মোদিকে ঠেকাতে বিরোধীরা একাট্টা, কোন পথে ইন্ডিয়ায় রাজনীতি
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২৬ জুন ২০২৩ । আপডেট ১১:০০
আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ইন্ডিয়ার বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তারা বিজেপিকে রুখতে ১৭ দলের জোট তৈরি করেছেন। মোট কথা ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে জোট বেঁধেছেন রাহুল-কেজরিওয়াল-মমতারা। পাটনা শহরের এ বৈঠককে ঐতিহাসিক বলে অভিহিত করা হচ্ছে। এরপর সিমলায় বিরোধীদের বৈঠকেই ঠিক হবে ভবিষ্যৎ রুপরেখা। এমনিতে একে অপরের সঙ্গে রাজনৈতিক মিল তো দূরের কথা, মনের মিলটুকুও নেই। অবশ্য প্রকাশ্যে সৌজন্যটুকু রাখে সব দলই। কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদে সেই শত্রুরাই যেন এবার মিত্রতে পরিণত হয়েছে!
কারা আছেন জোটে
কে নেই সেখানে; বিহারের মুখ্যমন্ত্রী তথা জনতা দল ইউনাইটেড (জেডিইউ) প্রধান নীতিশ কুমার এবং রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী ও রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) নেতা তেজস্বী যাদব। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, দলের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টি (আপ) প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী আপ নেতা ভগবন্ত মান, আপ সাংসদ রাঘব চাড্ডা, মহারাষ্ট্রের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরে, বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদব, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী তথা ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম) নেতা হেমন্ত সোরেন, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি) প্রধান শারদ পাওয়ার, জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) প্রধান মেহেবুবা মুফতি, ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি) নেতা ওমর আব্দুল্লাহ, উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা সমাজবাদী পার্টি (সপা) নেতা অখিলেশ যাদব, দ্রাবিড়া মূনেত্রা কাযাগাম (ডিএমকে) নেতা টিআর বালু, সিপিআই নেতা ডি রাজা, সিপিআইএম-এর সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি এবং অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
বিহার রাজ্যের পাটনা শহরে বৈঠকের পর খাড়গে, মমতা, পাওয়ার, উদ্ধব ও কেজরিওয়ালরা সাংবাদিক সম্মেলনে বিরোধী দলগুলোর এক হওয়ার বার্তা দেন। সেখানেই বিরোধীদের জোট গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিরোধী দলগুলোর লক্ষ্য ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয় লাভ করা। এ ষিয়ে সিমলায় আবার বৈঠকে বসা হবে। এছাড়া তারা নির্বাচনে একসঙ্গে লড়ার বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছেন।
অ্যাজেন্ডা তৈরি করা হবে
এরপর মল্লিকার্জুন খাড়গের উদ্যোগে পরবর্তী আলোচনা বৈঠক হবে বলে জানান নীতিশ কুমার। জোটের পরবর্তী রণকৌশল তৈরি করতে সিমলার ওই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে। রাহুল গান্ধী এ দিন বলেন, ‘কমন অ্যাজেন্ডা তৈরি করা হবে। আলাদা আলাদা রাজ্যের জন্য কৌশল ঠিক করতে হবে। অভিন্ন কর্মসূচি তৈরি করতেই এ বৈঠক ডাকা হয়েছে। দেশের মূল ভীতের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। মতপার্থক্য হবেই তবে সবাই একজোট হয়েই কাজ করব। সংবিধানের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করা হচ্ছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, পাটনায় ১৭ দলের বৈঠক হয়েছে। পাটনা থেকে যেই আন্দোলন শুরু হয় সেটা জনআন্দোলনের রূপ নেয়। তিনটা বিষয় নজরে থাকবে। আমরা এক, একসঙ্গে লড়াই করব, আমাদের বিরোধী বলবেন না। বিজেপির সরকার যে স্বৈরাচারি শাসন চালাচ্ছে সেটা বন্ধ করতে হবে। তারা ইডি-সিবিআইকে বিরোধী দলের পিছনে লাগিয়ে দেয়, সাংবাদিকদের কন্ঠরোধ করার চেষ্টা করছে। আমরাও দেশের নাগরিক, আমরাও দেশপ্রেমী। রক্ত ঝরবে তবুও এই কালো আইনের বিরুদ্ধে লড়াই করন।
সহজ নয়
তবে বিজেপি-মুক্ত ইন্ডিয়া বা লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিকে হারানোর কাজটা যে সহজ নয়, সেটা বিরোধী নেতারা খুব ভালো করেই জানেন। কারণ, বিরোধীদের মধ্যে রয়েছে নানা ধরনের স্বার্থের সংঘাত। আঞ্চলিক দলগুলো চাইছে, যেখানে তারা প্রধান দল, সেখানে যেন কংগ্রেস ভোটে না লড়ে। লড়লেও সামান্য কয়েকটা আসনে লড়ে। যা করতে কংগ্রেস একেবারেই রাজি নয়। আবার কংগ্রেসের যেখানে জোর, সেখানে অন্য বিরোধী দলগুলো প্রার্থী দেবে। যেমন আম আদমি পার্টি গুজরাট ও কর্ণাটকে দিয়েছিল। রাজস্থান, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশে দেবে। তৃণমূল এর আগে গোয়ায় প্রার্থী দিয়েছিল।
তাই নীতীশ এবং মমতা যে একজন বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে একজন বিরোধী প্রার্থী দেয়ার কথা বলছেন, তা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। বৈঠকে নীতীশ কুমার বলেছেন, গণতন্ত্রকে বাঁচাতে আমাদের সবাইকে এক হতে হবে। রাহুল গান্ধী বলেছেন, যে কোনো বিরোধ মুখোমুখি বসে সমাধান করা হবে। এই পরিস্থিতিতে রাহুল বলেছেন, বিরোধী দলগুলো ২০২৪-এর ভোটে বিজেপি-কে হারাবার জন্য একজোট হয়েছে। লড়াইটা হলো ভারত জোড়ো মতাদর্শের সঙ্গে ভারত তোড়ো মতাদর্শের।
ফাটলের চিহ্ন
বিরোধীদের এই বৈঠকে ঐক্যের ছবিটাই যে শুধু দেখা গিয়েছে তা নয়, অনৈক্যও সামনে এসেছে। বৈঠক শুরু হওয়ার আগেই অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও তার দল বলতে শুরু করে, দিল্লি সরকারের হাত থেকে অফিসার নিয়োগের ক্ষমতা কেড়ে নিতে কেন্দ্র যে অর্ডিন্যান্স এনেছে, সব বিরোধী দলকে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু কংগ্রেস এখনো তা এই বিল নিয়ে কিছু বলেনি। পরে দলের মুখপাত্র প্রিয়াঙ্কা কক্কর বলেছেন, বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে এই বিল নিয়ে সমঝোতা হয়ে গেছে। কংগ্রেস এক্ষেত্রে বিজেপি-কে সমর্থন করবে।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেছেন, সাধারণত কংগ্রেস সংসদীয় দলের বৈঠকে এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সংসদ শুরু হওয়ার আগে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এখানে সব বিরোধী দল একজোট হয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বিরোধিতাকে সরিয়ে রেখে মতৈক্যের বিষয়গুলিকেই সামনে রাখা হচ্ছে।
পাটনায় মহাবৈঠককে ‘ফটো সেশন’ বলে কটাক্ষ অমিত শাহের
পাটনায় বৈঠক শুরুর মুখেই বিরোধীদের তীব্র কটাক্ষ করেছেন বিজেপি নেতা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি শুক্রবার ছিলেন দেশটির কাশ্মীরে। সেখানে এক অনুষ্ঠানের ভাষণে কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধী নেতাদের আজ ফটো সেশন আছে পাটনায়। সকলে সেখানে গিয়েছেন। ওঁরা হাত ধরাধরি করে দাঁড়াবেন। তারপর ছবি তোলা হবে।’ অমিত শাহ আরও বলেন, বিরোধীদের এই ফটো সেশন নতুন কিছু নয়। আগেও ওঁরা হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়েছেন। তাতে ভোটের ফলাফলে কোনও তারতম্য হয় না। তাঁর দাবি, ‘আগামী লোকসভা ভোটেও নরেন্দ্র মোদী অন্তত ৩০০ আসনের অধিকারী হয়ে ফের সরকার গড়বেন। মোদীজির কোনও বিকল্প নেই।’
ইউডি/এ

