ইন্ডিয়ার নৌ নেটওয়ার্ক পরিকল্পনায় বড় অংশজুড়ে বাংলাদেশ

ইন্ডিয়ার নৌ নেটওয়ার্ক পরিকল্পনায় বড় অংশজুড়ে বাংলাদেশ

কিফায়েত সুস্মিত । শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১২:১৫

নিজেদের পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্য, প্রতিবেশী বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে নৌপথে নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য চালাতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে ইন্ডিয়া; যেটির আওতায় এ অঞ্চলে পাঁচ হাজার কিলোমিটারের নৌ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা দেশটির। নৌপথের পূর্বাঞ্চলীয় এ নেটওয়ার্কের পরিকল্পনায় বাংলাদেশের নদীগুলোও রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইন্ডিয়ার আসাম রাজ্যের বন্দর, নৌপথ ও নৌ চলাচলমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোওয়াল। এটি ৪৯ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে মনে করছেন তিনি। ইতোমধ্যে ইন্ডিয়ার সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশের নদীগুলোর খননকাজে তার দেশ যুক্ত হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যের পাশাপাশি সীমান্ত সংলগ্ন ওই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের ইন্ডিয়ার প্রভাবও বাড়াবে বলে তিনি মনে করেন। সর্বানন্দ সনোওয়ালকে উধ্বৃত করে ইন্ডিয়ার অর্থনীতিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক টাইমস আরও বলেছে, ইন্ডিয়া সরকার পাঁচ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ও অবিচ্ছিন্ন এ নৌপথ গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

বাংলাদেশ, ভুটান, ইন্ডিয়া ও নেপালের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ার আশা: সর্বানন্দ সনোওয়াল বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গতিশীল নেতৃত্বে বর্তমান সরকার পাঁচ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ নিরবচ্ছিন্ন নৌপথ গড়ে তুলতে কাজ করছে। এ ধরনের নৌপথ শুধু আঞ্চলিক সংহতি কিংবা উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে তা নয়, বরং এটা বিবিআইএন হিসেবে পরিচিত পূর্বাঞ্চলীয় দেশ বাংলাদেশ, ভুটান, ইন্ডিয়া ও নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াবে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও বারাক নদীর নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে তিন হাজার ৫০০ কিলোমিটার ইকোনমিক করিডোর ব্যবহার করে উত্তরপূর্ব ইন্ডিয়ার সঙ্গে ইন্ডিয়ার বাকি অংশের সংযোগ ঘটানো হবে। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে নৌ ও সমুদ্র পথে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনার কথাও বলেছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা। তিনি বলেন, ইন্ডিয়া ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশে বেশ কিছু নদী খনন চলছে। অভ্যন্তরীণ নৌপথ ও সমুদ্রপথের নৌ যোগাযোগ সচল করার মাধ্যমে এ অঞ্চলে যোগাযোগ বাড়াতে কাজ চলছে। বাংলাদেশে বর্তমানে সচল আন্তর্জাতিক নৌপথের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, একটি পথ বর্তমানে খুলনার আংটিহারা হয়ে চাঁদপুর, আরিচা হয়ে সিরাজগঞ্জ এবং সর্বশেষ উত্তরবঙ্গের দইখাওয়া হয়ে ইন্ডিয়ার দিকে চলে গেছে। আরেকটি আংটিহারা, চাঁদপুর, ভৈরব ও আশুগঞ্জ হয়ে সিলেটের জকিগঞ্জ দিয়ে ইন্ডিয়ার দিকে বের হয়।

১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খননের প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের: বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, আরও কয়েকটি রুটের ব্যাপারে কথাবর্তা হচ্ছে। এগুলো কলকাতা বন্দরের সঙ্গে যুক্ত। রাজশাহী হয়ে পাকশি, সুলতানগঞ্জ হয়ে একটি রুট। এবং কুমিল্লার গোমতী নদী হয়ে আরেকটি রুটের কাজ চলছে। দেশের বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ নৌপথ সম্পর্কে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমান সরকার ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খননের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন সেই লক্ষ্যেই কাজ চলছে। গত মঙ্গলবার একনেক বৈঠকেও চারটি নদীতে ৭২১ কিলোমিটার দূরত্বের নাব্যতা ফিরিয়ে আনার একটি প্রকল্প পাস হয়েছে। ইন্ডিয়ার সঙ্গে নৌবাণিজ্য প্রসঙ্গে আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, আঞ্চলিক করিডোর ব্যবহার করে বর্তমানে ইন্ডিয়া থেকে অনেক জাহাজ বাংলাদেশ হয়ে পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহন করছে। তবে নদীপথের গভীরতা কম থাকার কারণে দুই মিটারের বেশি গভীর জাহাজ চলাচল করতে পারে না। যাত্রীবাহী জাহাজ গঙ্গাবিলাস বাংলাদেশ অতিক্রম করেছে। ইন্ডিয়ান ওয়েবসাইট ইন্ডিয়া শিপিং নিউজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, মিয়ানমারের উপকূলীয় সিতয়ু শহরে ইন্ডিয়ার অংশিক অর্থায়নে নির্মিত একটি বন্দর ইতোমধ্যেই পণ্য ওঠানামা শুরু করেছে। গত মার্চে সিতয়ু থেকে চালের একটি চালান বাংলাদেশে এসেছে। সিতয়ু বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, এ নৌপথের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইন্ডিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ও বাংলাদেশের সঙ্গে উত্তর ইন্ডিয়া, নেপাল ও ভুটানের সংযোগ ঘটানো। মিয়ানমারের সর্বপশ্চিমের শহর পালাতওয়া থেকে অভ্যন্তরীণ নৌপথ এসে সিতয়ুর সঙ্গে মিশে যাবে। সিতয়ু থেকে সমুদ্রপথে বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার যে কোনো বন্দরে যুক্ত হবে।

বিএসসি’র বহরে যুক্ত হচ্ছে ১২ কন্টেইনার জাহাজ: প্রতিষ্ঠার ৫১ বছরে এসে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে কন্টেইনারবাহী জাহাজ। আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টিইউস ধারণক্ষমতার ১২টি সেলুলার কন্টেইনার জাহাজ কেনার প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কেনা হবে ছয়টি কন্টেইনার জাহাজ, ওই জাহাজগুলো কেনার জন্য চলতি মাসে প্ল্যানিং কমিশনে প্রিলিমিনারি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (পিডিপিপি) পাঠিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। ২০২৬ সালের মধ্যে এ ছয়টি সেলুলার কন্টেইনার জাহাজ নিজেদের বহরে যুক্ত করতে চায় বিএসসি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মো. জিয়াউল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ২০২৬ সালের মধ্যে আমরা ১২টি সেলুলার কন্টেইনার জাহাজ বিএসসির বহরে যুক্ত করতে চাই। এর জন্য আমরা ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছি। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ছয়টি কন্টেইনার জাহাজ কেনার জন্য প্রিলিমিনারি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (পিডিপিপি) তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এটি এখন প্ল্যানিং কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায়। অস্ট্রেলিয়ার অর্থায়নে বাকি ছয়টি কন্টেইনার জাহাজ কেনা হবে। এগুলো নিয়ে প্রাথমিক কথাবার্তা চলছে। অস্ট্রেলিয়ার অর্থায়নে এ ছয় জাহাজও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তৈরি করা হবে। দুটি প্রকল্পই বিদেশি অর্থায়নে জিটুজি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি জানান, কন্টেইনার জাহাজগুলো হবে উন্নত প্রযুক্তির পরিবেশবান্ধব। জাহাজগুলোতে ডুয়েল ফুয়েল ইঞ্জিন ব্যবহার করা হবে। তাই কার্বন নিঃসরণ হবে অনেক কম। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়ও কমে যাবে।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading