যেভাবে আয় করে ব্রিটিশ রাজপরিবার
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ০৯ জুন ২০২৩ । আপডেট ১২:০০
‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য কখনো অস্ত যায় না।’ পৃথিবীজুড়ে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আগে এমনই এক বাক্য প্রচলিত ছিল। স্কুল-কলেজের ইতিহাসের বইগুলোও মোটামুটি এই বাক্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। কারণ, একসময় সমগ্র বিশ্বের দেশগুলোর এক-চতুর্থাংশই ছিল এই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে। পৃথিবীতে বিদ্যমান রাজপরিবারগুলোর প্রসঙ্গ উঠলে অবধারিতভাবেই উঠে আসবে ব্রিটিশ রাজপরিবারের নাম। নজরকাড়া জৌলুশ আর আভিজাত্য ব্রিটিশ রাজপরিবারকে বানিয়েছে অনন্য।
তাদের আয়-উপার্জন নিয়ে মানুষের মাঝে জন্ম নেয় নানা গল্প-কাহিনির। মজার ব্যাপার হলো, পূর্ণকালীন দায়িত্বে থাকা ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যরা কোনো উপায়ে অর্থ আয় করতে পারেন না। উপার্জন করতে হলে ত্যাগ করতে হবে তাদের রাজপরিবারের পদবী। তাহলে কীভাবে বিলাসবহুল জীবনযাপনের ব্যয় বহন করেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যরা? কী তাদের আয়ের উৎস? কিংবা রাজপরিবারের সদস্যদের মাঝে কীভাবে বন্টিত হয় এই সম্পত্তি? এসব নিয়েই আজকের আলোচনা।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের ব্যয়: রাজপরিবারের দেশ-বিদেশ ভ্রমণের জন্য রয়েছে প্রাইভেট জেট ভয়েজার, প্রাইভেট প্লেন এবং রয়্যাল ট্রেনের ব্যবস্থা। এছাড়াও নিত্যদিনের যাতায়াতের জন্য আছে বেন্টলি স্টেট লিমুজিন, রোলস রয়েস সিলভার রেইথ টু এলডব্লিউবি, রোলস রয়েস ফ্যান্টম, অডি আরএসসিক্স, রেঞ্জরোভার হাইব্রিড এলডব্লিউবি এবং ল্যান্ড রোভার ডিফেন্ডারের মতো বিলাসবহুল গাড়ি।
রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথকে সচরাচর যে হ্যান্ডব্যাগটি বহন করতে দেখা যেত, সেটি ইংল্যান্ডের নামকরা ব্র্যান্ড লাউনার লন্ডনের তৈরি, এবং রানি সব সময় এই ব্র্যান্ডেরই হ্যান্ডব্যাগ ব্যবহার করতেন। কোম্পানির মতে, রানীর জীবদ্দশায় ব্র্যান্ডটি দু’শটিরও বেশি পার্স আলাদাভাবে তৈরি করেছিল শুধুমাত্র রানীর জন্য।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের আয়: পূর্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্যে জনগণ রাজপরিবারকে যে পরিমাণ অর্থ খাজনা বা কর হিসেবে প্রদান করত, তা রাজপরিবার পরিচালনার পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজেও ব্যবহৃত হত। তবে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র নীতির কারণে, বর্তমানে ব্রিটেনের অন্তর্গত দেশগুলো থেকে প্রাপ্ত কর সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হয়। ওই দেশগুলো পরিচালনার সকল দায়িত্ব থাকে দেশের সরকার অথবা ফার্স্ট মিনিস্টারের হাতে। বাকিংহাম প্যালেস, কেনসিংটন প্যালেস, বালমোরাল ক্যাসল এবং সেইন্ট জেমস প্যালেসের মতো প্রায় তেইশটি দুর্গ ব্রিটিশ রাজপরিবারের বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ইংল্যান্ড থেকে শুরু করে স্কটল্যান্ড, এবং ওয়েলস জুড়েও ব্রিটিশ রাজপরিবারের অনেক সম্পত্তি ছড়িয়ে আছে, যেগুলোকে একত্রে করে ক্রাউন এস্টেট বলা হয়।রাজপরিবারের সকল জায়গা-সম্পত্তি দেখভালের জন্য বছরে খরচ হয় প্রায় ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের কাছাকাছি। এছাড়াও ডাচি অভ ল্যানক্যাস্টার এবং ডাচি অভ কর্নঅয়েল মিলিয়ে লাখ লাখ হেক্টর জমি, বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত ৬ বিলিয়ন পাউন্ড সমমূল্যের জহরত এবং আর্ট ক্রাফটও রয়েছে ব্রিটিশ রাজপরিবারের অধীনে।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের আয়ের সিংহভাগ উঠে আসে সার্বভৌম অনুদান বা সোভেরিং গ্রান্ট থেকে। ব্রিটিশ সরকার রাজপরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ, এবং রাজপরিবারের সাথে সম্পর্কিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন প্রদান বাবদ প্রতিবছর যে পরিমাণ অর্থ প্রদান করে, তা-ই হলো সোভেরিং গ্রান্ট।
২০১১ সালে প্রণীত সোভেরিং গ্রান্ট নীতিমালা অনুসারে, সোভেরিং গ্রান্টের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে। সোভেরিং গ্রান্ট হিসেবে রাজপরিবারের জন্য অর্থ প্রদান করা হয় ক্রাউন এস্টেট এবং পাবলিক ফান্ডেড আয়ের একটি নির্ধারিত অংশ থেকে। আর এই অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয় রয়্যাল ট্রাস্ট। সর্বমোট ১ লক্ষ ১৬ হাজার হেক্টর জমি এই ক্রাউন এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত।
এসব জমিতে কৃষিকাজের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসায়ী স্থাপনার কার্যক্রমও চালানো হয়, যার মালিকানা সরকার এবং রাজপরিবার; উভয়ের কাছেই বিভক্ত। এই সম্পদগুলো জনগণ এবং রাষ্ট্রের নানাবিধ কাজে ব্যবহার করা হয় বলে একে একত্রে ‘দ্য সোভেরিং পাবলিক এস্টেট’ও বলা হয়। এই পাবলিক এস্টেটের মোট সম্পদের পরিমাণ ১৭.৯৭ বিলিয়ন পাউন্ড।
ক্রাউন এস্টেট থেকে আয়কৃত সভারিন গ্রান্টের অর্থ প্রথমে সরকারি কোষাগারে এসে জমা হয়। এরপর সকল নিয়ম অনুসরণ করে রাজপরিবারের পাওনা তাদের নিজস্ব কোষাগারে স্থানান্তর করে দেওয়া হয়। স্ট্যাটিস্টার তথ্যসূত্রে, ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য বরাদ্দকৃত সভারিন গ্রান্টের পরিমাণ ছিল ১৫ শতাংশ। কিন্তু বাকিংহাম প্যালেসের রিসার্ভিসিং বা পুনঃপরিষেবার জন্য রয়েল ট্রাস্টিরা পরামর্শ দেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছর পর্যন্ত তা ১০ শতাংশ পর্যন্ত বর্ধিতকরণের।
পরামর্শ অনুযায়ী তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যার প্রেক্ষিতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে সভারিন গ্রান্টের মোট আয়ের ২৫ শতাংশ রাজপরিবারকে বুঝিয়ে দেন ওই দেশের সরকার। কোনো একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরের ক্ষেত্রে সভারিন গ্রান্টের জন্য কী পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ থাকবে, তা নির্ধারণ করা হয় ওই বছর থেকে আরও দুই বছর পূর্বে, ক্রাউন এস্টেট থেকে আয়কৃত অর্থের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে।
লেখক: মহসিন আলম রনি
ইউডি/এ

