বিবাহ-বিচ্ছেদে দেশে রেকর্ড! : কেন ভাঙছে এত ঘর-সংসার

বিবাহ-বিচ্ছেদে দেশে রেকর্ড! : কেন ভাঙছে এত ঘর-সংসার

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৪ জুন ২০২৩ । আপডেট ১৫:৩০

এক বছরের ব্যবধানে দেশে বিয়ে বিচ্ছেদের হার বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। শুধু শহরে নয় এই হার বেড়েছে গ্রামেও। বিশ্লেষকগণ বলছেন, বিষয়টি উদ্বেগজনক। এ নিয়ে আসাদ এফ রহমান’র প্রতিবেদন

এক বছরের ব্যবধানে তালাকের হার দ্বিগুণ, পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ

গত এক বছরের ব্যবধানে দেশে তালাকের হার দ্বিগুণ হয়েছ। আর গত পাঁচ বছরের মধ্যে এ হার সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২২ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেণকগণ। কেন ভাঙছে এত ঘর-সংসার, এর কারনগুলো খুঁজে বের করার তাগিদ দিয়েছেন তারা। সমাজবিজ্ঞানীদের উচিৎ কারণ অনুষন্ধান করে সমাজে এর সমাধানের দিক তুলে ধরা। মঙ্গলবার (১৩ জুন) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ভবনে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিএস।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ড. শাহনাজ আরেফিন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. আলমগীর হোসেন। বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে দেশে প্রতি হাজারে তালাকের হার দাঁড়িয়েছে এক দশমিক ৪ শতাংশ। যা আগের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া গত পাঁচ বছর এ হার এক শতাংশের নিচে থাকলেও এবার প্রথমবারের মত তা প্রায় দেড় শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। আর ২০২০ সালে এ হার ছিল শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। যা ২০১৮ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ।

প্রতিবেদন বলছে, গত বছর দেশে গড়ে প্রতি হাজারে বিয়ে করেছেন ১৮ দশমিক ১ জন। দেশে ১০ বছরের বেশি বয়সী জনসংখ্যার ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ অবিবাহিত, ৬৩ দশমিক ৯ শতাংশ বিবাহিত এবং ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত বা দাম্পত্য বিচ্ছিন্ন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরুষের বিবাহের গড় বয়স এখন ২৫ দশমিক ৩ বছর। আর নারীর বেলায় তা ১৮ দশমিক ৮ বছর। জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, গত বছর যাদের বিয়ে হয়েছে, তাদের মধ্যে ৬ দশমিক ৫ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ বছরের নিচে। আর ১৮ বছরের কম বয়স ছিল ৪০ দশমিক ৯ শতাংশের। বর্তমান আইনে বাংলাদেশে মেয়েরা বিয়ের যোগ্য হয় ১৮ বছর বয়সে, আর ছেলেদের ক্ষেত্রে এই বয়স ২১ বছর।

ঢাকায় দিনে ভেঙে যাচ্ছে ৩৭টি সংসার

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এবং জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে মোট ১৩,২৮৮টি তালাকের আবেদন এসেছিল। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে তালাকের আবেদন সংখ্যা ৭,৬৯৮টি। পক্ষান্তরে, উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ৫,৫৯০টি তালাকের আবেদন পড়েছে। ফলে প্রতিদিন ঢাকায় ৩৭টি সংসার ভেঙে যাচ্ছে। দিনে গড়ে ৪০ মিনিটের ব্যবধানে ঢাকায় তালাক হয়েছে একটি। বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে এখনও ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুসরণ করা হয়। এ আইন অনুযায়ী, ঢাকায় দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কার্যালয়ে তালাকের আবেদন পাঠাতে হয়। মূলত স্ত্রীর অবস্থানের ঠিকানায় থেকে আবেদনটি ওই অঞ্চলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এরপর ঢাকায় দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কার্যালয়ে আবেদন নথিবদ্ধ হয়।

বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়লে কর্তৃপক্ষ আবেদনকারী ও বিবাদী- দুই পক্ষকেই আপসের নোটিশ পাঠায়। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারাই এ ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ। কারণ তারাই দুই পক্ষের কাছে আপসের নোটিশ পাঠান। দুই পক্ষে সমঝোতা না হলে কর্তৃপক্ষের আর কোনো দায়িত্ব থাকে না। আবেদনের তিন মাসের (৯০ দিন) মধ্যে কোনো পক্ষ আপস না করলে কিংবা আবেদন তুলে না নিলে আইনত তালাক কার্যকর হয়ে যায়। সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রী সিদ্ধান্ত চ‚ড়ান্ত করে তালাকের আবেদন করেন। স্ত্রী বা স্বামী- কার আবেদনের নোটিশে সাধারণত অপর পক্ষ আসে না। দুই পক্ষ কখনো এলেও আপসের মতো পরিস্থিতি থাকে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়ে যায়। তালাকের আবেদনের ছক আইনজীবীদের কাছে একরকম প্রস্তুতই থাকে। পরিবর্তন বলতে শুধু বিভিন্ন পক্ষের নাম-পরিচয়-ঠিকানাই ভিন্ন। হঠাৎ দুই-একটি ক্ষেত্রে সামান্য ভিন্ন হলেও বাকি সব একই। সিটি কর্পোরেশনের আবেদনগুলোতে তাই বিবাহবিচ্ছেদের জন্য দেখানো কারণগুলোও ঘুরেফিরে একই।

স্ত্রীদের পক্ষ থেকেই আসে ৭০ শতাংশই আবেদন

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নারীরাই তালাকের আবেদন করার দিক থেকে এগিয়ে আছেন। প্রতি ১০টি আবেদনের প্রায় সাতটি এসেছে স্ত্রীদের পক্ষ থেকে। ২০২২ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে আসা তালাকের আবেদনের ৭০% স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এসেছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে সেটি ৬৫%।

দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আগে বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া নারীদের প্রতি সমাজের আচরণ ছিল অতি বিরূপ। নিজের পরিবারও মেয়েকে আশ্রয় দিতে চাইত না। এখন সচেতনতা বেড়েছে। সংসারজীবনের নির্যাতন থেকে বাঁচাতে মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে পরিবার। আর্থিক স্বাবলম্বিতার সঙ্গে সঙ্গে নারীদের বেড়েছে আত্মমর্যাদা। ঢাকার বাইরেও চিত্র আলাদা নয়। সেখানেও নারীদের তালাকের আবেদন বেশি। তবে সব রেজিস্ট্রার কার্যালয় ও সিটি করপোরেশনে এ তথ্য আলাদা করে রাখা হয় না। বরিশাল সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুসারে, ২০২২ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত নারীরা তালাক দিয়েছেন ১৩১টি, পুরুষেরা ৭৬টি।

বিচ্ছেদের হার বাড়ার কারণ, বিশ্লেষকগণের ব্যাখ্যা

প্রায় সব আবেদনেই বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়া। এর বাইরে অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক কলহ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, যৌতুক, মাদক সেবন করে নির্যাতন, প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা, যৌন অক্ষমতা, সন্দেহ, উদাসীনতা, ব্যক্তিত্বের সংঘাতসহ আরও কিছু অভিযোগ। নারীদের বিবাহবিচ্ছেদের চারটি কারণ চিহ্নিত করেছে জাতীয় মহিলা পরিষদ- যা হলো যৌতুক, বিবাহের বাইরে অবৈধ সম্পর্ক, মানসিক নির্যাতন ও শারীরিক নির্যাতন। দাম্পত্য জীবনে ছোটখাটো ভুল ধারণা থাকতে পারে, কিন্তু তার ভিত্তিতে সংসার ভেঙে যাওয়া কখনোই কাম্য হতে পারে না। বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন এবং এটিকে মূল্য দিতে শিখতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জিনাত হুদা গণমাধ্যমকে বলেন, বিবাহবিচ্ছেদের নেতিবাচক ধারণা থেকে সমাজ এখন অনেকটা বেরিয়ে এসেছে। যেসব মেয়ে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে তারা যাতে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারেন সে ক্ষেত্রে সমাজও সহযোগিতামূলক আচরণ করছে। এমনকি প্রান্তিক পর্যায়েও মেয়েরা বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। নারীর অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এর একটি কারণ। তার পরও পরিবার সাপোর্ট দিচ্ছে। আবার অনেকে সামাজিক ট্যাবু, ধর্মীয় বিধি-নিষেধ, পরিবারের দিকে তাকিয়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখছেন। তিনি আরও বলেন, আবার খুব ছোট ছোট কারণে বিবাহবিচ্ছেদ হচ্ছে। এসব বিষয় থেকে বের হয়ে আসা জরুরি। অনেক সময় দুজনের আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে অনেক সমস্যা সমাধান করে ফেলা যায়। এসব ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত না নেওয়াই উচিত। কারণ বিচ্ছেদের পর সন্তানের ওপর বড় একটা মানসিক প্রভাব পড়ে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১৪ জুন ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা

তালাকের প্রবণতা শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি

গ্রামে তালাকের প্রবণতা বেড়েছে বেশি। গ্রামাঞ্চলে প্রতি হাজারে ১ দশমিক ৫টি আর শহরে হাজারে একটি বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে গত বছর। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে শহরের তুলনায় গ্রামে তালাকের হার বেশি। শহরে ২০২২ সালে দেশে প্রতি হাজারে তালাকের হার ১টি। এসময়ে গ্রামে তালাকের হার এক দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২১ সালে এ হার ছিল গ্রামে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ এবং শহরে ছিলো শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারির তথ্যানুযায়ী, গড়ে বিবাহিত নারী-পুরুষের দশমিক ৪২ শতাংশই তালাকপ্রাপ্ত।

সবচেয়ে বেশি বিবাহবিচ্ছেদ হচ্ছে রাজশাহীতে, আর দ্বিতীয় অবস্থানে আছে খুলনা ও সিলেট; তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে ঢাকা ও ময়মনসিংহ। রংপুর সিটি করপোরেশনসহ পুরো জেলায় ২০১৯ সালে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল ৬ হাজার ৯৬৭টি। ২০২২ সালে এসে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ২১৫তে। ময়মনসিংহ জেলায় তিন বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে তালাকের ঘটনা বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। জেলার রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পুরো জেলায় ২০২২ সালে তালাক হয়েছে ৬ হাজার ৩৯০টি। দিনে তালাকের ঘটনা গড়ে ১৮টি। ২০২০ ও ২০২১ সালে ময়মনসিংহে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল যথাক্রমে ৫ হাজার ৫৩২ এবং ৫ হাজার ৯১১টি। গত পাঁচ বছরে খুলনা নগরে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে ৯ হাজার ৫২টি। এর মধ্যে গত দুই বছরের সংখ্যাই প্রায় ৪ হাজার। এ বছরের প্রথম তিন মাসে সেখানে ৫০০টি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading