দ্য ড্রাগন ট্র্যাপ: তাইওয়ানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে চীনের সামরিক প্রতিবন্ধকতা

দ্য ড্রাগন ট্র্যাপ: তাইওয়ানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে চীনের সামরিক প্রতিবন্ধকতা

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১২ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১২:৪৫

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারিতে রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ শুরুর পর এবং বিশেষত ২ আগস্টে মার্কিন আইনসভার নিম্নকক্ষ ‘হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস’–এর স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরের পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছিল যে, চীন (আনুষ্ঠানিক নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী চীন’) ও তাইওয়ানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হতে পারে।

অবশ্য এখন পর্যন্ত চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়নি এবং তাইওয়ানের সন্নিকটে সামরিক মহড়া পরিচালনার মধ্যে চীন তাদের প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ রেখেছে। কিন্তু ভবিষ্যতে চীন যে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাইওয়ানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে না, এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। উল্লেখ্য, তাইওয়ান (চীন প্রজাতন্ত্র) প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত একটি দ্বীপরাষ্ট্র, যেটি ১৬৮টি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এবং যেটির ৯৯% ভূখণ্ড তাইওয়ান দ্বীপের অন্তর্ভুক্ত।

চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে চীন যে সহজেই বিজয়ী হতে পারবে, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রথমত, ১৯৮০–এর দশকের পর থেকে চীনা সশস্ত্রবাহিনী (আনুষ্ঠানিক নাম ‘গণমুক্তি ফৌজ’) কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। বস্তুত ২০২০ সালে ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে একটি ক্ষুদ্র সীমান্ত সংঘাত ছাড়া বিগত তিন দশকে চীন কোনো ধরনের উল্লেখযোগ্য সশস্ত্র সংঘাতে জড়ায়নি। অর্থাৎ, চীনা সশস্ত্রবাহিনীর অফিসার ও সৈনিকদের বাস্তবিক সামরিক অভিজ্ঞতা অত্যন্ত সীমিত। সুতরাং, চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে চীনা অফিসার ও সৈন্যদেরকে সম্পূর্ণ অজানা একটি পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে এবং যুদ্ধক্ষেত্রের অতি কঠিন বাস্তবতার মধ্যে প্রকৃত সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। তাইওয়ানের বিরুদ্ধে দ্রুত বিজয় অর্জনের ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, তাইওয়ান দ্বীপ তাইওয়ান প্রণালীর মাধ্যমে চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। সুতরাং চীন যদি তাইওয়ান দ্বীপের ভূখণ্ডে সৈন্য প্রেরণ করতে চায়, সেক্ষেত্রে চীনা নৌবহরকে উক্ত প্রণালী অতিক্রম করে তাইওয়ানের উপকূল পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে তাইওয়ান দ্বীপের ভূখণ্ডের যে অংশটি সবচেয়ে কাছাকাছি, সেখান থেকেও চীনের মূল ভূখণ্ডের দূরত্ব ১২৮ কিলোমিটার। তাইওয়ানে সৈন্য প্রেরণের ক্ষেত্রে চীনা নৌবহরকে তাইওয়ান দ্বীপের যেসব বন্দরে পৌঁছাতে হবে, চীনা মূল ভূখণ্ড থেকে সেগুলোর দূরত্ব আরো বেশি।

চীন বিপুল সংখ্যক পরিবহন বিমান ব্যবহার করে আকাশপথে অল্প কয়েক হাজার সৈন্যকে তাইওয়ান দ্বীপের ভূখণ্ডে প্রেরণ করতে পারবে ও তাদের রসদপত্র সরবরাহ করতে পারবে, কিন্তু তাইওয়ানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সেটি পর্যাপ্ত হবে না। তাইওয়ান অধিকার করতে হলে চীনকে বিপুল সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন করতে হবে এবং নৌপথ ব্যতীত অন্য কোনো পথে তাদেরকে তাইওয়ানে প্রেরণ করা সম্ভব হবে না। তদুপরি, উক্ত সৈন্যদের জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক যান, আর্টিলারি, গোলাবারুদ, খাদ্য, জ্বালানি, চিকিৎসা সামগ্রী প্রভৃতিও নৌপথে সরবরাহ করতে হবে।

এই বিপুল সংখ্যক সৈন্য ও বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ও রসদপত্র তাইওয়ানে প্রেরণের জন্য শত শত জাহাজ প্রয়োজন হবে এবং এই বিরাট নৌবহরকে তাইওয়ান প্রণালী অতিক্রম করতে হবে। চীনা নৌ ও বিমানবাহিনী উক্ত নৌবহরের সুরক্ষার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, কিন্তু নৌবহরটি দীর্ঘ সময় খোলা সমুদ্রে থাকবে। সেসময় তাইওয়ানিরা আকাশপথে আক্রমণ চালিয়ে, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং সাবমেরিনের মাধ্যমে আক্রমণ চালিয়ে উক্ত নৌবহরটির উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি সাধন করতে পারবে। অর্থাৎ, চীনা সৈন্যরা তাইওয়ান দ্বীপের ভূখণ্ডে পৌঁছানোর আগেই ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

তৃতীয়ত, তাইওয়ান দ্বীপের ভূখণ্ডে অবতরণের জন্য চীনা সৈন্যদেরকে তাইওয়ানের সমুদ্রবন্দরগুলো দ্রুতগতিতে ও তুলনামূলকভাবে কার্যকর অবস্থায় অধিকার করতে হবে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধের সময় তাইওয়ানিরা উক্ত সমুদ্রবন্দরগুলোয় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। এর ফলে একদিকে যেমন চীনা সৈন্যদের জন্য উক্ত বন্দরগুলো দ্রুতগতিতে অধিকার করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে, অন্যদিকে উভয় পক্ষের তীব্র লড়াইয়ে বন্দরগুলোর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে চীনা সৈন্যদের জন্য তাইওয়ান দ্বীপের ভূখণ্ডে অবতরণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

চতুর্থত, তাইওয়ানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে চীনা সৈন্যদেরকে তাইওয়ানের বিমানবন্দর ও বিমানঘাঁটিগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে এবং সেখানে চীনা পরিবহন বিমানগুলোর অবতরণের আগ পর্যন্ত সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হবে। কিন্তু তাইওয়ানি সশস্ত্রবাহিনী এরকম পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। সুতরাং ধরে নেয়া যেতে পারে যে, তাইওয়ানি বিমানবন্দর ও বিমানঘাঁটিগুলো অধিকার করা চীনা সৈন্যদের জন্য সহজ হবে না এবং এক্ষেত্রে কঠিন প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে পারে। তদুপরি, এরকম লড়াইয়ে বিমানবন্দর ও বিমানঘাঁটিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পঞ্চমত, বর্তমান যুগে যে কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাফল্য অর্জনের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে এয়ার সুপেরিয়রিটি অর্জন করা আবশ্যক এবং এজন্য যুদ্ধের শুরুতেই রাষ্ট্রগুলো প্রতিপক্ষের বিমানবাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়ার প্রচেষ্টা চালায়। সুতরাং এটি ধরে নেয়া যায় যে, যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে চীনারা তাইওয়ানি বিমানবাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়ার প্রচেষ্টা চালাবে।

কিন্তু তাদের এই প্রচেষ্টা সাফল্যমণ্ডিত হবে কিনা, সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ। তাইওয়ানি বিমানবাহিনীতে প্রায় ৭৫০টি বিমান রয়েছে এবং একসঙ্গে এগুলোর সবগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করা ও ধ্বংস করে দেয়া এমনিতেই যথেষ্ট কঠিন কাজ। তাইওয়ানি বিমানবাহিনীর গ্রাউন্ড ক্রুরা অত্যন্ত সুপ্রশিক্ষিত এবং ক্ষিপ্রগতিতে ক্ষতিগ্রস্ত যুদ্ধবিমান ও রানওয়ে মেরামত করতে সক্ষম। তদুপরি, তাইওয়ানি বিমানবাহিনী এখন তাদের বিমানগুলোকে তাইওয়ানের পার্বত্য অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ বিমানঘাঁটিগুলোয় সুরক্ষিত রেখেছে।

ইউডি/এ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading