নতুন পিএসসি-সার্ভে: সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের পালে হাওয়া

নতুন পিএসসি-সার্ভে: সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের পালে হাওয়া

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ০৭ আগস্ট ২০২৩ । আপডেট ১৪:৩০

দীর্ঘ দিন পর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের পালে হাওয়া লেগেছে; নতুন উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিএসসি) চূড়ান্তের কাজ যেমন চলছে, তেমনি জলভাগে একটি জরিপের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে- যা বাংলাদেশে এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলেছে সুপরিচিত তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী এক কোম্পানিসহ আরও বেশ কয়েকটিকে। এমন প্রেক্ষাপটে বছর কয়েক আগেও লোকসানের কথা বলে চুক্তির পরও সাগরে গ্যাস খোঁজার কাজ ছেড়ে যাওয়ার সেই পরিস্থিতি এবার বদলানোর আশা দেখছেন সরকারের নীতি নির্ধারকদের পাশাপাশি জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

পিএসসি সংশোধনের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে ‘মাল্টিক্লায়েন্ট টুডি সার্ভের’ চলমান কাজের পর সাগরে তেল-গ্যাস থাকার সম্ভাবনার বিষয়ে বাস্তবিক তথ্য হাতে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তা আগ্রহী করে তুলেছে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানিকে। এর আগে এতদিন সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে সরকারের আগ্রহ থাকলেও কোনো জরিপের তথ্য না থাকায় বাংলাদেশের আহ্বানে সেভাবে সাড়া দেয়নি আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো (আইওসি)। এবার নরওয়ে ও আমেরিকার যৌথ ভেঞ্চার টিজিএস-ব্লামবার্জার (এসএলবি) এর সার্ভের কাজ তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমকে গতিশীল করবে বলে মনে করছেন জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা।

পিএসসি মডেলের নীতিগত অনুমোদন

এক দশক আগে সমুদ্রসীমা নিয়ে ঐতিহাসিক বিজয়ের পরও এখন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজে অগ্রগতি হয়নি; ধুঁকতে থাকা জ্বালানি খাতে সুসংবাদ আসেনি। সবশেষ ২০১২ সালের পিএসসির মাধ্যমে কাজ করার সব আয়োজন এগিয়ে নিয়েও চারটি বিদেশি কোম্পানির মধ্যে তিনটি পরে ছেড়ে গেছে। এতে করে দেড় দশক ধরে বলার মতো কোনো অগ্রগতিই হয়নি। চুক্তির পর রয়ে যাওয়া একমাত্র কোম্পানিটি অগভীর সমুদ্রের দুটি বøকে কাজ শুরু করতেও সময় নিয়েছে অনেক বেশি। চলমান কাজের অগ্রগতিতেও গতি কম। এরমধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে দেশ জ্বালানি সংকটে ভোগার মধ্যেও গত ১১ বছরে নতুন কোনো দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।

২০১৯ সালে আরেকটি ‘মডেল পিএসসি’ তৈরি করা হলেও তা লাভজনক না হওয়ার শঙ্কা এবং কোভিডসহ নানা কারণ আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজে আগ্রহী করে তুলতে পারেনি।এতদিনের সেই জট এবার খুলতে শুরু করেছে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে পিএসসির পুরোনো শর্তগুলো সংস্কারের ফলে। আগের চেয়ে গ্যাসের দাম এবং ভাগাভাগির হিস্যা বাড়ানোর উদ্যোগ বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে অনাগ্রহীদের আগ্রহী করে তুলছে। প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে কাজ করা গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেনজির পরামর্শ অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে নতুন এ পিএসসি। পেট্রোবাংলার বিশেষজ্ঞদের প্রণয়ন করা ওই মডেলে সরকারের নীতিগত সায়ও মিলেছে, যা এখন চূড়ান্ত হওয়ায় প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

আমেরিকান কোম্পানি এক্সন মবিলের প্রস্তাব পাওয়ার আশা

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ নতুন পিএসসির আলোকে গ্যাস অনুসন্ধানে নভেম্বর নাগাদ দরপত্র ডাকার বিষয়ে আশাবাদী। পিএসসি চূড়ান্তের পাশাপাশি দরপত্রের আগেই সমুদ্রে টুডি সার্ভের পূর্ণাঙ্গ তথ্য হাতে পাওয়ার কথা বলেছেন তিনি। তিনি বলেন, সার্ভের সব তথ্য হাতে পাওয়ার আগে যদি বিডিং দেওয়া হয় তাহলে সমস্যা হবে। পূর্ণাঙ্গ তথ্য হাতে পেয়ে বিডিংয়ে যাওয়া বেটার। সমুদ্রে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানে সুপরিচিত নাম আমেরিকার কোম্পানি এক্সন মবিলের প্রস্তাব পাওয়া এবং এ নিয়ে আলোচনার কথাও জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, এক্সন মবিলের অফারটা বিবেচনার মধ্যে আছে। আমরা একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে তাদের প্রস্তাবগুলো বিশ্লেষণ করব। তারপর তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এবার মনে হচ্ছে এক্সন মবিল বেশ সিরিয়াসলি এগিয়ে আসছে।

এক্সন মবিল

গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিন ধরে তাগাদা দিয়ে আসছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের অন্যতম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ‚তত্ত¡ বিভাগের অনারারি অধ্যাপক বদরুল ইমাম মনে করছেন, নতুন মডেল পিএসসি দীর্ঘদিন ধরে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে অনাগ্রহী বিদেশি কোম্পানিগুলোকে এবার আগ্রহী করে তুলছে। বিশেষ করে এক্সন মবিলের এগিয়ে আসার তথ্য তুলে ধরে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এ কোম্পানির দক্ষতাকে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজে যুক্ত করা গেলে তা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে।

শিগগির আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হবে: জ্বালানি সচিব

সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানির সাড়া মিলছে জানিয়ে শিগগির দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরুর কথা বলেছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার।শনিবার ঢাকায় এফবিসিসিআই আয়োজিত ‘বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার: বঙ্গবন্ধুর দর্শন’ শীর্ষক সেমিনারে এ কথা বলেন তিনি। চাহিদার তুলনায় দেশে অভ্যন্তরীণ গ্যাসের মজুদ কম হওয়ায় সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি গ্যাসের অস্তিত্ব থাকলেও খুঁজে দেখা হয়নি এমন ক্ষেত্র বের করতে সরকারের নেওয়া পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি। সচিব বলেন, ‘অফশোর ক্ষেত্রের গ্যাস আহরণে আন্তর্জাতিক কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চলছে। কয়েকটি কোম্পানি ইতিবাচক সাড়াও দিয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে আমরা বিডিং রাউন্ডে যাব।

দেশে জ্বালানি সংকটের মধ্যে দীর্ঘদিন থেকে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়ার তাগাদা দিয়ে আসছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা। গ্যাস উত্তোলনে আগের উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিএসসি) আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে (আইওসি) আগ্রহী করে তুলতে পারেনি। কয়েকটি কোম্পানি এ কাজের জন্য চুক্তি করেও চলে গেছে।এমন প্রেক্ষাপটে জুলাইয়ের শেষ দিকে আগের শর্ত সংস্কার করে নতুন মডেল পিএসসি অনুমোদন করা হয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে।

জ্বালানি সচিব জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পরিকল্পনার তথ্য তুলে ধরে বলেন, দেশে এখন পর্যন্ত ১৩২টি ক‚প খনন করা হয়েছে। এরপরও বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ায় যে গ্যাস প্রয়োজন, সেটি দিতে পারছি না। স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ক‚প খননের পূর্বে টুডি ও থ্রিডি সার্ভে করতে হয়। এখন পর্যন্ত ৩৩ হাজার লাইন কিলোমিটার টুডি ও থ্রিডি জরিপ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৪৬টি ক‚প খননের পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়েছে।

ইউডি/আবা/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading