ফুকুশিমার পানি সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া কতটা নিরাপদ?

ফুকুশিমার পানি সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া কতটা নিরাপদ?

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ১০ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১০:৪৪

ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১২ লাখ টনেরও বেশি পানি নিষ্পত্তি করার পরিকল্পনা নিয়েছে টোকিও। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) অবশেষে এটি অনুমোদন করেছে জানিয়ে তারা বলছে, নিষ্পত্তির পদ্ধতিটি ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ’ ছিল। আইইএ রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, নিষ্কাশন করা পানি পরিবেশের উপর ‘নগণ্য তেজষ্ক্রিয় প্রভাব’ ফেলবে। জাপান সরকার এবং ২০১১ সালের ভূমিকম্প এবং সুনামিতে বিকল হওয়া প্ল্যান্টের অপারেটর আইএইএ-এর অনুমোদনকে স্বাগত জানিয়েছে।

যদিও বেশিরভাগ জাপানি নাগরিক এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে পানি থেকে কার্যত সমস্ত তেজস্ক্রিয়তা সরানো হয়েছে এবং তাই এটি প্রশান্ত মহাসাগরে নিঃসরণ করা সবচেয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ। তবে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেছেন, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলির অনেকেই জাপানের সিদ্ধান্তে সমর্থন জানাননি। দক্ষিণ কোরিয়ার বিরোধী রাজনীতিকরা টোকিওর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার দেশটির জাতীয় পরিষদে বসার পরিকল্পনা করছিলেন। শনিবারও পার্লামেন্টের বাইরে সমাবেশের পরিকল্পনা করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি।

চীন ক্ষোভ প্রকাশ করেছে

টোকিওতে চীনা রাষ্ট্রদূত উ জিয়াংহাও মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বেইজিংয়ের এই পরিকল্পনার বিরোধিতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘একটি পারমাণবিক দুর্ঘটনা থেকে দূষিত পানি সমুদ্রে ছাড়ার ঘটনা নজিরবিহীন।’ জিয়াংহাও উল্লেখ করেছেন যে, চীন উত্তর-পূর্ব জাপানের ১০টি জায়গা থেকে সমস্ত খাদ্যসামগ্রী আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। ২০১১ সালের মার্চে ভূমিকম্প (রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিলো ৯) এবং সুনামির পরে ফুকুশিমা প্ল্যান্টের তিনটি চুল্লির গলিত হওয়ার সবচেয়ে গুরুতরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল এগুলি। চীন প্রস্তাব করে যে আমদানি নিষেধাজ্ঞা জাপানের বাকি অংশের জন্য জারি হতে পারে। তার কথায়, ‘চীন কী পদক্ষেপ নেবে, পরবর্তী পর্যায়ে আমরা কী করব, তা নির্ভর করছে জাপানের নিষ্কাশন পরিকল্পনার উন্নয়নের উপর।’

পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদ

পরিবেশবাদী গোষ্ঠীগুলোও এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। বুধবার সোলে বিক্ষোভকারীরা এ নিয়ে প্রতিবাদ জানান। জাপান সরকারের পরিকল্পনার সমর্থনে আইএইএ-র পেশ করা রিপোর্ট প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা। গ্রিনপিস টোকিওকে সমুদ্রের আইন সংক্রান্ত জাতিসংঘের কনভেনশন লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করেছে। টোকিওভিত্তিক সিটিজেনস নিউক্লিয়ার ইনফরমেশন সেন্টারের সেক্রেটারি জেনারেল হাজিমে মাতসুকুবো এ বিষয়ে উদ্বেগে কথা জানান।

ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘আমরা এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে কোনোভাবে একমত নই। আমরা বিশ্বাস করি সরকারের কাছে আরো অনেক ভালো বিকল্প আছে। এখানে আরো ট্যাঙ্ক নির্মাণ না করার কোনো কারণ নেই, ভূগর্ভস্থ জলাধার তৈরি করা যেতো। রেডিওনিউক্লাইড অপসারণের জন্য আরো ভাল প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা চালু করা যেতো।’ তার কথায়, ‘জাপান এ সবের পরিবর্তে সবচেয়ে সহজ এবং সস্তার বিকল্পটি বেছে নিয়েছে। আমি মনে করি তারা এই বিকল্প বেছে নিয়েছে, কারণ এটি ব্যয়বহুল নয়।’

আইএইএ-র সমস্যা

মাতসুকুবো বলেন, জাপান সরকার আইএইএ-এর সমর্থনের অভিব্যক্তিকে ব্যবহার করছে। প্রায় নিশ্চিতভাবে গ্রীষ্মের শেষের আগে এটি শুরু হওয়ার কথা। তবে এর জন্য কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ নেই। তার প্রশ্ন, ‘টেপকো বলছে যে পানি ছেড়ে দেওয়া সামগ্রিক ডিকমিশন পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পাওয়ার স্টেশনটি স্থিতিশীল এবং বিচ্ছিন্ন করার জন্য কখনও বিশদ সময়সূচি ছিল না, তাহলে কেন এটি প্রয়োজনীয়?’ মাতসুকুবো আইএইএর স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এটি পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনকারী দেশগুলির অর্থায়নে চলে এবং মূলত পারমাণবিক শক্তির প্রচারের দায়িত্বপ্রাপ্ত। জাপানের পারমাণবিক সেক্টরের ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে, অন্তত ফুকুশিমা প্লান্টে নয়, টেপকো এবং জাপান সরকারের দেওয়া তথ্যের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন করা উচিত।

মাতসুকুবোর কথায়, ‘সরকার বলছে এএলপিএস (অ্যাডভান্সড লিকুইড প্রসেসিং সিস্টেম) পানি থেকে বিভিন্ন রেডিওনিউক্লাইড অপসারণ করছে যাতে এটিকে আগের তুলনায় পাতলা করে সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া যায়। কিন্তু পানির কোনো আলাদা পরীক্ষা করা হয়নি, তাহলে আমরা কীভাবে নিশ্চিত হতে পারি’, প্রশ্ন রাখেন তিনি। জুনের প্রথম দিকে টেপকোর জারি করা একটি রিপোর্ট দেখায় যে ৭০ শতাংশের বেশি পানি নির্গত হওয়ার কারণে এএলপিএল সিস্টেমের সঙ্গে প্রক্রিয়া করার পরেও বিকিরণ থেকে দূষণমুক্ত করার আইনি মান পূরণ করে না। সংস্থাটি তখন বলেছিল, প্রয়োজনীয় মানগুলি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পানি শুদ্ধ করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে তারা।

বিশ্বের পারমাণবিক বিপর্যয়ের ১২ বছরেরও বেশি সময় পরে, জাপানের আশা, ঘটনাস্থলের স্টোরেজ ট্যাঙ্কগুলি থেকে পানি ছেড়ে দেওয়া দীর্ঘস্থায়ী ডিকমিশন প্রক্রিয়ার আরেকটি যুগান্তকারী ঘটনা হবে। এতে কমপক্ষে ৪০ বছর সময় লাগবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে পারমাণবিক জ্বালানি সংগ্রহ এবং অপসারণের জন্য প্রযুক্তির প্রয়োজন, যা এখনো ঠিক হয়নি।

স্থানীয় বিরোধিতা

টেম্পল ইউনিভার্সিটির টোকিও ক্যাম্পাসের রাজনীতির অধ্যাপক হিরোমি মুরাকামি বলেন, ‘স্থানীয় জনগণ এবং উত্তর-পূর্ব জাপানের মৎস্যজীবীরা ক্রমাগত এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে। কারণ তাদের ধারণা, এটি তাদের ব্যবসা এবং জীবনযাত্রায় গুরুতর প্রভাব ফেলবে। কিন্তু জাপানের অনেকের বক্তব্য, দুর্ঘটনাস্থল থেকে আরো বেশি পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব।’ তার কথায়, ‘আস্থা অর্জন করতে টেপকোকে আরো খাটতে হবে। জাপানের সঙ্গে রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়িক বিশ্বের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে সবসময় প্রশ্ন থাকবে, কিন্তু আমরা এখন এই পরিস্থিতিতে আছি। আমাদের ধরে নিতে হবে এটাই সেরা পদক্ষেপ।’

‘পারমাণবিক শক্তি’ বৃদ্ধির পথে জাপান

২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার এক পঞ্চমাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রনির্ভর রাখতে চায় জাপান। ২০৫০ সালের মধ্যে পুরোপুরি কার্বন-নিরপেক্ষ হবার লক্ষ্যও রয়েছে তাদের। গত বছরের জুলাই পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জাপানে এখন সাতটি রিঅ্যাক্টর কাজ করছে। এর বাইরেও দ্বীপ দেশটির এমন তিনটি রিঅ্যাক্টর রয়েছে যেগুলো মেরামতের প্রয়োজনে আপাতত বন্ধ। তবে সারা বিশ্বে জ্বালানি সংকট বেড়ে চলায় আরো নয়টি রিঅ্যাক্টর চালু করার পাশাপাশি আগামী বছরের গ্রীষ্ম নাগাদ নতুন সাতটি রিঅ্যাক্টর তৈরিরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপান।

ইউডি/এ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading