‘ভুল বোঝাবুঝি’ মেটাতেই কি ব্লিঙ্কেনের বেইজিং সফর
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৮ জুন ২০২৩ । আপডেট ১১:০০
দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে গত কয়েক বছর ধরে আমেরিকার সঙ্গে তিক্ততা চলছে চীনের। চলতি বছর তথাকথিত ‘নজরদারি বেলুন’ ইস্যুকে ঘিরে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে এই তিক্ততা। এই পরিস্থিতেই চীনে সফরে যাচ্ছেন আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেন। রবিবার (১৮ জুন) রাজধানী বেইজিংয়ে পৌঁছানোর কথা রয়েছে তার। তার এই সফরের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর পর মার্কিন প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার পা পড়বে বেইজিংয়ের ভূমিতে। এর আগে ২০১৮ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে বেইজিং সফরে গিয়েছিলেন আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) তৎকালীন প্রধান মাইক পম্পেও। ওই সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন পম্পেও।
বর্তমান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে এই প্রথম কোনো উচ্চ পর্যায়ের মার্কিন কর্মকর্তা চীন সফরে যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে— এই সফরে চীনের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিউইন গ্যাং কিংবা দেশটির শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই’র সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। তবে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার বৈঠক হবে কি না— তা এখনও অনিশ্চিত।
কিন্তু ঠিক কী কারণে দু’দেশের মধ্যে তিক্ততা চরম রূপ নেওয়া সত্ত্বেও বেইজিং সফরে যাচ্ছেন ব্লিনকেন? আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগারীয় অঞ্চল বিভাগের প্রতিনিধি ড্যানিয়েল ক্রিটেনবিঙ্ক এ প্রশ্নের উত্তরে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে যেসব ‘ভুল বোঝাবুঝির’ সৃষ্টি হয়েছে, সেসব দূর করতে যথাযথ একটি কার্যকর ‘যোগাযোগ চ্যানেল’ গঠনের প্রস্তাব বেইজিংকে দেওয়াই ব্লিনকেনের এই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য। কারণ যদি একটি কার্যকর যোগাযোগ চ্যানেল দুই দেশের মধ্যে না থাকে, সেক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের এ দুই ‘সুপার পাওয়ার’ শক্তির সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঘোর আশঙ্কা রয়েছে।
কী বলছেন বিশ্লেষকরা
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই আশঙ্কাকে একেবারে অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো উপায় নেই। বিশেষ করে বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। এই গত মাসেই দক্ষিণ চীন সাগরের আন্তর্জাতিক এয়ার স্পেস এলাকায় আমেরিকার একটি নজরদারি উড়োজাহাজের সঙ্গে প্রায় মুখোমুখি সংঘর্ষ বাঁধে যাচ্ছিল; পরে শেষ মুহূর্তে বিমান চালকদের ব্যাপক চেষ্টায় সেই দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে। পরে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ড এ সম্পর্কিত এক বিৃবতিতে বলেছে, চীনা বিমানচালকের ‘অপ্রয়োজনীয় বেপরোয়া’ বিমান চালনাই সেই ঘটনার জন্য দায়ী।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা অবশ্য গত মাসের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বলতে নারাজ। তাদের মতে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় থেকে চীনের সঙ্গে আমেরিকার সৃষ্ট যে দ্বন্দ্ব বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ও অব্যাহত রয়েছে, গত মাসে দুই দেশের বিমানের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঘটনা তারই ধারাবাহিকতা। তবে মার্কিন থিংকট্যাংক সংস্থা ব্রুকিং ইনস্টিটিউশনের জেষ্ঠ্য বিশ্লেষক রায়ান হাস মনে করেন, বেইজিং এবং ওয়াশিংটন উভয়ই তাদের মধ্যকার কূটনৈতিক তিক্ততা ও স্থবিরতার অবসান চায়। অ্যান্টনি ব্লিনকেনের সফরকে উভয় দেশের এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের ‘প্রাথমিক পর্যায়’ বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
আলজাজিরাকে রায়ান হাস বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট বাইডেন এবং প্রেসিডেন্ট শি’— উভয়ই ভালোভাবে জানেন যে এই দ্বন্দ্ব থেকে আমেরিকা বা চীন— কেউই লাভবান হবে না। আবার একই সঙ্গে, বন্ধুত্বের হাত কে প্রথম বাড়িয়ে দেবেন— তা নিয়েও দ্বিধা রয়েছে দু’জনের মনে।’ ‘তাই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর হলো দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক পর্যায়ে আনার প্রক্রিয়ায় প্রবেশের একটি সুযোগ। অবশ্য আমরা এখনও জানিনা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিযোগীতা বজায় রাখা দুই দেশ এই সুযোগ গ্রহণ করবে কিনা। অনাগত সময়ই তা বলতে পারে।’
অসহনীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে
চীনের সঙ্গে আমেরিকার সংঘাত হলে তা ‘অসহনীয় বিপর্যয়’ ডেকে আনবে। তাই চীন সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনায় আগ্রহী। সিঙ্গাপুরে ‘সাংগ্রি-লা ডায়ালগ’ শীর্ষক এশিয়ার দেশগুলোর শীর্ষ প্রতিরক্ষা সম্মেলনে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লি সাংফু এমন মন্তব্য করেন। চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার একটি প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার একদিন পরই এ কথা বললেন।
গত মার্চ মাসে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেন লি। সিঙ্গাপুরের এ সম্মেলন তাঁর প্রথম কোনো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক উপস্থিতি। সম্মেলনে সাংফু বলেন, ‘চীন ও আমেরিকার মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে তাই বলে অভিন্ন স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার ও সহযোগিতা গভীর করতে করার চেষ্টা করা থেকে বিরত থাকা উচিত হবে না। এটা অনস্বীকার্য যে, চীন ও আমেরিকার মধ্যে একটি গুরুতর সংঘাত বা কোনো সংঘর্ষ বিশ্বের জন্য এক অসহনীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে।’
লি সাংফু তাঁর বক্তব্যে বলেন, আমেরিকা ও তার মিত্রদের নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার অজুহাতে নৌপথে আধিপত্য দেখানোর সুযোগ নিতে দেবে না চীন। তবে লির বক্তব্যের পরে আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞরা লিকে বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ব্যাপক তৎপরতা ঘিরে প্রশ্ন তোলেন। তিনি সরাসরি এর জবাব না দিয়ে বলেন, এ অঞ্চলের বাইরের দেশের তৎপরতা উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।
লাভ হচ্ছে কার
সম্প্রতি চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরব সন্ধি স্থাপন করেছে। এ সন্ধি আরবের রাজনীতিতে গুরুত্ব বহন করছে। এর ফলে আরবের রাজনীতির খোল নলচে বদলে যেতে পারে। সম্ভবত ইয়েমেনে শান্তি ফিরে আসতে পারে। হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরব সরকার আলোচনাও শুরু করেছে। এ সন্ধির প্রভাব অন্যান্য আরব দেশেও পড়তে পারে। কিন্তু আরবের কর্তৃত্ববাদী রাজনীতিতে খুব বেশি পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না; বরং নতুন করে কর্তৃত্ববাদ গেড়ে বসতে পারে। চীনকে গণতন্ত্রের সহায়ক শক্তি বলে বিবেচনা করা যায় না কখনোই।
শুধু আরবেই নয়, বিভিন্ন অঞ্চলেই চীন কর্তৃত্ববাদী শাসকদের হাত করে নিজস্ব প্রভাববলয় তৈরির চেষ্টা করছে। এর কিছু নমুনা প্রতিফলিতও হচ্ছে আঞ্চলিক রাজনীতিতে। ইউক্রেন যুদ্ধে সরাসরি না হলেও রাশিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে চীন। এর আগে সিরিয়ার যুদ্ধেও বাশার আল–আসাদের পক্ষে ছিল চীন। তালেবানের সঙ্গেও কয়েক দফা আলোচনা করেছে আরব কাবুল ছেড়ে যাওয়ার আগে।
চীন মূলত তার অর্থনৈতিক শক্তি, অনেক আলোচিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, দক্ষ কূটনীতি ও সামরিক শক্তি দিয়ে বিভিন্ন দেশ ও শক্তিকে নিজেদের পক্ষে আনার কাজ করছে। চীনের এ ধরনের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করেই বর্তমান সময়কে চীনের উত্থান পর্ব বলে উল্লেখ করছেন অনেকেই। মোটাদাগে বলা যায়, বিশ্বরাজনীতিতে চীন তার পদচিহ্ন রাখছে বেশ তাৎপর্য নিয়েই। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, চীন বিভিন্ন দেশের অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কাজ করছে। সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজের সঙ্গে চীনের যোগাযোগ খুব বেশি নেই। এ কারণে চীনের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিরোধী ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। চীন বিশ্বরাজনীতিতে নিজস্ব ইতিবাচক দর্শন বা আদর্শের ধারা তৈরি করতে করতে পারেনি।
ইউডি/এ

