দেশে ঢুকছে নানা পথে, চলছে কারবার: মাদকের অভিশাপ রুখবে কে?

দেশে ঢুকছে নানা পথে, চলছে কারবার: মাদকের অভিশাপ রুখবে কে?

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২৪ মে ২০২৩ । আপডেট ১৪:১০

দেশে মাদকের অবাধ ব্যবহার ব্যাপক হারে বাড়ছে। শহর থেকে গ্রাম এমন কোন স্থান নেই যেখানে মাদকের বিস্তৃতি ঘটেনি। এর মধ্যে মহামারী রূপ নিয়েছে ইয়াবা, সরকারি নানা পদক্ষেপ সত্তে¡ও ঠেকানো যাচ্ছে না এই মাদকের বিস্তার। দেশে মাদক প্রবেশের প্রধান রুট কক্সবাজারের টেকনাফ, এছাড়াও নতুন নতুন রুটের আবিষ্কারও হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক জব্দ করা মাদকের পরিমান ভয়ঙ্কর বার্তা দিচ্ছে। অভিযান অব্যাহত থাকলেও ইয়াবা, আইসের মতো মাদক পাচার ঠেকানো যাচ্ছে না। এ নিয়ে আরাফত রহমান’র প্রতিবেদন

মাদকের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ আর বাস্তবতা

মাদকের বিরুদ্ধে সরকার ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে। কিন্তু কাজে আসছে না কোনো পদক্ষেপই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে সারা দেশ থেকে প্রতিদিন উদ্ধার হচ্ছে গড়ে প্রায় সোয়া লাখ পিস। সর্বোচ্চসংখ্যক ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার হয়েছে ২০২১ সালে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় দেড় লাখ। ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পুলিশ, র্যআব, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিসংখ্যান ঘেঁটে এমন ভীতিকর তথ্য পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি বেশ কয়েকটি মাদকের চালান আটক করেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। জব্দ করা মাদকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় রয়েছে ইয়াবা। ২০২২ সালের বার্ষিক ড্রাগ রিপোর্ট অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহ সব সংস্থা মিলে গত ৫ বছরে প্রায় ২১ কোটি ৬৬ লাখেরও বেশি ইয়াবা জব্দ করেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রকাশিত সবশেষ হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের মার্চ মাসেই প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৫০৯পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। অভিযানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সীমান্ত দিয়ে দেশে যে পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেট প্রবেশ করছে তার অল্পসংখ্যকই ধরা পড়ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে।
আটক ইয়াবার বেশিরভাগই কক্সবাজার-মিয়ানমার সীমান্ত থেকে আসা। পাচারকারীদের নিত্যনতুন কৌশলের কাছে একপ্রকার ধরাশায়ী হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দেশে ইয়াবার মতো মাদকদ্রব্য ব্যাপক হারে পাচার হয়ে আসা নিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনী থেকে শুরু করে দেশের অভ্যন্তরে মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করা বাহিনীগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শক্তিশালী হচ্ছে সীমান্ত-প্রয়োজনে যৌথ অভিযান, বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বাংলাদেশে যাতে মাদক প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য মিয়ানমার সীমান্ত আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, মিয়ানমার সীমান্ত আমরা আরও শক্তিশালী করছি, যাতে করে মাদক আমাদের দেশে প্রবেশ করতে না পারে। মঙ্গলবার (২৩ মে) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা ও আইন-শৃঙ্খলা সম্পর্কিত জাতীয় কমিটির সভা’ শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

আসাদুজ্জামান খান কামাল


মন্ত্রী বলেন, এই সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা যেন ক্যাম্পের ভেতরে কোনো ধরনের অপতৎপরতা যাতে চালাতে না পারে, সেই লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল, চেকপোস্ট এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হবে। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারে ব্যাপক অভিযান চলবে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে যৌথ অভিযান চলবে। ক্যাম্প থেকে যাতে কোনো রোহিঙ্গা বের হয়ে না আসতে পারে সেজন্য আমরা কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছি, ওয়াচ টাওয়ার হয়েছে, সেখানে নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা আছে। সেগুলো আরো জোরদার করা হবে। সীমান্ত এলাকায় বিজেবিকে আরও সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশনা দেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, মিয়ানমার বর্ডারে বিজিবিকে আরও শক্তিশালী করা হবে, যাতে করে নতুন করে মিয়ানমারের নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে।

সর্ষের মধ্যে ভূত দেখছেন বিশ্লেষকগণ

বিভিন্ন সময়ে পাচারের সঙ্গে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কথাও অনেক সময় উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৮ সালের মে মাসে সরকার যে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছিল সেই সময়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততাও বেড়ে যায়। মাদকবিরোধী যে অভিযান চলেছিল ফিলিপিন্সের অনুকরণে- যাদের দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা হবে ভাবা হয়েছিল তাদেরই একটা অংশ বেনেফিশিয়ারিতে পরিণত হয়।
অর্থাৎ এই ব্যবসায় যে লাভ সেই সুবিধাটা তারা গ্রহণ করে। ফলশ্রুতিতে ওসি প্রদীপের মতো মানুষের সম্পৃক্ততাও তখন বেড়ে গিয়েছে। বাহিনীর অনেককে ব্যবসার প্রমোটারে পরিণত হতে দেখেছি। এছাড়া মাদক পাচারের অভিযোগে বড় কোনও শাস্তিও হতে দেখেনি ব্যবসায়ীরা এটাও পাচার না ঠেকাতে পারার অন্যতম একটি কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষক ইমদাদুল হক। তার মতে, আটককৃতরা বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্নভাবে পার পেয়ে যাওয়ায় তারা উৎসাহী হয় এই ব্যবসা চালিয়ে যেতে। আন্তর্জাতিক চক্র তাদের নেটওয়ার্ক চেইন, বিভিন্ন পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে পরিবেশটা তৈরি করেছে, দেশে একটা চাহিদা তৈরি করেছে- এখন এই ব্যবসার সুযোগটা তারা নিচ্ছে। সার্বিকভাবে জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে এই মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

টেকনাফ রুট: করিডোর থেকে এখন মাদকের ‘হাট’

দেশে ইয়াবা-আইসের মতো মাদক প্রবেশের অন্যতম রুট হলো কক্সবাজার ও মিয়ানমার সীমান্ত ঘেঁষা টেকনাফ রুট। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক চক্র একসময় বাংলাদেশকে মাদকের করিডোর হিসেবে ব্যবহার করলেও এই ব্যবসায় বাণিজ্যিক লাভের যে সুযোগ আছে তাতে অভ্যন্তরীণ বাজারও তৈরি হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক এম ইমদাদুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, স্বাধীনতার আগে থেকে টেকনাফ অঞ্চল মাদক চোরাচালানের অন্যতম রুট। আশির দশকে হেরোইন চোরাচালানের রুট হিসেবে এটা বেশ ব্যবহার করতো চোরাকারবারিরা। আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর জন্য বাংলাদেশকে একটা করিডোর হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। ২০০৬ সাল থেকে বাংলাদেশে যেভাবে মাদক কারবার বেড়েছে তাতে দেশের ভেতরে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন মাদকসেবীদের প্রথম পছন্দই এখন ইয়াবা। এই টেকনাফ রুট দিয়ে এলএসডি এবং আইসের মতো মাদক আসছে। যেটা বেশ ‘অ্যালার্মিং’।

ইয়াবার মতো মাদক ব্যবসায় বাণিজ্যিক লাভের যে সুযোগ রয়েছে সেই কারণে এর নিয়ন্ত্রণ সহজে সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইয়াবা, আইসের মতো মাদক পাচার ঠেকাতে না পারার অন্যতম কারণ হলো বড় ধরনের বাণিজ্যিক লাভের যে সুযোগ এই লোভটা সংবরণ করতে পারছে না ব্যবসায়ীরা। স্থানীয়ভাবে ব্যবসায়ী, চোরাকারবারী, বিনিয়োগকারীর সংখ্যা যে বাড়ছে এর কারণ আন্তর্জাতিক চক্রও এখানে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থায় গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের কাছাকাছি হওয়ায় সহজেই এই পথ বেছে নিতে পারছেন মাদক ব্যবসায়ীরা। তারা রাতের আঁধারে বা ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে বিভিন্ন সময় এই রুট বেছে নিচ্ছেন। টেকনাফের সীমান্ত ঘেঁষা মিয়ানমারে বেশ কিছু ইয়াবা কারখানা তৈরি হয়েছে, যেখান থেকে ইয়াবার চালানগুলো বাংলাদেশে এসে ঢুকছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক সঞ্জয় কুমার চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশি সংঘবদ্ধ মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন উপায়ে ইয়াবার চালান মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসছে এবং এখান থেকে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার মতো দেশে সেগুলো পাচার করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় রাতের আঁধারে হয়তো তারা সীমান্ত অতিক্রম করছে, তখন হয়তো তাদের আটকানো যাচ্ছে না। কক্সবাজারের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এর অধিনায়ক মো. আমির জাফর মনে করেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো থাকার কারণে এখন মাদক পাচারের পরিধিও বেড়েছে। তিনি বলেন, মিয়ানমারের যেখান থেকে মূলত ইয়াবার চালান এসে ঢুকে রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল সেই একই জায়গায়। পথঘাট চেনা। সেটা তাদের আনার জন্য সহজ। যেহেতু সংখ্যায় প্রায় দশ লাখের বেশি মানুষ বাস করছে।

কৌশল পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন রুট

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর তল্লাশি থাকায় স¤প্রতি রুটও বদল করেছে ইয়াবার কারবারিরা। কৌশল পরিবর্তন করে তারা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারে বেছে নিয়েছে সাতটি নতুন রুট। এর মধ্যে রয়েছে ইন্ডিয়ার মিজোরাম, আসাম ও মণিপুর হয়ে ত্রিপুরার দুটি রুট আর বান্দরবান, কক্সবাজার, বরিশাল, যশোর ও সাতক্ষীরার পাঁচটি রুট। পুলিশ ও র্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের সুযোগ নিচ্ছে কারবারিরা। ইয়াবা ট্যাবলেট সহজেই বহনযোগ্য। মূলত কাট-আউট পদ্ধতিতে দেশের ভেতরে চলছে কারবার। বাহক প্রাথমিক অবস্থায় জানে না কে গ্রহণ করবে। বর্তমানে বাহকের পেটের ভেতর পাকস্থলীতে করে ইয়াবা বহন বেড়েছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৪ মে ২০২৩। প্রথম পৃষ্ঠা


এ ছাড়া পেঁয়াজ, বেগুন, আসবাব, গাছের গুঁড়িসহ বিভিন্ন মালামালের সঙ্গে বহন করা হয় ইয়াবা। আগে থেকে সোর্সের মাধ্যমে তথ্য না পেলে পরিবহনের সময় সাধারণ তল্লাশি চালিয়ে তাদের শনাক্ত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আবার পেটে ইয়াবা বহনকারীদের গ্রেপ্তারের পরও পড়তে হচ্ছে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। পেটের মধ্য থেকে ইয়াবা বের করা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। গত বছর আগস্ট মাসে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে অসুস্থ হয়ে একজন মারা যান। পরে ময়নাতদন্তে তার পেটে অর্ধগলিত ইয়াবা পাওয়া গেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জাফরুল্ল্যাহ কাজল গণমাধ্যমকে বলেন, দেখা গেছে পাঁচ হাজার পর্যন্ত ইয়াবা বিশেষ কায়দায় পেটের মধ্যে নিয়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে। যানবাহনে চলাচলকারী কতজনকে আমরা চেক করব। তথ্য ছাড়া তো বের করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া এদের আটকের পর পেট থেকে ইয়াবা বের করতে গিয়ে মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে যা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জের।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading