ব্লিঙ্কেনের চীন সফর: কি পেলেন, কি দিলেন?
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২০ জুন ২০২৩ । আপডেট ১৩:৩৫
বিশ্বব্যাপী আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের চীন সফর। বহুল আলোচিত এ সফরে বিশ্বের দুই শক্তিধর দেশের মধ্যে বরফ গলবে কিনা সে প্রশ্ন সর্বত্র। বিঙ্কেন তার এই চীন সফরে কি পেলেন আর কি দিলেন তা নিয়ে আরেফিন বাঁধনের প্রতিবেদন
চীন ও আমেরিকা সম্পর্ক: বরফ গলানোর উদ্যোগ
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চীন সফরে যাওয়ার কথা ছিল আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের। কিন্তু সেসময় আমেরিকা চীনের সন্দেহভাজন একটি গুপ্তচর বেলুন ভ‚পাতিত করার পর সেটি পিছিয়ে দেয়া হয়। এরপর গত রবিবার তিনি আলোচিত চীন সফরে বেইজিং পৌঁছান। ওইদনিই তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে রুদ্ধধার এক বৈঠক করেন। গত পাঁচ বছরে এটাই কোন মার্কিন শীর্ষ কূটনীতিকের প্রথম চীন সফর। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী চীনের শীর্ষ ক‚টনীতিক ওয়াং ইয়ের সাথেও বৈঠক করেছেন। অন্যান্য আরো নানা ইস্যু থাকলেও স¤প্রতি মার্কিন-চীন সম্পর্ক খারাপ হয়েছে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য দ্বন্দ্ব, মানবাধিকার এবং তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে উত্তেজনার কারণে। দুই দিনের চীনে সফরের শেষ পর্যায়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন ব্লিঙ্কেন।
সোমবার (১৯ জুন) বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কয়ারে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিয়ের সঙ্গে ব্লিঙ্কেনের বৈঠক হয়। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলেন, চীন ও আমেরিকার সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্ববহ এবং একে স্থিতিশীল রাখাা দু দেশেরই দায়িত্ব। আমেরিকা চীনকে অর্থনৈতিকভাবে বোতলবন্দী করতে চাইছে না। তার কথায় এরকম কিছু করাটা মার্কিন স্বার্থের অনুকুল নয়, এবং চীনের অর্থনৈতিক সাফল্য আমেরিকার জন্য লাভজনক। কিন্তু আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্যে ‘বিশেষ কিছু প্রযুক্তি’কে অবশ্যই আগলে রাখতে হবে। চীন ও আমেরিকার মধ্যে সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখা প্রয়োজন, একথা উল্লেখ করে তিনি বলেন চীনের সাথে আমেরিকার প্রতিযোগিতা সংঘাতে পরিণত হোক এটা কাম্য নয়।
বৈঠকে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের অবাধ চ্যানেল চালুর মাধ্যমে ‘দায়িত্বশীল প্রতিযোগিতা বজায়’ রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন, যাতে প্রতিযোগিতা সংঘাতে পরিণত না হয়। চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই বলেছেন যে চীন-মার্কিন সম্পর্ক খারাপ হবার ‘মূল কারণ’ হচ্ছে তার দেশ সম্পর্কে আমেরিকার ‘ভুল ধারণা।’ এ প্রেক্ষাপটে ব্লিঙ্কেনের এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছিল এবং এর দিকে সারা বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল।
সম্পর্ক উন্নয়নে আমেরিকার কাছ থেকে যা আশা করে চীন
চীনের প্রসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পক্ষ থেকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়-চীনা পক্ষ তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে, এবং সুনির্দিষ্ট কিছু ইস্যুতে কিছু অগ্রগতি এবং মতৈক্য হয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি বলেন, ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে এবং তিনি আশা করেন যে এ সফরের মধ্যে দিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘চীন-আমেরিকা সম্পর্ককে স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে’ অবদান রাখতে পারবেন। বৈঠকে শি জিনপিং বলেন, চীন নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে এবং দুই পক্ষ (চীন ও আমেরিকা) প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও আমি বালিতে যে সাধারণ বোঝাপড়ায় পৌঁছেছিলাম তা অনুসরণ করতে সম্মত হয়েছে। বিবিসি জানিয়েছে, তিনি চীন ও আমেরিকার সম্পর্কের উন্নতির জন্য বিøঙ্কেনকে আরও কিছু করার আহ্বান জানান।

শি জিনপিং
চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, চীন ও আমেরিকার সম্পর্ককে স্থিতিশীল করতে বিøঙ্কেন ‘আরও ইতিবাচক ভ‚মিকা রাখবেন’ বলে তিনি আশা করেন। রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের মিথস্ক্রিয়া সবসময়ই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা ভিত্তিক হওয়া উচিত। আমি আশা করি এই সফরের মাধ্যমে, ব্লিঙ্কেন চীন-আমেরিকা সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে আপনি আরও ইতিবাচক অবদান রাখবেন। দুই পক্ষ ‘অগ্রগতি ঘটিয়ে কিছু নির্দিষ্ট ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছেছে, এট খুব ভালো’ বলেও মন্তব্য করেছেন শি। তিনি চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিনের সঙ্গে ব্লিঙ্কেনের বৈঠককে ‘অকপট ও গভীর আলোচনা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
যে বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছে বেইজিং-ওয়াশিংটন
বেইজিং-ওয়াশিংটনের সম্পর্ক উন্নয়নে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর এখন আলোচনার কেন্দ্রে। সোমবার সকালে বেইজিংয়ে চীনা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, বেইজিং-ওয়াশিংটনের সম্পর্কের ঘাটতির জায়গাটা হচ্ছে, তার দেশের সম্পর্কে ভুল ধারণা রয়েছে আমেরিকার।
বিভিন্ন সময় চীনের ওপর আরোপিত একতরফা নিষেধাজ্ঞা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বাধার অভিযোগ এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলানোর আহ্বানজানিয়েছেন এই চীনা কূটনীতিক। দুই দেশের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা চলছে তা যেন সংঘর্ষে না গড়ায়, এ বিষয়টিও মনে করিয়ে দেন ওয়াং ই।বাইডেন প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে ক‚টনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন ব্লিঙ্কেন। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় গত মাসে ঊর্ধ্বতন চীনা ও মার্কিন কর্মকর্তারা মিলিত হলে সম্পর্কের বরফ গলা শুরু হয়।

ওয়াং ই
এর আগে গত রবিবার বইজিংয়ে পৌছেই চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন গ্যাংয়ের সঙ্গে সাড়ে সাত ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বৈঠক করেন অ্যান্টনি। ওই বৈঠকে দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কিছু মত বিরোধ দূর হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক বিমান চলাচল বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দুই দিনের চীন সফরের প্রেক্ষিতে আশা করা হচ্ছে এ বছরই কোনো এক সময়ে দুই দেশের প্রেসিডেন্ট মুখোমৃখি বৈঠকে বসতে পারেন। দুপক্ষের মধ্যে এখনো অনেক বিষয়ে মতবিরোধ থাকলেও ওয়াশিংটন এবং বেইজিংয়ের উচ্চ পর্যায়ের কমকর্তাদের মধ্যেও বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তাইওয়ানের স্বাধীনতা সমর্থন করে না আমেরিকা, সমঝোতার সুযোগ নেই বলছে চীন
তাইওয়ান প্রশ্নে আমেরিকার এক চীন নীতিকে পুর্নব্যক্ত করে ব্লিঙ্কেন বলেন, সেই নীতিতে কোন পরিবর্তন হয়নি এবং আমেরিকা তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না। তিনি বলেন উত্তর কোরিয়াতে যা ঘটছে তা নিয়েও প্রেসিডেন্ট শি-র সাথে তার কথা হয়েছে, এবং উত্তর কোরিয়া যে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ বন্ধ করা সহ দায়িত্বশীল আচরণ করে – তার ব্যাপারে বিশ্বের দেশগুলোর অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। ব্লিঙ্কেন বলেন, শিনজিয়াং, তিব্বত ও হংকং-এ চীনের মানবাধিকার লংঘন নিয়েও আমেরিকা উদ্বিগ্ন।
তবে তাইওয়ান প্রণালীতে চীনের ‘উস্কানিমূলক কর্মকান্ডের’ বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট শি-র সাথে বৈঠকে এ বিষয়টি তিনি তুলেছেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ওয়াং ই মি. ব্লিঙ্কেনকে বলেছেন, তাইওয়ান নিয়ে ‘সমঝোতার কোন সুযোগ নেই’। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন গ্যাং গত রবিবার বলেছিলেন, এই দ্বীপটি চীনের ‘মূল স্বার্থ সংশ্লিষ্ট’ এবং মার্কিন-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু’।চীন গণতান্ত্রিক স্বায়ত্ব-শাসিত তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখন্ডের অংশ মনে করে এবং এর নিয়ন্ত্রণ নিতে শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেয় না।
আর এখন যেখানে আমেরকিা তাইওয়ানকে সমর্থন দিচ্ছে, তখন চীন একে তাদের দীর্ঘদিনের ‘এক চীন নীতি’র বিরোধী হিসেবে দেখছে। এদিকে, মার্কিন নীতি বেইজিংয়ের ওই অবস্থানকে সমর্থন করে না এবং এর আওতায় ওয়াশিংটন তাইওয়ানের সাথে একটি ‘শক্তিশালী অনানুষ্ঠানিক’ সম্পর্ক বজার রাখে।এর মধ্যে রয়েছে দ্বীপটির কাছে অস্ত্র বিক্রি যাতে তারা নিজের প্রতিরক্ষায় সেসব ব্যবহার করতে পারে।
রাশিয়াকে ‘প্রাণঘাতী সহায়তা’ দেবে না চীন
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলেছেন, ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধে রাশিয়াকে কোন ‘প্রাণঘাতী সহায়তা’ দেবে না চীন। বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে ব্লিঙ্কেন আরও বলেন, চীনের এ অঙ্গীকারের কথা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বার বার জানানো হয়েছে, শুধু আমেরিকা নয়, অন্যান্য দেশকেও। চীনের কিছু প্রাইভেট কোম্পানির ব্যাপারে আমরা উদ্বিগ্ন, যারা হয়তো কিছু সহায়তা দিচ্ছে যার উদ্দেশ্য স্পষ্টতই ইউক্রেনে রুশ সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো। তিনি বলেন প্রেসিডেন্ট শি এবং চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই – উভয়ের সাথেই তার কথোপকথন ছিল জোড়ালো – এবং তাতে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসী যুদ্ধ থেকে শুরু করে আমেরিকার ফেন্টানিল সংকট পর্যন্ত সবই অন্তর্ভুক্ত ছিল।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২০ জুন ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা
বিশ্বের শান্তি ও উন্নয়নে চীন-আমেরিকার প্রভাব কতটা?
বর্তমানে আন্তর্জাতিক সমাজ সাধারণভাবে চীন-মার্কিন সম্পর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশ্ব এই দুই দেশের মধ্যে দ্ব›দ্ব ও সংঘাত দেখতে চায় না, চায় দু’দেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা। দুই দেশের উচিত ইতিহাস, জনগণ ও বিশ্বের প্রতি দায়বদ্ধতার মনোভাব নিয়ে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং যৌথভাবে বৈশ্বিক শান্তি ও উন্নয়নে অবদান রাখা। বিশ্ব উন্নত হচ্ছে, যুগ বদলাচ্ছে। এমন একসময়ে বিশ্বের জন্য একটি স্থিতিশীল চীন-মার্কিন সম্পর্ক প্রয়োজন। চীন ও আমেরিকর সঠিকভাবে পথচলা মানবজাতির ভাগ্য ও ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব ফেলবে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, বিশাল এই পৃথিবী চীন ও আমেরিকার সমান্তরাল উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করতে সক্ষম।
চীনা কূটনীতিকরা মনে করেন, আমেরিকা চীনের উপর থেকে একতরফা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া দরকার। সেই সঙ্গে আমেরিকা যাতে চীনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের ওপর ‘দমন চেষ্টা’ বন্ধ করে এবং চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে সে দিকে নজর দেয়ার প্রয়োজন। চীনা জনগণ মার্কিনিদের মতো আত্মমর্যাদাশীল, আত্মবিশ্বাসী ও আত্মনির্ভরশীল; তাদেরও উন্নত জীবন সন্ধান করার অধিকার রয়েছে। এ অবস্থায়, দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন কল্যাণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে এবং একে অপরের সাফল্যকে হুমকি নয়, বরং সুযোগ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
ইউডি/এজেএস

