খুলে দেওয়া হয়েছে গজলডোবা জলকপাট, উত্তরে বন্যার শঙ্কা

খুলে দেওয়া হয়েছে গজলডোবা জলকপাট, উত্তরে বন্যার শঙ্কা

কিফায়েত সুস্মিত । মঙ্গলবার, ২০ জুন ২০২৩ । আপডেট ১৪:০০

টানা বৃষ্টিপাতে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আগামী কয়েকদিন বন্যা হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এই বন্যা খুব বেশি তীব্র হবে না এবং ‘সাময়িক’ হবে বলে আপাতত পূর্বাভাস দেয়া হলেও বৃষ্টিপাত বাড়ার ফলে এবং ইন্ডিয়া থেকে উজানের পানি ছাড়ার ফলে পরিস্থিতি গুরুতর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সোমবার (১৯ জুন) লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার গণমাধ্যমকে বলেন, ইন্ডিয়ার গজলডোবা ব্যারেজের সবগুলো গেট খুলে দেওয়ায় বাংলাদেশে তিস্তায় পানি হুহু করে বাড়ছে৷ উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপ কমাতে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি গেটের সবকটি খুলে দেওয়া হয়েছে৷ বিপদসীমা অতিক্রম না করলেও এসব নদ-নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে দুধকুমার নদের পানি বেড়ে নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সেইসঙ্গে শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদিকে, উজানের পানি নিয়ন্ত্রণে ডালিয়া ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতে রংপুরের গঙ্গাচড়া তিস্তা নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরের অনেক বসতবাড়িতে পানি উঠেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ডুবে গেছে ফসলের খেত। এমন অবস্থায় ফসলহানির শঙ্কা করছেন কৃষকেরা।

হু হু করে বাড়ছে তিস্তার পানি, বাড়ছে ভাঙন: সোমবার (১৯ জুন) বিকেল ৩টায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে ৫১ দশমিক ৯০ সেন্টিমিটার, যা বিপৎসীমার দশমিক ২৫ সেন্টিমিটার (স্বাভাবিক ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে সকাল ৬টায় ওই পয়েন্টে তিস্তার পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক ২০ সেন্টিমিটার, সকাল ৯টায় ৫২ দশমিক ১০ সেন্টিমিটার ও দুপুর ১২টায় পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে ৫১ দশমিক ৯৮ সেন্টিমিটার। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি পরিমাপক নূরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, গত শুক্রবার রাত থেকে তিস্তার পানি বাড়তে শুরু করেছে। রবিবার রাতে পানি বিপৎসীমার দশমিক ২০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও সোমবার সকালে পানি বিপৎসীমার দশমিক ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে সকাল ৯টার দিকে পানি দশমিক ১০ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার দশমিক ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এরপর দুপুর থেকে পানি আরও কমতে শুরু করেছে। রাতের দিকে আরও পানি কমে যেতে পারে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডালিয়ায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৫০ মিলিমিটার।

নিয়ন্ত্রণে খুলে দেওয়া হয়েছে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট: পাউবি ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদ্দৌলা সোমবার (১৯ জুন) গণমাধ্যমকে বলেন, কয়েক দিন ধরে তিস্তার পানি বাড়া-কমার মধ্যেই রয়েছে। আজ সকালে তিস্তার পানি আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে এখন কমতে শুরু করেছে। তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ-আল-মামুন জানান, জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত সবগুলো নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে আগামী ২২ ও ২৩ জুন এসব নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী জানতে পেরেছি। তবে আগামী ১০দিনের মধ্যে বড় কোনো বন্যার শঙ্কা নেই। তবে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হবে। ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গের দোমহনী বন্যা পূর্বাভাস ও বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বরাত দিয়ে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি পরিমাপক নূরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ইন্ডিয়ার গজলডোবা ও মেখলিগঞ্জ (বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত) তিস্তা ব্যারাজে বেশ কিছু জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। ইন্ডিয়া তাদের এলাকার মেখলিগঞ্জ পয়েন্টে গত তিন দিন ধরে হলুদ সংকেত জারি রেখেছে। বর্তমানে মেখলিগঞ্জে তিস্তার পানি ৬৫.৫০ সেন্টিমিটার (৬৫.৯৫ বিপৎসীমা) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা এ কে এম ফরিদুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, কৃষকেরা আগেই ফসল তুলে নেওয়ায় ফসলের তেমন ক্ষতি হয়নি। কিছু নমল জোতের ফসল আছে সেগুলোও ঘরে তেলার সময় হয়েছে। হয়তো সেগুলো এখনো কিছু তুলতে পারেনি, এগুলোর কিছুটা ক্ষতি হতে পারে।

পানি বৃদ্ধির ফলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে, জানাচ্ছে পূর্বাভাস: পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, সোমবার (১৯ জুন) সন্ধ্যা ৬টার তথ্য অনুযায়ী দুধকুমার নদের পানি বেড়ে পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও এখনও বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে পূর্বাভাস অনুযায়ী, আরও কয়েকদিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থেকে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী এক সপ্তাহ ব্রহ্মপুত্র নদের পানি সমতলে বৃদ্ধি পাবে। ফলে ২২-২৩ জুন নদের অববাহিকার উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ও বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন এবং চিলমারীর নয়ারহাট ইউনিয়নসহ চরাঞ্চল সাময়িক প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এদিকে, দুধকুমার নদের পানি বেড়ে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার আন্ধারীঝাড় ইউনিয়ন এবং নাগেশ্বরী উপজেলার রায়গঞ্জ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে দুই ইউনিয়নের শতাধিক পরিবার। চরাঞ্চলের কিছু কিছু বাড়িঘরে পানি ঢুকতে শুরু করেছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক বলেন, এখনও বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি রেখেছি। চারটি উদ্ধার নৌকা ছাড়াও ত্রাণ সহায়তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুধকুমার নদের চরাঞ্চলে পানিবন্দি পরিবারের খবরে সেখানে সহায়তার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading