মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টায় চীন?
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ১২ জুন ২০২৩ । আপডেট ১১:০০
আরব লীগের একটি প্রতিনিধিদলের জিনজিয়াং সফরকে ব্যবহার করে চীন ওই অঞ্চলে তাদের নীতির প্রতি সমর্থন তুলে ধরছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সফরে অংশ নেওয়া কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বেইজিং যে প্রশংসা পেয়েছে তা ‘চীনা প্রচার’, এবং সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাসকে মুছে ফেলার প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। জিনজিয়াংয়ে উইঘুর এবং অন্যান্য মুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রতি চীনের আচরণ আন্তর্জাতিক উদ্বেগের একটি প্রধান কারণ। পশ্চিমা দেশগুলো জোরপূর্বক শ্রম, ধর্মীয় নিপীড়নের অভিযোগ উত্থাপন করেছে এবং আমেরিকাসহ কিছু দেশ জিনজিয়াংয়ে যা ঘটছে তা গণহত্যা হিসেবে লিপিবদ্ধ করেছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং প্রতিনিধি দলের সফর সম্পর্কে চীনা কর্মকর্তাদের মন্তব্য এই সফরকে পশ্চিমাদের ‘জাতিগোষ্ঠীগত গণহত্যার অভিযোগ’ প্রত্যাখ্যান হিসেবে চিত্রিত করেছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন বলেন, ৩০ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত জিনজিয়াং সফরকালে আরব লীগের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জিনজিয়াংয়ে চীনের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন এবং ওই অঞ্চলের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার প্রশংসা করেন।
ওয়াং আরো বলেন, জিনজিয়াংয়ের মুসলমান এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীগত সংখ্যালঘু লোকেরা যে যত্ন পেয়েছে তার প্রশংসা করেছে আরব দেশগুলো এবং জিনজিয়াংয়ের উন্নয়ন এবং এর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য চীনের প্রচেষ্টার প্রতি তাদের দৃঢ় সমর্থন প্রকাশ করেছে। ওয়াংয়ের মতে, জিনজিয়াংয়ের বিষয়ে আরব দেশগুলো সবসময় ন্যায়সঙ্গত অবস্থানে রয়েছে।
সমালোচকরা উল্লেখ করেছেন যে আরব লীগের প্রতিনিধিদলের দ্বারা চীনের নীতির আপাত সমর্থন জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার অফিসের অনুসন্ধান এবং সিদ্ধান্তের সাথে সাংঘর্ষিক। ওয়াশিংটনভিত্তিক ভিকটিমস অব কমিউনিজম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও পরিচালক অ্যাড্রিয়ান জেনজ টুইটারে এক পোস্টে এই সফরকে ‘মারাত্মক বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করেছেন। গত বছর জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতর জিনজিয়াংয়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি মূল্যায়ন প্রকাশ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে- উইঘুর এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চীনের পদক্ষেপ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শামিল হতে পারে। চীনা সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া ও গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিনিধি দলের জিনজিয়াং সফর পশ্চিমা গণমাধ্যমে তুলে ধরা বিবরণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
উইঘুরে মুসলিম নির্যাতনের প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ
নানা হুমকি সত্ত্বেও চীনের সংখ্যালঘু উইঘুর সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন নিয়ে বিস্ফোরক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশন। গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে প্রকাশ করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিমসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ‘সম্ভবত’ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই চীনের বিরুদ্ধে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং প্রদেশে বসবাসরত সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ করে আসছে বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংস্থা। গণহত্যা এবং নির্যাতন চালানোর এ অভিযোগ নতুন না হলেও, এ বিষয়ে প্রায় সময়ই গভীর উদ্বেগ জানানোর পাশাপাশি জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের দাবিও জানায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনের সদর দফতর থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘চীনা সরকারের বিরুদ্ধে উইঘুরসহ শিনজিয়াং প্রদেশের সংঘ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের যে অভিযোগ রয়েছে তার গ্রহণযোগ্য ভিত্তি রয়েছে। অঞ্চলটিতে মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটে থাকার সম্ভাবনা প্রবল। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং উগ্র সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী কর্মসূচির নামে সেখানে ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।’
চীন কী বলছে
তবে বরাবরের মতো অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে বেইজিং। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, চীনবিরোধী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার অংশ হিসেবেই জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন। যার কোনো ভিত্তি নেই। সন্ত্রাস দমনে পদক্ষেপ নেয়ার কারণে ওই অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরে এসেছে বলেও দাবি করা হয়।
‘শিনজিয়ান পুলিশ ফাইল’ সম্পর্কে প্রতিক্রিয়ায় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছিলেন যে, এই নথিগুলি চীন বিরোধী মত ও চীনকে ছোট করার যে চেষ্টা তার সর্বশেষ উদাহরণ। তিনি বলেন, শিনজিয়ানে স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি রয়েছে এবং সেখানকার বাসিন্দারা সুখী জীবনযাপন করছে।
চীনের বক্তব্য হলো, সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ এবং ইসলামী চরমপন্থার মূলোৎপাটনে শিনজিয়ানে অভিযান জরুরী এবং এই শিবিরগুলি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বন্দীদের সংস্কারের একটি কার্যকর হাতিয়ার। চীন জোর দিয়ে বলে যে উইঘুর জঙ্গিরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক প্রচারণা চালাতে বোমা হামলা, নাশকতা এবং নাগরিক অস্থিরতার পরিকল্পনা করেছে। তবে উইঘুরদের দমনকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য চীন এসব হুমকি অতিরঞ্জিত করে বলে অভিযোগ রয়েছে। উইঘুর সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা কমানোর জন্য তাদের উপর কৃত্রিম বন্ধ্যাত্ব পদ্ধতি বলপূর্বক চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে এমন অভিযোগকে চীন ভিত্তিহীন এবং সম্পূর্ণ বানোয়াট বলে উল্লেখ করে।
আরব লীগের ইতিহাস
আরব লীগ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আঞ্চলিক রাজনৈতিক জোট হিসেবে পরিচিত । আরব জাতীয়তাবাদের প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠিত আরব লীগ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ওসমানিয়া শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে আরব জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল আরব অঞ্চলসমূহের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন আরব রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা । কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব অবধি জাতীয়তাবাদীরা তাদের লক্ষ্যে অর্জনে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে নি । তাই তুর্কি শাসনাধীনে বসবাস করা ছাড়া তাদের কোন গন্তব্য ছিল না। মূলত আলজেরিয়া, বাহরাইন, কমোরোস , জিবুতি, মিশর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া, মেীরিতানিয়া, মরক্কো, ওমান, ফিলিস্তিন, কাতার, সেীদি আরব, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া, তিউনেসিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন এই গ্রুপের সদস্য।
ইউডি/এ

