এরদোয়ান নাকি কিলিচদারোগ্লু: শেষ হাসি কে হাসবেন?
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২৮ মে ২০২৩ । আপডেট ১৪:০০
দুই সপ্তাহের অপেক্ষা শেষ। আজ রবিবার (২৮ মে) তুরস্কে হবে রান-অফ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান নাকি কামাল কিলিচদারোগ্লু, শেষ হাসি কার এ নিয়ে আরাফাত রহমান’র প্রতিবেদন
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রান-অফ ভোট তুরস্কে প্রেসিডেন্ট শাসন প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো (রান-অফ) ভোট দিতে যাচ্ছেন দেশটির ভোটাররা। গত ১৪ মে দেশটির প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচন হয়। এতে এরদোয়ানও কামালের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হলেও শেষ পর্যন্ত ভোটের কোনো ফল আসেনি। মোট ভোটের ৪৯ দশমিক ৫১ শতাংশ ভোট পান এরদোয়ান। অপরদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কামাল কিলিচদারোগ্লু পান ৪৪ দশমিক ৫১ শতাংশ ভোট। যেহেতু তাদের কেউই এককভাবে ৫০ শতাংশ ভোট পাননি ফলে এ নির্বাচন রান-অফে গড়ায়। তবে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এরদোয়ানের ক্ষমতাসীন দলের জোট। এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম পর্ব ছিলো উত্তেজনায় ভরা। প্রথমে মোট চারজন প্রার্থী লড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু মধ্য-বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী মুহাররাম ইঞ্জে দু’দিন আগেই তার প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেন। ফলে এরদোয়ানের জোট ন্যাশনাল অ্যালায়েন্সে ও প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) প্রার্থী কামাল কিলিচদারোগ্লু ও তৃতীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী সিনান ওয়ান। এবার সিনান এরদোয়ানকে সমর্থন দিয়েছেন। ফলে, কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা শনিবার (২৭ মে) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে রান-অফ নির্বাচন নিয়ে দেশটিতে তেমন উত্তাপ লক্ষ্য করে যাচ্ছে না। যেমনটি দেখা গিয়েছিল দুই সপ্তাহ আগে। দেশটির বেশিরভাগ ভোটার মনে করছেন ২০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা এরদোয়ানই আবারও প্রেসিডেন্ট হবেন। অথচ ১৪ মে প্রথম ধাপের নির্বাচনের আগে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করেছিলেন এরদোয়ান হয়ত এবার হেরে যাবেন। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে কামালের চেয়ে বেশি ভোট পান তিনি।

সিনানের সমর্থনই কি হতে যাচ্ছে এরদোয়ানের ট্রামকার্ড?
নির্বাচনের প্রথম দফায় তৃতীয় স্থান পাওয়া প্রার্থী সিনান ওগান গত সোমবার এরদোয়ানকে সমর্থন করার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে আজ দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের পাল্লা ভারী এবং বিরোধী প্রার্থী কামাল কিলিচদারোগ্লুর জন্য চ্যালেঞ্জ আরো তীব্রতর হলো। সিনান আংকারায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমি ঘোষণা করছি যে আমরা দ্বিতীয় রাউন্ডে পিপলস অ্যালায়েন্স প্রার্থী রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানকে সমর্থন করব। তার প্রচারণা তুর্কি জাতীয়তাবাদীদের রাজনীতিতে ‘মূল খেলোয়াড়’ করে তুলেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, কিলিচদারোগ্লুর ন্যাশন অ্যালায়েন্স ‘ভবিষ্যত সম্পর্কে আমাদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে’। অন্যদিকে এরদোয়ানকে সমর্থন করার সিদ্ধান্তটি ছিল ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রামের’ নীতির ভিত্তিতে। সিনান ওগান (৫৫) একজন সাবেক শিক্ষাবীদ ও কট্টর জাতীয়তাবাদী, যিনি প্রচারণার আগে বৃহত্তর জনসাধারণের মধ্যে খুব কম পরিচিত ছিলেন। গত ১৪ মে প্রাথমিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৫.২ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন তিনি। কিছু বিশ্লেষক তাকে রানঅফের জন্য একজন সম্ভাব্য ‘কিংমেকার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। গত সপ্তাহে রয়টার্সের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে সিনান বলেছিলেন, তার লক্ষ্য ছিল দুটি প্রধানত কুর্দি দলকে তুরস্কের ‘রাজনৈতিক সমীকরণ’ থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং তুর্কি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের শক্তিশালী করা। কুর্দিপন্থী দল এইচডিপি কিলিচদারোগ্লুকে সমর্থন করেছে। অন্যদিকে কুর্দি ইসলামবাদী হুদা-পার এরদোয়ানকে সমর্থন করেছে। এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, সিনানের সমর্থন এরদোয়ানকে উৎসাহিত করলেও সিনানের সমর্থকদের বিভক্ত করবে। সিনানের জোটের একটি ছোট সদস্য জাস্টিস পার্টি সপ্তাহান্তে জোট ছেড়ে দেয় এবং রানঅফে কিলিচদারোলুকে সমর্থন করে। এ ছাড়াও একজন সিনান সমর্থক গত সপ্তাহে বলেছিলেন, তিনি রানঅফে ভোট দেবেন না। কারণ বাকি দুই প্রার্থী তার কাছে জরুরি না।

শেষ হাসি হাসতে মরিয়া ‘তুরস্কের গান্ধী’ : এরদোয়ানের প্রতিদ্বন্দ্বী ‘তুরস্কের গান্ধী’ খ্যাত কামাল কিলিচদারোগ্লু প্রথম দফায় নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করেছিলেন। দ্বিতীয় দফায়ও সেটা ধরে রেখে শেষ হাসি হাসতে মরিয়া। কামাল নানা ভাবে ভোটারদের মন জয় করতে চাইছেন। তিনি নির্বাচিত হলে লাখ লাখ সিরীয় শরণার্থীকে প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের সমর্থক ভোটারদের নিজের পক্ষে টানতে চাইছেন। তিনি ন্যাটো সদস্যভুক্ত তুরস্ককে আরও পশ্চিমাপন্থি আর গণতান্ত্রিক অবস্থানের দিকে ফিরিয়ে আনতে চান। দেশে সংসদীয় ও প্রধানমন্ত্রী ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা আর স্বাধীন আদালত ও একটি উš§ুক্ত গণমাধ্যম ব্যবস্থা গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তুরস্কে অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত ভিক্টোরি পার্টি। এই দলের নেতা উমিত ওজদাগ। প্রথম দফার নির্বাচনে দলটি ১২ লাখ ভোট পেয়েছিল। দ্বিতীয় দফায় দলটি কামালকে সমর্থন দিয়েছে। উমিত বলেন, ক্ষমতায় গেলে ১ কোটি ৩০ লাখ সিরীয় শরণার্থীকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে নিজ দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে, এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কামাল। কুর্দিদের আরেকটি দল এইচডিপি পার্টিও কামালকে সমর্থন দিয়েছে। এরদোয়ানের অভিযোগ, এই দলের সঙ্গে কুর্দি সন্ত্রাসীদের দহরম-মহরম রয়েছে। যদিও এইচডিপি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দলটি জানিয়েছে, তারা পরিবর্তন চায়। কারণ, এরদোয়ান অর্থনীতির গতি ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, দ্বিতীয় দফার ভোটে প্রভাবক হতে পারেন সিনানের সমর্থক ও প্রথম দফায় ভোটকেন্দ্রে না যাওয়া প্রায় ৮০ লাখ ভোটার। যে প্রার্থী এসব ভোটারের ভোট টানতে পারবেন, তিনিই শেষ হাসি হাসবেন। তবে দ্বিতীয় ধাপের ভোটের আগে বিভিন্ন জরিপে বলা হয়েছে যে, চূড়ান্ত ধাপে এরদোয়ানের জয়ের সম্ভাবনা অনকেটাই বেড়ে গেছে। তিনি ৫৪ শতাংশ ভোট পেতে পারেন। অপরদিকে কেমালের আশাও শেষ হয়ে যায়নি বলেও অনেকে মত দিয়েছেন। তবে সবকিছু মিলিয়ে শেষ হাসি কে হাসবেন তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে রবিবার রাত পর্যন্ত।
দ্বিতীয় দফায় নির্বাচন: ফলের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন যারা প্রথম দফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে যাননি প্রায় ৮০ লাখ ভোটার। এ দফার নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়া ভোটারদের যে প্রার্থী কাছে টানতে পারবেন তিনিই বিজয়ের হাসি হাসবেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রথম দফার ভোটে এরদোয়ানের চেয়ে প্রায় ২৫ লাখ ভোটে পিছিয়ে আছেন কামাল কিলিচদারোগলু। সম্প্রতি বাবালা টিভি নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে ভোটের প্রচার চালিয়েছেন কামাল। ভোটার ও সমর্থকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তিনি। ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষ এই অনুষ্ঠান দেখেছেন। বিশেষত তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এই অনুষ্ঠান। জাতীয়তাবাদী গুড পার্টির তরুণ প্রচারক মেহতেপ বলেন, ইউটিউবে কামালের এই অনুষ্ঠান তরুণদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে। অনেক তরুণ ভোটার প্রথম দফায় ভোটকেন্দ্রে যাননি। তারা এখন নতুন করে ভাবছেন।
শরণার্থীদের ঘিরে এতো আলোচনা কেন?
জাতীয়তাবাদীদের ভোট টানতে তুরস্কে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ সিরিয়ার শরণার্থীকে ফেরত পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কেমাল কিলিচদারোগ্লু। তার এই বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। তিনি বলেন, নির্বাচনে কিলিচদারোগ্লুর জয় হবে সন্ত্রাসীদের বিজয়।’ আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভোটারদের সত্যিকার অর্থে নিজেদের পছন্দ থাকতে পারে। কিন্তু তুরস্ক (সরকার) গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের মৌলিক নীতিমালা পূরণ করেনি। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান গত ছয় বছরে শুধু নিজের ক্ষমতা বাড়াননি, তিনি ভিন্নমত দমন করেছেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। কয়েক মাস ধরে তুরস্কের ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি ছিল এক নম্বর ইস্যু, কিন্তু রোববারের দ্বিতীয় পর্বের ভোট ঘনিয়ে আসায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে বাগ্যুদ্ধ তীব্র হয়েছে এবং এর কেন্দ্রে রয়েছে শরণার্থীরা। অধ্যাপক মুরাত এরদোয়ান সিরিয়ান ব্যারোমিটার নামে একটি নিয়মিত ফিল্ড স্টাডি পরিচালনা করেন। সিরিয়ার শরণার্থী এবং ইরান, ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে আসা অনিয়মিত অভিবাসীর সংখ্যা ৬০ থেকে ৭০ লাখের কাছাকাছি। অধ্যাপক মুরাত এরদোয়ান বলেন, তাদের বক্তব্য বাস্তবসম্মত নয়, বাস্তবে এটা অসম্ভব। যদি আমরা স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের কথা বলি তবে তা সম্ভব নয়। আর যদি জোর করি, তাহলে প্রতিদিন ৫০ হাজারের বেশি ফেরত পাঠাতে হবে। শরণার্থীদের নিয়ে এসব বক্তব্য অপ্রীতিকর, তবে এটি পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৮৫ শতাংশ তুর্কি সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের উদ্বাস্তুদের দেশে ফিরাতে চায়।

বিশ্ব রাজনীতিতে তুরস্কের নির্বাচনের গুরুত্ব কতখানি?
এবার নানা হিসাবেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ তুরস্ক নির্বাচন৷ শেষ পর্যন্ত যিনি জয়ী হবেন, তিনি শুধু ন্যাটোভুক্ত দেশটির সাড়ে কোটি মানুষের নেতৃত্বই দেবেন না, বরং গভীর খাদে পড়া অর্থনীতিকে টেনে তোলা হবে বড় চ্যালেঞ্জ৷ পরবর্তী নির্বচনের ওপর নির্ভর করবে দেশটির পররাষ্ট্র নীতি৷ তুরস্কের অর্থনীতিও এই নির্বাচনের একটি বড় ফ্যাক্টর৷ অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গত বছর মূল্যস্ফীতি ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে৷ গত এক দশকে ডলারের বিপরীতে দেশটির মুদ্রা লিরার মান তার মূল্যের এক দশমাংশে নেমে এসেছে। বিপরীতে, প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া এবং দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে জনগণের প্রতি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কিলিচদারোলু৷ এরদোয়ানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সমালোচনা হচ্ছে, তার সরকার ভিন্নমতকে স্তব্ধ করে দিয়েছেন, তাদের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করছেন৷ এমনকি দেশের বিচার ব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করে রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে৷ যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে তার প্রশাসন৷ পররাষ্ট্র ইস্যুর মধ্যে, এরদোয়ানের নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্য এবং তার বাইরেও সামরিক শক্তিতেও কিছুটা পিছু হটেছে তুরস্ক৷ অন্যদিকে, রাশিয়ার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে পশ্চিমা বিশ্বেও বিরাগভাজন হয়েছেন এর্দোয়ান। ফলে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে৷
ইউডি/কেএস

