জ্বালানি তেল পরিবহন ও সঞ্চালন: নতুন যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ

জ্বালানি তেল পরিবহন ও সঞ্চালন: নতুন যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ

কিফায়েত সুস্মিত । রবিবার, ২৩ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১৫:৩০

চলতি বছরের মধ্যেই সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আমদানিকৃত পেট্রোলিয়াম তেল জাহাজ থেকে স্টোরেজ হাউজে আনলোড করার নতুন যুগে প্রবেশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এসপিএম দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাকে আরও সাশ্রয়ী, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করে তুলবে। প্রকল্প কর্মকর্তা মনজেদ আলী শান্ত গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এসপিএম প্রকল্পটি চলতি বছরের মধ্যে চালু করা হবে ইতিমধ্যেই এর ৯৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে প্রকল্পটির পৃথক পরীক্ষা চালানো হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতেই (২ জুলাই) পরীক্ষামূলকভাবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ শুরু হয়েছে কক্সবাজারের মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্পে (এসপিএম)। গভীর সাগরে অবস্থান করা সৌদি ট্যাংকার জাহাজ ‘এমটি হোরে’ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল খালাস করা হয়। পরে পাইপলাইনের মাধ্যমে এখান থেকে অপরিশোধিত তেল চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে যায়। এপর্যন্ত বাংলাদেশ আসা সর্ববৃহৎ ক্রুড অয়েলবাহী ট্যাংকার জাহাজ এটি। এসপিএমের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর মধ্যে দিয়ে আমদানি করা জ্বালানি তেল পরিবহন ও সঞ্চালনে নতুন প্রযুক্তিতে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। প্রায় ৮ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্পে (এসপিএম) পরীক্ষামূলকভাবে সাগর থেকে জ্বালানি তেল খালাসের এই কার্যক্রম সফল হলে আগামী আগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটির উদ্বোধন করবেন। বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. শরীফ হাসনাত।

এসপিএম প্রকল্পে কমবে পরিবহন খরচ, বাড়বে ধারণ ক্ষমতা: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, বর্তমানে দেশের তেল মজুদের সক্ষমতা রয়েছে সোয়া দুই মাসের। এসমপিএম প্রকল্প চালুর মধ্য দিয়ে আরো ১৫ দিনের সক্ষমতা বেড়ে আড়াই মাসে উন্নীত হবে। অন্যদিকে ১১ দিনের পরিবর্তে মাত্র ৪৮ থেকে ৭২ ঘন্টায় তেল খালাস করা হলে বছরে সরকারের বাঁচবে ৮০০ কোটি টাকা। জ্বালানি বিভাগের তথ্য বলছে, দেশের একমাত্র রাষ্ট্রয়াত্ত প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করতে পারে। এসপিএম প্রকল্প প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় ইউনিট। এটি চালু হলে পরিশোধন ক্ষমতা ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। এসপিএম প্রকল্পের সাইটে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করার সময় প্রকল্প কর্মকর্তা মনজেদ আলী শান্ত বলেন, আমদানিকৃত পেট্রোলিয়াম তেল অফলোড করতে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগবে যা আগে প্রচলিত পদ্ধতিতে ১১ থেকে ১২ দিন প্রয়োজন হতো। তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর বহির্নোঙরে থাকা মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে জ্বালানি বহনের জন্য কোনো লাইটারেজের প্রয়োজন হবে না। শান্ত বলেন, কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় ৮৩৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ ও চীনের জিটুজি প্রকল্পের আওতায় ৯০ একরেরও বেশি জমিতে এসপিএম নির্মিত হয়েছে। তিনি বলেন, একবার এসপিএম চালু হয়ে গেলে বহির্নোঙর থেকে জ্বালানি ট্যাংকে পেট্রোলিয়াম পণ্যের বহন খরচ কমবে। প্রক্রিয়াটির সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, প্রক্রিয়াটিতে ১.৮০ লাখ কিলোলিটার অপরিশোধিত তেল ধারণ-ক্ষমতার তিনটি এবং ১.০৮ লাখ কিলোলিটার পরিশোধিত তেল ধারণ-ক্ষমতার তিনটি ট্যাংক ব্যবহার করা হবে।

ক্রুড অয়েল আনলোডিংয়ে যেভাবে কাজ করবে এসপিএম: জ্বালানি বিভাগের তথ্যমতে, মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়া ইউনিয়নে উপকূল থেকে ছয় কিলোমিটার পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) স্থাপন করা হয়েছে। এসপিএম থেকে ৩৬ ইঞ্চি ব্যসের দুটি আলাদা পাইপলাইনের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল ও ডিজেল আনলোডিং করা হবে। ১৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সেই পাইপলাইন প্রথমে নিয়ে আসা হবে কালারমারছড়ায় সিএসটিএফ বা পাম্প স্টেশন অ্যান্ড ট্যাংক ফার্মে। সেখান থেকে বিভিন্ন পাম্পের মাধ্যমে ৭৪ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল চলে যাবে আনোয়ারার সমুদ্র উপকূলে। সেখান থেকে আবার ৩৬ কিলোমিটার পাইপলাইন পাড়ি দিয়ে তেল নিয়ে যাওয়া হবে পতেঙ্গায় ইআরএলের রিফাইনারিতে। এসব পাইপলাইনের ২০ হাজার টন ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। এসপিএম থেকে মহেশখালীতে এসে যেখানে পাম্প হবে, সেখানে দুই লাখ টন ধারণ ক্ষমতার একটি স্টোরেজ নির্মাণ হয়েছে। এরমধ্যে অপরিশোধিত তেল থাকবে ১ লাখ ২৫ হাজার টন। বাকি ৭৫ হাজার টন থাকবে ডিজেল। বিপিসি বর্তমানে বড় মাদার ভেসেল থেকে তার উপকূলীয় ট্যাংকগুলোতে পেট্রোলিয়াম বহনের জন্য প্রধানত বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের মালিকানাধীন লাইটারেজ বা ছোট জাহাজকে টন প্রতি ৫.৫০ মার্কিন ডলার প্রদান করে থাকে। এসপিএম প্রকল্পটি বিপিসির এ খরচ বাঁচাবে।

পাইপলাইন স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ, আগস্টে উদ্বোধনের আশা: কর্মকর্তারা জানান, ইতিমধ্যে স্থল থেকে গভীর সমুদ্র পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে যাতে সরাসরি আমদানি করা পেট্রোলিয়াম তেল এসপিএম-এ আনলোড করা যায়। শান্ত বলেন, বর্তমান অবকাঠামো ব্যবহার করে লাইটারেজ অপারেশনের মাধ্যমে পেট্রোলিয়াম তেল অফলোড করা অসম্ভব এবং প্রক্রিয়াটি খুব সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এসপিএম প্রতি বছর ৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন তেল আনলোড করার ক্ষমতা রাখে। অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের জন্য এসপিএম প্রকল্প থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইএফএল) পর্যন্ত একটি ১২০ কিলোমিটার পাইপলাইনও তৈরি করা হয়েছে। এসপিএম-এর ৪৫,০০০ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণের ক্ষমতা রয়েছে। প্রকল্পের কাজের অংশ হিসাবে ইতিমধ্যে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার (কিমি) অফশোর পাইপলাইন এবং ৫৮ কিমি অনশোর পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে। এসপিএম প্রকল্পটির কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ইতিমধ্যে ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। ছয়টির মধ্যে প্রতিটি ৬০,০০০ কিলোলিটার ধারণ-ক্ষমতা-সম্পন্ন তিনটি ট্যাংক অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণ করবে এবং বাকি প্রতিটি ৩৬,০০০ কিলোলিটার ধারণ-ক্ষমতা-সম্পন্ন তিনটি ট্যাংক ডিজেল সংরক্ষণ করবে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী আগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটির উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading