লেবাননে সিরীয় শরণার্থীদের অসহায় জীবন

লেবাননে সিরীয় শরণার্থীদের অসহায় জীবন

উত্তরদক্ষিণ রবিবার, ১১ জুন ২০২৩ । আপডেট ১১:৩০

মে মাসের এক সকালে লেবাননের ত্রিপোলিতে যাচ্ছিলেন মৌয়াদ এস (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, তাই ছদ্মনাম ব্যবহার করা হলো)। সেনাবাহিনীর এক চেকপোস্টের সামনে এসে গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলেন মৌয়াদ। মনে ভয়- গাড়িতে গেলে সেনাসদস্যরা যদি গ্রেপ্তার করে! আগে বেশ কয়েকবার অন্য সিরীয়দের সঙ্গে এমনই হয়েছে। গাড়ি বা মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের। কিন্তু এবার মৌয়াদ হেঁটে যেতে গিয়েও বাধা পেলেন। সেনাসদস্যরা ডেকে নিয়ে বৈধ কাগজ দেখাতে বললেন। কোনো কাগজ ছিল না সঙ্গে। ফলে সঙ্গে সঙ্গেই আটক করা হলো মৌয়াদকে।

বার বার অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও সেনা সদস্যরা তাকে ছাড়েননি। পাশের আরেক চেকপোস্টে নিয়ে আটকে রাখা হয় সারারাত। পরের দিন খুব ভোরে কয়েকজন লোক এসে ধরে নিয়ে যায় তাকে। গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সিরিয়া সংলগ্ন লেবানন সীমান্তে। সেখানে এক ভবনে আটকে রাখা হয় মৌয়াদকে। কারা আটক করে রেখেছিল তাকে? তাদের পরিচয় এখনো জানেন না মৌয়াদ। তাকে সিরিয়ায় ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল তারা। সিরিয়ায় ফেরা মানেই বাশার আল আসাদের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কাছে ধরা পড়া এবং ধরা পড়া মানেই অকথ্য নির্যাতনের শিকার হওয়া।

ডয়চে ভেলে এক প্রতিবেদনে বলেছে, নির্যাতন এড়াতে টাকার বিনিময়ে মুক্ত হতে চাইলেন মৌয়াদ। তাতে কাজও হলো। তিনদিন পর মোবাইল বিক্রির টাকাসহ মোট ৫৫০ ডলার পাঠালেন মৌয়াদের ভাই। সেই ৫৫০ ডলার দিয়ে অবশেষে ছাড়া পেলেন সিরিয়া থেকে লেবাননে আশ্রয় নেয়া ২৫ বছর বয়সি তরুণ মৌয়াদ। মৌয়াদের মতো এমন অভিজ্ঞতা আরো অনেকের হয়েছে। লেবানন সরকার যখন ঘোষণা করে, ২০১৯ সালের পর সিরিয়া থেকে যারা লেবাননে এসেছেন, তাদের সবাইকে বৈধ কাগজ দেখাতে হবে, কাগজ না থাকলে তাদের ফিরে যেতে হবে নিজ দেশে- সেই থেকে চলছে সিরীয়দের প্রত্যাবাসন। গত কয়েক মাসে প্রত্যাবাসনের হার বেশ বেড়েছে।

সিরীয়দের ওপর নৈশ আইন

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং অ্যাক্সেস সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসসহ (এসিএইচআর) বেশ কিছু মানবাধিকার সংস্থা বলছে, গত এপ্রিল থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ২০০ থেকে ৮০০-র মতো সিরীয়কে সিরিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়েছে। তারা অবশ্য এ-ও বলছে যে, সংখ্যাটি ঠিক কি না তা তারা যাচাই করে দেখেনি। সম্প্রতি লেবাননের কয়েকটি পৌরসভা সিরীয়দের ওপর নৈশ আইন জারি করেছে। ফলে সেসব এলাকায় দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্তই ঘরের বাইরে যেতে পারেন তারা। ধারণা করা হচ্ছে, লেবাননের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি ঘোষণা পৌর কর্তৃপক্ষকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। মে মাসের শুরুর দিকে এক নির্দেশনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দেশের যে স্থানে যত সিরীয় আছেন তাদের সবার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে।

এখানেই শেষ নয়। লেবাননের ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন সম্প্রতি ‘সিরীয়দের দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত লেবানন’ প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছে। লেবাননে নানা স্তরে বলাবলি হচ্ছে, সিরীয়রা দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, সংখ্যায় বাড়তে বাড়তে তারা পুরো দেশকে দখল করার আশঙ্কাও বাড়াচ্ছে। পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত করেছে লেবাননের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী হেক্টর হাজ্জারের এক বক্তব্য। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘লেবাননের ডেমোগ্রাফি বিপজ্জনকভাবে বদলাচ্ছে। এক সময় এ দেশের মানুষ হয়ত নিজের দেশেই শরণার্থী হয়ে যাবে।’

হাইনরিশ ব্যোল ফাউন্ডেশনের বৈরুত কার্যালয়ের প্রধান আনা ফ্লাইশার মনে করেন সিরীয়দের নিয়ে লেবাননের পরিস্থিতি এ মুহূর্তে ‘খুবই উত্তেজনাপূর্ণ’। ডয়চে ভেলেকে অবশ্য তিনি বলেছেন লেবাননে সিরীয়বিদ্বেষী মনোভাব নতুন কিছু নয়। তিনি বলেন,লেবাননে এই সিরীয়বিদ্বেষী মনোভাব অনেক বছর ধরেই চলে আসছে। দুটি দেশের অতীত ইতিহাস এতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

সিরীয়বিদ্বেষী মনোভাব

১৯৭৬ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত লেবাননের একটা অংশ ছিল সিরিয়ার দখলে। আনা ফ্লাইশার মনে করেন, ওই সময়ের তিক্ত অভিজ্ঞতার গভীর ক্ষত এখনো রয়ে গেছে লেবানিজদের মনে। লেবাননে রাজনীতিবিদদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশও সিরীয়বিদ্বেষী। মূলত ‘অভিজাত’ শ্রেণির ওই রাজনীতিবিদরা মনে করেন, সিরীয়দের কারণে লেবাননের অথনীতি অতিরিক্ত অনাবশ্যক চাপে পড়ছে।

আনা ফ্লাইশার মনে করেন, এমন বক্তব্য বা দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে আসলে সিরীয়দের স্রেফ বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। তার মতে, সিরীয়দের কারণে লেবানন সরকার বরং অনেক আন্তর্জাতিক অনুদান পাচ্ছে যা ঠিকভাবে কাজে লাগালে অর্থনীতির দুরবস্থা অনেকখানি কাটিয়ে ওঠা যেতো। লেবাননের জনসংখ্যা ৫৫ লাখ। সিরিয়া যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ২০ লাখের মতো সিরীয় সেই দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। ২০ লাখের মধ্যে মাত্র আট লাখ পাঁচ হাজার সিরীয় কাগজে-কলমে বৈধভাবে লেবাননে বাস করছেন।

মে মাসে লেবানন এবং লেবাননের বাইরের মোট ২০টি মানবাধিকার সংগঠন সিরীয়দের দেশে ফেরানো বন্ধ করার আহ্বান জানায়। লেবানন সরকারের কাছে প্রত্যাবাসন বিষয়ক তথ্যও দাবি করেছে তারা। তবে লেবাননের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী হাজ্জার মনে করেন, সেসব তথ্য পরিবেশন লেবাননের জন্য হীতে বিপরীত হতে পারে। বিশেষ করে জাতিংসঘের শরণার্থী বিষয়ক সংগঠন ইউএনএইচসি আরকে সিরীয়দের বিষয়ের তথ্য দিতে রাজি নন তিনি। হেক্টর হাজ্জার মনে করেন, ইউএনএইচসিআরকে সব তথ্য দিলে নিবন্ধিত সিরীয়দের কোনোদিনই হয়ত সিরিয়ায় ফেরানো যাবে না।

গত বছর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার ‘নিরাপদ অঞ্চলে’ প্রায় ১০ লাখ সিরীয়কে পুনর্বাসনের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু ইউএনএইচসিআর-এর তুরস্কের প্রতিনিধি, ফিলিপ লেক্লারক উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, সিরিয়ার পরিস্থিতি শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়। তখন প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮০০ জন সিরীয় তুরস্ক থেকে উত্তর সিরিয়ায় ফিরে আসতেন। কিন্তু বেশিরভাগই তুরস্কে থাকতে চাইতেন, কারণ তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা সিরিয়ার তুলনায় ভালো।

ইউডি/এ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading