খাদ্য মজুদ আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত হোক
কিফায়েত সুস্মিত । বুধবার ,০৫ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১৩:১৫
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বাংলাদেশের বাজারেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি হচ্ছে। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের বাজার পর্যবেক্ষণ থেকে যে বিষয়টি ফুটে উঠেছে সেটি হচ্ছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে মজুদ করে অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসার জন্য খাদ্য মজুদ করা অস্বাভাবিক নয় কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজার অস্থিতিশীল করার জন্য অতিরিক্ত খাদ্য মজুদ করে সংকট তৈরি করে থাকে। এটি অপরাধ।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতিনির্ধারকদের সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অতিরিক্ত মজুদদারির বিষয়টি আইনের আওতায় থাকলেও কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। তাই আইন হালনাগাদের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে। শুক্রবার সময়ের আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সরকার নির্ধারিত পরিমাণের বেশি খাদ্যদ্রব্য মজুদ করলে বা মজুদ-সংক্রান্ত সরকারের কোনো নির্দেশনা অমান্য করলে তা হবে অপরাধ। এর শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ- বা সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড। তবে এরূপ অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে, তিনি আর্থিক বা অন্য কোনো প্রকার লাভের উদ্দেশ্য ব্যতীত মজুদ করেছিলেন তা হলে তিনি অনূর্ধ্ব ৩ মাস কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এই অপরাধ হবে অজামিনযোগ্য। বিলে বলা হয়েছে, এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণে সারা দেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আদালত থাকবে। এই আদালত খাদ্যদ্রব্য বিশেষ আদালত নামে অভিহিত হবে। উন্নত রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সরকারের কঠোর ভূমিকা রয়েছে।
চীনে ২০১৫ সালে মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। আইন জনগণের কল্যাণে তৈরি করা হয়। যে কারণে আইনের শাসন না থাকলে যেকোনো ক্ষেত্রেই বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। মানুষের প্রয়োজনের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত লাভের আশায় খাদ্যদ্রব্য মজুদ করলে তাতে বাজারে সংকট তৈরি হয়। এটি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব খাদ্য মন্ত্রণালয়ের। যে কারণে মূলত বাধ্য হয়েই নতুন আইন প্রণয়নের চিন্তা করতে হয়। কারণ একশ্রেণির ব্যবসায়ীর অতিরিক্ত মুনাফাপ্রীতি বিদ্যমান আইনে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বাজারব্যবস্থায় খুচরা ও পাইকারি বাজারের মধ্যে দামের পার্থক্য থাকে অনেক বেশি। এ কারণে স্বস্তি মিলছে না ভোগ্যপণ্যের বাজারে। পণ্যমূল্য কমার কোনো লক্ষণ তো নেই-ই, উল্টো ঈদের আগে আরও এক দফা দাম বেড়েছে। চিনি নিয়ে ব্যবসায়ীরা এখনও সাপলুডু খেলছে।
ভোজ্য তেলে লিটারে ১০ টাকা দাম কমানো হলেও তার পুরোপুরি বাস্তবায়ন নেই। গরম মসলার উত্তাপ আরও বেড়েছে। কাঁচা বাজারে কাঁচামরিচের দাম আকাশচুম্বী। ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু হলেও দাম তেমন একটা কমেনি। মাছ, মাংস, চাল-ডালের বাজারও বেসামাল। ঈদ সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা আরও এক দফা সবকিছুর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ইতিমধ্যে বাজারে নতুন করে আরও বেড়েছে জিরা ও চিনির দাম। ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বাংলাদেশের বাজারেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি হচ্ছে।
কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের বাজার পর্যবেক্ষণ থেকে যে বিষয়টি ফুটে উঠেছে সেটি হচ্ছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে মজুদ করে অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসার জন্য খাদ্য মজুদ করা অস্বাভাবিক নয় কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজার অস্থিতিশীল করার জন্য অতিরিক্ত খাদ্য মজুদ করে সংকট তৈরি করে থাকে। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতিনির্ধারকদের সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ভোজ্য তেল ও চিনির দাম বেঁধে দেওয়া হলেও কেন কার্যকর হলো না তা খতিয়ে দেখা দরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছা থাকতে হবে।
তবে মানসিকতা পরিবর্তন না হলে আইনের মাধ্যমে পরিবর্তন সম্ভব নয় বলে মনে করে সচেতন সমাজ। কিন্তু কঠোর শাস্তির উদাহরণ না থাকলে দিনের পর দিন এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে। আমরা প্রত্যাশা করি, বাজারে খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ থেকে সরবরাহ এবং বিপণনে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কঠোর নজরদারি করবে, যেন ব্যবসায়ী পর্যায়ে অতিরিক্ত খাদ্য মজুদ করার কোনো সুযোগ তৈরি না হয়। সে ক্ষেত্রে নতুন আইন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে জোরালো ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি।

