের মূলহোতাসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে ডিএমপির দক্ষিণখান থানা পুলিশ। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলো- চক্রের মূলহোতা মো. তারেক ওরফে তারেক আহাম্মেদ (৩১), মোহাম্মদ হƒদয় আলী (২৯), আশরাফুল ইসলাম (২৩), রাসেল সরদার (২৫), তৌহিদুল ইসলাম বাবু (৩০)। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ীই আমিরের লাশ উদ্ধার করা হয়।
টার্গেট কারা, কীভাবে চলে চক্রের কার্যক্রম: আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ডিসি মোর্শেদ আলম জানান, চক্রের মূল হোতা তারেকের ‘কষ্টের জীবন’ নামের একটি ফেইক ফেসবুক আইডি ছিল। এই আইডি দিয়ে বিভিন্ন সময় ফেসবুক মেসেঞ্জারে বিভিন্ন ব্যক্তিকে সমকামিতার প্রস্তাব দিতো। যারা তার প্রস্তাবে রাজি হত তাদের গাজীপুরের চৌরাস্তা, শ্রীপুর, মাওনাসহ বিভিন্ন এলাকায় ডেকে আনত। এরপর মোবাইল টাকা পয়সা কেড়ে নিয়ে হত্যার ভয় দেখিয়ে ছেড়ে দিতে। মোর্শেদ আলম আরও জানান, ফেসবুকে ভুয়া আইডি খুলে বিভিন্ন ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে সমকামি তরুণদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে একটি চক্র। এরপর আগ্রহী তরুণদের গাজীপুরের বিভিন্ন জায়গায় ডেকে এনে জিম্মি করে টাকাপয়সা আদায় করে ছেড়ে দেয়। পুলিশ কর্মকর্তা মোর্শেদ আলম আরও বলেন, অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা অত্যন্ত দুধর্ষ ও চতুর। তাদের শনাক্ত করতে বেশ কয়েকবার কৌশল পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় চক্রের সদস্য আশরাফুল ইসলামকে সাভারের জিরাবো এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যে রাসেল সরদার ও তৌহিদুল ইসলাম বাবুকে গ্রেফতার করা হয়। তিন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে চক্রের মূলহোতা তারেক আহাম্মেদ ও তার সহযোগী মোহাম্মদ হƒদয় আলীর অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর বুধবার দক্ষিণখান থানার বিশেষ একটি দল নোয়াখালীর দুর্গম হাতিয়া দ্বীপে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে।
নোয়াখালীর আমিরের মতো একই ভাবে হত্যার শিকার হয়েছিলেন রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার বাসিন্দা স্থপতি ইমতিয়াজ মোহাম্মদ ভূঁইয়া। গত ৭ মার্চ বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন তিনি। পরদিন তার স্ত্রী কলাবাগান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এর পরদিন সন্ধ্যায় মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের চিত্রকোট কামারকান্দা সেতু এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে আদালতের অনুমতিতে ওই মরদেহ উদ্ধার করে শনাক্ত করেছেন ইমতিয়াজের স্বজনেরা। পরে থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ওই হত্যা মামলায় তিন জনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, একটি সমকামী গ্রুপ কৌশলে ইমতিয়াজকে ডেকে নিয়ে ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করে। পরে দাবি করা টাকা না পেয়ে হত্যা করে। আসামিদের জিজ্ঞাসাদের বরাত দিয়ে ডিবি জানায়, গ্রেপ্তাররা সমকামী এবং হিজড়া সদস্য। তারা গ্রিন্ডার নামের একটি গে চ্যাটিং অ্যাপসের মাধ্যমে সমকামী বিভিন্ন লোকজনকে রুম ডেটের কথা বলে ডেকে আনতো। এরপর বিভিন্ন কায়দায় ব্ল্যাকমেইল করে টাকা পয়সাসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিতো। সেই সূত্রে গত সাত মার্চ তারা ইমতিয়াজকে ফোন করে কলাবাগান থানার ৭৯/৩, ক্রিসেন্ট রোডের আরাফাতের বাসায় ডেকে নেয়। এক পর্যায়ে আলিফের সহযোগী আরাফাত, মেঘ, মুন্না ও আনোয়ার রুমে ঢুকে ভিকটিমকে মারধর এবং বড় অংকের টাকা দাবি করে। ভিকটিম টাকা দিতে অস্বীকার করলে আসামিরা তার বুকে, পিঠে আঘাতসহ প্রচø মারধর করে। এতে ভিকটিমের মৃত্যু হয়। পরে তারা মরদেহ মেঘের প্রাইভেটকারে উঠিয়ে সিরাজদিখান থানা এলাকার কামারকান্দা গ্রামের নবাবগঞ্জ হাইওয়ে রোডের পাশে ঝোপে ফেলে দেয়।
সমকামিতা কেন ঢাল হচ্ছে, বিশ্লেষকরা কী বলছেন?
বাংলাদেশের সমাজে যেহেতু সমকামিতা গ্রহণযোগ্য নয়, বরং শাস্তিযোগ্য, সেজন্য সমকামীরা তাদের পার্টনার পায় না। ইন্টারনেটের বিস্তারের কারণে সমকামীদের সঙ্গী খুঁজে পাবার জন্য বিভিন্ন সাইট এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
তারা বলছেন, যেহেতু তাদের জীবন অবদমিত এবং তারা নিজেদের প্রকাশ করতে পারেনা সেজন্য তারা যখন অনলাইনে কোন অফার পায় তখন বিষয়টি তাদের কাছে সোনার হরিণের মতো। তাদের কমন ইন্টারেস্ট থাকে। শুধু সমকামীদের সম্পর্ক নয়, বর্তমানে যে কোন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাইবার স্পেস-এর একটি বড় ভূমিকা আছে। পুলিশ বলছে, যারা ঘটনার শিকার হচ্ছেন তারাও এক ধরনের অপরাধ করছেন। কারণ সমকামিতা অবৈধ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, করোনা মহামারীতে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। এতে তারা নতুন প্রতারণা নিয়ে সামনে আসছেন। বাংলাদেশে এই কালচার এখনো স্বীকৃত না এবং আইনসম্মত না। এখানে যারা প্রতারণার শিকার হন; তাদেরও একধরনের নৈতিক দেউলিয়াত্ব ঘটে। তাদের ঘরে স্ত্রী রয়েছে; এরপরও তারা এ ধরনের বিকৃত অনুশীলন করতে চায়।

সমকামীদের অনলাইনমুখী হওয়াা প্রবণাতার নেপথ্যে: ২০১৬ সালে ঢাকার কলাবাগানে সমকামী অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বী তনয়কে কুপিয়ে হত্যার পর থেকেই বাংলাদেশের সমকামীরা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছেন। চাপা পরে গেছে এই ‘ইনভিসিবল মাইনরিটি’র মানবাধিকার রক্ষার সকল দাবী। ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট এ হত্যা মামলায় ছয় জনকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। মূলত ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশে সমকামীরা আত্মপ্রকাশ শুরু করে। কিন্তু জুলহাজ-তনয় হত্যার পর থেকে নিরাপত্তাহীনতার কারণে সমকামীদের মানবাধিকার রক্ষার দাবী হারিয়ে গেছে। ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটি ধীরে ধীরে সমাজে স্বীকৃতি পেতে শুরু করলেও সমকামী নারী বা পুরুষেরা এখনও আত্মগোপন করে থাকেন আতঙ্কে। ২০১৭ সালে ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে সমকামী সন্দেহে ২৭ জন পুরুষকে গ্রেপ্তার করেছিল র্যাব। ডিজিটাল সিকিউরিটি এক্টের কারণে ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও মন খুলে এ ব্যাপারগুলো আলোচনা করা যায় না। কিছু প্রাইভেট গ্রুপ আছে, যেখানে সমকামীরা নিজেদের সাথে যোগাযোগ করে। তবে এসব গ্রুপের কর্মকান্ড মুলতঃ ডেটিং পার্টনার খোঁজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অ্যাক্টিভিসম বা বৈরী পরিবেশের সাথে লড়াই করার মানসিক আর সামাজিক সহযোগিতা তেমনটা পাওয়া যায় না বলে অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশে ১৮৬০ সালে প্রণীত ব্রিটিশ পেনাল কোডের ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী সমকামীতা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ – যার কারণে দশ বছর থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড হতে পারে। বাংলাদেশসহ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত সকল দেশেই এ আইনটি প্রচলিত ছিল। ১৯৬৭ সালে সেক্সুয়াল অফেন্সেস এক্ট পাশ করার মাধ্যমে ব্রিটেনে সমকামীতাকে ডিক্রিমিনালাইজ করা হয়। ২০১৮ সালে ইন্ডিয়ার সুপ্রিম কোর্ট ৩৭৭ ধারা রদ করে সমকামীতা কোন অপরাধ নয় বলে রায় দিয়েছে।
ইউডি/কেএস

