রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: ইউরোপ-আমেরিকার রমরমা অস্ত্র বাণিজ্য
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২০ আগস্ট ২০২৩ । আপডেট ১৫:০০
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউরোপে বেড়েছে অস্ত্র কেনাবেচার হার। বিশেষ করে গত পাঁচ বছরে অস্ত্রের বাণিজ্য কয়েক গুণ বেড়েছে ইউরোপে। বিশ্বজুড়ে অস্ত্র বেচাকেনার পেছনে রয়েছে জটিল ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমীকরণ। রয়েছে মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচিত বিশ্বের প্রভাবশালী অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি মদত। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। সুইডেনভিত্তিক স্টকহোম ইন্টারন্যশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি) গত পাঁচ বছরের অস্ত্র ব্যবসা নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, গত পাঁচ বছরে বিশ্বে অস্ত্র ব্যবসা ৪ দশমিক ৬ শতাংশ কমলেও ইউরোপে ব্যবসা বেড়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ। ইউরোপে অস্ত্র ব্যবসা বাড়তে শুরু করে ২০১৪ সাল থেকে। ওই বছর ইউক্রেনে হামলা চালিয়ে ক্রিমিয়া দখল করে নেয় রাশিয়া। মূলত এ ঘটনাই বাড়িয়ে তোলে ইউরোপের নিরাপত্তা উদ্বেগ। এর পরপরই ইউরোপের একাধিক দেশ সামরিক খাতের বাজেট বাড়িয়ে দেয়। ইউরোপের অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে তাই অনেকটাই জড়িয়ে রাশিয়া। গত কয়েক বছরে ইউরোপে রাশিয়ার আগ্রাসন যত বেড়েছে, অস্ত্রখাতে ব্যয়ও বেড়েছে সমানুপাতিক হারে।
রাশিয়াভীতির পূর্ণ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে আমেরিকা: ইউরোপের রাশিয়াভীতির পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে আমেরিকা। বিশেষ করে ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার নিরাপত্তা চুক্তি রয়েছে। সিপরির রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক অবনতি হওয়ার পর থেকেই আমেরিকা এ অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি করেছে। সুইডেনের প্রতিষ্ঠানটির মতে, রাশিয়া ইউক্রেন সংঘাতের পূর্ণ সুবিধা নিচ্ছে মার্কিন অস্ত্র কোম্পানিগুলো। এশিয়া-আফ্রিকাসহ বিশ্বের সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলগুলোর থেকেও বেশি অস্ত্রের গন্তব্য এখন ইউরোপ। একটি বিষয় আমরা সকলেই জানি যে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র রফতানিকারক দেশ আমেরিকা। অস্ত্র বিক্রির পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ওবামা প্রশাসনের ধারাবাহিকতায় অস্ত্র রফতানিকে আরও গতিশীল করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অস্ত্র রফতানিতে তাদের চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো আপাতত কেউ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই মার্কিন অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। আবার মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার অস্ত্রের সবচেয়ে বড় গ্রাহক সৌদি আরব। পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপেও বেড়েছে আমেরিকার অস্ত্র রফতানি। বিশ্বে ১০০টি শীর্ষ অস্ত্র কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে ৪০টি রয়েছে আমেরিকাতে। মূলত অস্ত্র ব্যবসার অর্ধেকের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে দেশটি। বর্তমানে গোটা বিশ্বের অস্ত্র ব্যবসার মোট মূল্য ৫৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর শেয়ার রয়েছে ২৯৯ বিলিয়ন ডলার।
সামরিক খাতে বছরে ব্যয় ২ ট্রিলিয়ন ডলার: গত বছর বিশ্বের সামগ্রিক সামরিক বাজেট ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন বা ২ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত হয়। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ইউরোপে—১৩ শতাংশ। রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশগুলোয় এই বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি—ফিনল্যান্ডের বেড়েছে ৩৬ শতাংশ, লিথুয়ানিয়ার ২৭ শতাংশ, সুইডেনের ১২ শতাংশ ও পোল্যান্ডের ১১ শতাংশ। ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানিও কয়েক দশকের সামরিক কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে গা ঝাড়া দিয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জার্মান সরকার সামরিক বাজেট জিডিপির ১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ২ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দেয় এবং সামরিক বাহিনীর জন্য ১১০ বিলিয়ন বা ১১ হাজার কোটি ডলারের বিশেষ তহবিল ঘোষণা করে। এ বাস্তবতায় ইউরোপের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারীরা বড় বড় ব্যবসা পাচ্ছে। গত এপ্রিল মাসে ইউরোপের মিসাইল নির্মাণকারী কোম্পানি এমবিডিএর ব্রিটিশ শাখা পোল্যান্ডের কাছ থেকে ২৪০ কোটি ডলারের কার্যাদেশ পেয়েছে। তারা পোল্যান্ডকে আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করবে। গত জুন মাসে ফরাসি অস্ত্র কোম্পানি সাফরান গ্রিক আর্মির কাছে বেশ কয়েকটি কৌশলী ড্রোন বিক্রি করেছে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ে ব্রিটেনও পিছিয়ে নেই।
অস্ত্র ব্যবসার বড় উত্থান ঘটেছে চীনেও: চীনে অস্ত্র ব্যবসার বড় উত্থান ঘটেছে। চীনের শীর্ষ ৮টি অস্ত্র কোম্পানির মোট অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ ১০৯ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। দক্ষিণ কোরিয়াতেও বেড়েছে অস্ত্র বিক্রি। এসআইপিআরআইয়ের ১০০টি শীর্ষ কোম্পানির তালিকায় স্থান পেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার চারটি কোম্পানি। এই চারটি কোম্পানি সম্মিলিতভাবে গত বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি অস্ত্র বিক্রি করেছে। তাদের মোট অস্ত্র বিক্রি পরিমাণ ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এ বছরের শুরুর দিকে পোল্যান্ডের সঙ্গে বড় ধরনের অস্ত্র চুক্তি করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। এর ফলে আগামী বছরগুলোতে দক্ষিণ কোরিয়ার অস্ত্র বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ফ্রান্সের ডেজাল্ট অ্যাভিয়েশন গ্রুপের অস্ত্র বিক্রিও ২০২১ সালে ৫৯ শতাংশ বেড়ে ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। খবর অনুযায়ী- ১০০টি শীর্ষ অস্ত্র কোম্পানির মধ্যে ইউরোপের ২৭টি কোম্পানি রয়েছে।
শীর্ষ অস্ত্র আমদানিকারক সৌদি আরব ও ইন্ডিয়া: ইন্ডিয়া, সৌদি আরব, মিশর, অস্ট্রেলিয়া, চীন, কাতার, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান, জাপান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের শীর্ষ দশ অস্ত্র আমদানিকারক। এই দেশগুলো বিশ্বের ৫৫ শতাংশ অস্ত্র আমদানি করে থাকে। বিশ্বের বাকি সব কটি দেশ মিলে কেনে বাকি ৪৫ শতাংশ অস্ত্র। ২০১৭ থেকে ২০২১–এই পাঁচ বছরে অস্ত্র আমদানির দিক থেকে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে যৌথভাবে প্রথম স্থান সৌদি আরব ও ভারতের। দুটি দেশ আমদানি করেছে বিশ্বের মোট অস্ত্রের ১১ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মিশর ৫ দশমিক ৭ শতাংশ ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা অস্ট্রেলিয়া ৫ দশমিক ৪ শতাংশ অস্ত্র আমদানি করেছে। উল্লেখ্য, যুদ্ধের কারণে রাশিয়া নিজেদের অস্ত্র উৎপাদন বাড়িয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধ-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার কারণে বাইরের দেশগুলোতে অস্ত্রের কাঁচামাল সরবরাহ করছে না রাশিয়া। এই সবকিছু মিলিয়ে অস্ত্র উৎপাদন কমেছে। তবে অস্ত্র উৎপাদন কমলেও বেড়েছে অস্ত্র বিক্রি।
ইউডি/কেএস

