গোপন নথি ফাঁস, আক্রমণের লক্ষ্য ন্যাটোভুক্ত দেশ: রাশিয়া কী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধাবে

গোপন নথি ফাঁস, আক্রমণের লক্ষ্য ন্যাটোভুক্ত দেশ: রাশিয়া কী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধাবে

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৪:৫০

জার্মানি আশঙ্কা করছে- ন্যাটোভুক্ত কয়েকটি দেশ আক্রমণ করতে পারে রামিয়া। পলে বাধবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ফাঁস হওয়া গোপন নথিতে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। এ নিয়ে আরেফিন বাঁধনের প্রতিবদেন

বৈশ্বিক অস্থিরতা, উত্তেজনা: বিশ্বে একদিকে চলছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, অন্যদিকে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। সেইসঙ্গে সম্প্রতি হুতিদের টার্গেট করে আমেরিকা-ব্রিটেনের হামলা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কাও জাগাচ্ছে। এমনই এক সময়ে নতুন এক নথি ফাঁস করেছে বিখ্যাত জার্মান পত্রিকা বিল্ড। নথির বরাতে বলা হচ্ছে জামার্নির শঙ্কা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করতে পারে রাশিয়া। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘাতের প্রস্তুতিও নিচ্ছে ইউরোপের দেশটি। মঙ্গলবার (১৬ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে ইন্ডিয়ান সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। রাশিয়ার ইউক্রেনে হামলা শুরুর পর থেকেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ-এও দামামা বাজছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তখন আমেরিকা বারংবার বলেছে রাশিয়া যদি ন্যাটো কিংবা আমেরিকাকে সরাসরি আক্রমণ করে তবেই তা হবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। রাশিয়াও এই ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করেছিল। এরইমধ্যে হামাস-ইসরায়েল সংঘাত এবং আমেরিকা-ব্রিটেনের ইয়েমেনে হুতিদের ওপর হামলা গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার বার্তাও দিচ্ছে। এমন সময়ে জার্মানির এই নথি উত্তেজনা বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকগণ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রবলভাবে প্রভাব পড়েছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার মতো কোনো বাস্তবতা এখনও সৃষ্টি হয়নি। ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্ররা নানা ধরনের অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। ফলে দেশটির পুঁজিবাজার নিম্নগামী এবং ব্যাংকগুলোয় তারল্যের সংকট চরমে পৌঁছেছে। অনেক বড় বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী রাশিয়ায় তাদের বিনিয়োগ তুলে নিয়েছে । ২০১৪ সালে ইউক্রেনের অপর অংশ ক্রিমিয়া সংযুক্ত করার পর রাশিয়ার অর্থনীতি অনেকটাই স্থবির। তারপর নতুন করে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা, বাণিজ্যিকভাবে একঘরে হয়ে পড়া অর্থনীতি রাশিয়ার জনগণের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউরোপের অনেক দেশও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ই কী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ: রুশ প্রেসিডেন্টের সাবেক মুখপাত্র এবং মস্কোর ইনস্টিটিউট অব পলিটিক্যাল স্টাডিজের পরিচালক সের্গেই মারকভ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইউক্রেনে এখন যে যুদ্ধ চলছে, সেটি মূলত রাশিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটোর যুদ্ধ। তার মতে, ইউক্রেনের এই ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ই কার্যত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেমের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ ইফতেখার আহমেদ অবশ্য ইউক্রেন যুদ্ধকে এখনই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বলতে রাজি নন। তবে এমন আশঙ্কার বিষয়টিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তিনি। ইফতেখার আহমেদ বলেন, এটি হয়তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নয়। কিন্তু এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে যে মেরুকরণ দেখতে পাচ্ছি, তাতে আমেরিকা থেকে শুরু করে ইউরোপের অনেক দেশই কিন্তু পরোক্ষভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। রাশিয়ার অনেক নীতিনির্ধারকও মনে করেন, তারা এখন পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে লড়ছেন। এর ফলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটা হুমকি যে তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

ভ্লাদিমির পুতিন

সংঘর্ষ বাড়বে সেপ্টেম্বর!: বিল্ড দাবি করেছে, রাশিয়া আগামী বছর সামরিক জোট ন্যাটোর মিত্র দেশগুলোতে আক্রমণের মাধ্যমে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ আরও প্রসারিত করতে পারে। আর এটিকেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাব্য শুরু বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বিল্ড’র প্রতিবেদনের বরাতে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা বলছে, বিল্ড এই তথ্য জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গোপন নথি থেকে পেয়েছে বলে জানিয়েছে। গোপন এই নথি অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বরে সংঘর্ষ বাড়বে এবং এটিই রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে ও বেলারুশে প্রায় ৫০ হাজার রুশ সৈন্যকে নিয়ে বড় আকারের সামরিক মহড়া শুরু করতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে প্ররোচিত করবে। রাশিয়া তখন কালিনিনগ্রাদে সৈন্য এবং মধ্য-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পাঠাতে পারে। এটি মূলত পোল্যান্ড এবং লিথুয়ানিয়ার মতো ন্যাটোভুক্ত দেশের মধ্যে অবস্থিত একটি রাশিয়ান অঞ্চল, নথিতে বলা হয়েছে। জার্মান এই পত্রিকার প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান সংঘাত দুই বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে চলেছে। প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ইউরোপের সশস্ত্র বাহিনী ন্যাটোর পূর্ব দিকে রাশিয়ার আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর এর মধ্যে সাইবার আক্রমণও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

প্রস্তুতি নিচ্ছে হাজারো জার্মান সেনা:সূত্রের বরাত দিয়ে বিল্ড বলেছে, এই পরিস্থিতিতে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত বৃদ্ধি পেতে শুরু করবে এবং কয়েক হাজার জার্মান সৈন্যকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হবে। জার্মান এই গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমা দেশগুলোর তহবিল হ্রাস পাওয়ায় রুশ বাহিনী ‘বসন্তে’ ইউক্রেনের সেনাদের ওপর হামলা করবে। এরপর ধাপে ধাপে, মাসে মাসে, কীভাবে রুশ বাহিনী এগিয়ে যাবে এবং ন্যাটো তার মিত্রদের রক্ষা করবে সেটিও এতে বর্ণনা করা হয়েছে।ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে নিরাপত্তা নিয়ে আরও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্য দেশগুলো, বিশেষ করে জার্মানি। এরপরও এদের একতৃতীয়াংশ দেশও তাদের জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার শর্ত পূরণ করছে না। ন্যাটোর প্রধান পশ্চিমা দেশগুলো এক বছরেরও আগে মাদ্রিদ সম্মেলনে পূর্ব সীমানায় ব্রিগেড সাইজের ইউনিট মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। আসন্ন সংঘাত ও কঠিন সময়কে কেন্দ্র করে পশ্চিমা দেশগুলোর সরকার ও নাগরিকদের তাদের প্রয়োজন ও চাহিদাকে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। এখানে যে যে উপায়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এর কোনোটাই সহজ নয়। তবে, আমেরিকা ও এর মিত্রদেশগুলো এক কঠিন সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন ও ইসরায়েলে এখন যা হচ্ছে, কয়েক বছর আগেও তা কল্পনার বাইরে ছিল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, বড় সুযোগ: বিল্ড আরও বলেছে, ডিসেম্বরের মধ্যে নিজেদের প্রোপাগান্ডা এবং আরও সহিংসতাকে ইন্ধন দিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে রাশিয়া। নথিতে বলা হয়েছে, বিপুলসংখ্যক রুশ সৈন্য মোতায়েন এবং রাশিয়ান ও পশ্চিমা সৈন্যদের মধ্যে যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে ২০২৫ সালের মে মাস নাগাদ ‘বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা’ গ্রহণ করবে ন্যাটো।

ভুয়া বলে উড়িয়ে রাশিয়া যা বলছে: রাশিয়ার কর্মকর্তারা বিল্ডের এই প্রতিবেদনকে ‘ভুয়া’ বলে আখ্যায়িত করে কোনও ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি। রাশিয়ার বার্তা সংস্থা তাস ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভকে এই প্রতিবেদনটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিল। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি। তবে পেসকভ বলেছেন, স¤প্রতি, এই সংবাদপত্রটি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ভুয়া খবর এবং হাস্যোদ্দীপক গুজব (ক্যানার্ড) প্রকাশের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা প্রতিবেদনটিকে ‘গত বছরের রাশিফল’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

ভোলোদিমির জেলেনস্কি

ইউক্রেনের পাল্টাহামলা চাপের মুখে রাশিয়া?: নিজস্ব ভূখণ্ডে আকাশপথে রাশিয়ার লাগাতার হামলার জবাব হিসেবে ইউক্রেনও পাল্টাহামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ইউক্রেন সাধারণত এমন বিচ্ছিন্ন ড্রোন হামলার দায় স্বীকার না করায় এবং রাশিয়া বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করায় প্রায়ই প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি স্পষ্ট হচ্ছে না। এবার রাশিয়ার দক্ষিণে ভোরোনেঝ শহরে ড্রোন হামলার ফলে শহরের মেয়র জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। সেই হামলায় কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একটি শিশু আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। আগুনের কারণে একটি আবাসন ভবন থেকে বাসিন্দাদের উদ্ধার করা হয়েছে। গত সোমবার রাতে ইউক্রেন সীমান্তের কাছে ভোরোনেঝ অঞ্চলে পাঁচটি ড্রোন ধ্বংস এবং তিনটি থামানো সম্ভব হয়েছে বলে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করছে। সেই সঙ্গে বেলগোরোদ অঞ্চলেও চারটি ড্রোন হামলা বানচাল করা হয়েছে। ইউক্রেনের ওপর হামলা চালাতে সেখান থেকে সুখোই এসইউ-৩৪ যুদ্ধবিমান পাঠানো হয়। সোমবার রাতে সেই এলাকায় কমপক্ষে ১৫টি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে কিছু রুশ সূত্র টেলিগ্রাম চ্যানেলে দাবি করছে। এ ছাড়া গত কয়েক দিনে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী বেশ ক্ষয়ক্ষতির মুখ দেখেছে। আজোভ সাগরের ওপর দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমান্ড বিমান ধ্বংস হওয়ার ঘটনা নিয়ে অবশ্য বিভ্রান্তি এখনো কাটছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৩০ কোটি ডলার মূল্যের রাডারযুক্ত এ-৫০ বিমান এবং আইআই-২২ কমান্ড বিমান হারানো রুশ বিমানবাহিনীর জন্য মারাত্মক ঘটনা। ইউক্রেন সেই সাফল্য দাবি করলেও প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে সংশয় থেকে যাচ্ছে। র‍্যান্ড করপোরেশনের বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম কার্টনি গণমাধ্যমকে বলেন, রাশিয়ার হাতে সম্ভবত ছয়টি এ-৫০ বিমান ছিল। বিশেষ করে ইউক্রেন মার্কিন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করলে সেই বিমানের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে রাশিয়াকে এ-৫০-এর ওপর নির্ভর করতে হবে। আইআই-২২ কমান্ড বিমানও সে ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করবে।
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কি তার সুইজারল্যান্ড সফরে সুইস সরকারের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। দুই দেশ যৌথভাবে ইউক্রেন শান্তি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সম্মেলনের দিনক্ষণ এখনো স্থির হয়নি। জেলেনস্কি সেখানে রাশিয়ার উপস্থিতির কোনো কারণ দেখছেন না। মঙ্গলবার তিনি ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে প্রথমবার সশরীরে ‘কিনোট’ ভাষণ দিয়েছেন। গত কয়েক বছরে তিনি ভিডিও লিংকের মাধ্যমে সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছিলেন। পশ্চিমাবিশ্ব থেকে আরো সামরিক ও অন্যান্য সহায়তা আদায় করতে তিনি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জগতের শীর্ষ নেতাদের কাছে আবেদন করবেন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।

হুঁশিয়ারি দিয়ে ব্রিটেনের বার্তা: পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সামরিক মহড়ায় ২০ হাজার সেনা পাঠাচ্ছে ব্রিটেন। দেশটির প্রতিরক্ষা সচিব গ্রান্ট শ্যাপস জানান সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েনের করা হবে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা সচিব গ্রান্ট শ্যাপস বলেন, ৩১টি দেশের মহড়ায় ২০ হাজার সেনা পাঠানো হবে। পুতিনের হুমকির বিরুদ্ধে জবাব দিতে তাদের এই উদ্যোগ। উল্লেখ্য স¤প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোকে উল্লেখ করে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে তাদের অবস্থান মাঝামাঝি। গ্রান্ট শ্যপস বলেন, আমাদের অবশ্যই আমাদের শত্রæদের প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং সেই সঙ্গে আমাদের মিত্রদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। মহড়ার অংশ হিসেবে আগামী মাসে শুরু হতে যাওয়া পূর্ব ইউরোপ জুড়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী থেকে ট্যাংক, আর্টিলারি এবং হেলিকপ্টারসহ প্রায় ১৬ হাজার সেনা মোতায়েন করা হবে। ব্রিটিশ নৌবাহিনী রয়েল নেভি আটটি যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন জুড়ে ২ হাজারের বেশি নাবিক মোতায়েন করবে। ৪০০ জনের বেশি মেরিন কমান্ডোকে আর্কটিক সার্কেলে পাঠানো হবে। ব্রিটিশ বিমান বাহিনী আরএএফ এফ-৩৫বি লাইটনিং অ্যাটাক এয়ারক্রাফট এবং পসেইডন বিমান মোতায়েন করবে।

জো বাইডেন

আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের জন্য কতটা প্রস্তুত আমেরিকা: আমেরিকা রাশিয়া একে অপরের দিকে গুলি শুরু করলে তা হবে বিশ্বযুদ্ধ। ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান যুদ্ধেও মধ্যেই গত বছর এক সাক্ষাৎকারে এই ভয়ংকর আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। আমেরিকা বেশ দীর্ঘসময় ধরেই বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর দেশের অবস্থানে রয়েছে। দুটি বিশ্বযুদ্ধেই জয়ী এ দেশ কাবু করেছে সোভিয়েত ইউনিয়নকে এবং এখনও এ দেশের সামরিক শক্তির জুড়ি নেই। ইউক্রেন, ইসরায়েল ও তাইওয়ানের আত্মরক্ষা করার মতো অস্ত্র মজুত নিশ্চিত করাই এখন আমেরিকার প্রধান দায়িত্ব। কারণ তারাই এ সংঘাতের সম্মুখ যোদ্ধা। এ দেশগুলো যদি আগ্রাসন এড়িয়ে চলার কৌশল অবলম্বন করতে পারে, তবে এ সহিংসতার পরিসর কমিয়ে আনার আশা করা যেতে পারে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুটি অঞ্চলে এরই মধ্যে যুদ্ধ চলছে। এ দুটিতেই প্রত্যক্ষভাবে আমেরিকার অংশগ্রহণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে চীন যদি তাইওয়ানে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় তবে তা শিগগিরই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেবে, যেখানে প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে যাবে আমেরিকা। ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ লড়ে যাচ্ছে আমেরিকা। রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকার এই আঁটঘাট বেঁধে নামা দেখে অনেক বিশ্লেষকেরই মনে হয়েছিল, এবারও দেশটির জয়ের ধারা অব্যাহত থাকবে। আর এরপরই আমেরিকা ফের ভারতপ্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অবস্থান মজবুত করার দিকে মন দেবে। আমেরিকাকে আর্থিক সংকটও মোকাবিলা করতে হবে। আগের সংঘাতগুলোতে আমেরিকা সহজেই প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশি ব্যয় করতে পারত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার জাতীয় ঋণ ও জিডিপির অনুপাত প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ঋণের পরিমাণ জিডিপির ৬১ শতাংশ থেকে বেড়ে হয় ১১৩ শতাংশ। কোনো সংঘাতে জড়ানোর আগে আমেরিকার মাথায় রাখতে হবে, এর ঋণ এরই মধ্যে জিডিপির ১০০ শতাংশ অতিক্রম করে ফেলেছে।
বৈশ্বিক সংঘাত অন্যান্য বিপদও ডেকে আনতে পারে। আমেরিকার দুই প্রতিদ্ব›দ্বী রাশিয়া ও ইরান প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ। স¤প্রতি এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের পরিসীমা বাড়ার কারণে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার করে বাড়তে পারে। এতে মুদ্রাস্ফীতির ওপরও চাপ পড়বে। আমেরিকার প্রধান ঋণদাতা দেশ চীন। দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ থাকলে যুক্তরাষ্ট্রেরই অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। আমেরিকায় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে ঘর–বাড়ি নির্মাণের সরঞ্জাম—সব ক্ষেত্রেই সংকট দেখা দেবে। তবে মার্কিনরা সবচেয়ে গুরুতর যে ক্ষতির মুখোমুখি হবে তা হলো, বৈশ্বিক সংঘাতে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সৈন্য নিহত হবে। আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বীগুলো পারমাণবিক ক্ষমতা সম্পন্ন। আমেরিকার মাটিতে হামলা করা তাদের জন্য অসাধ্য নয়। এ ছাড়া দেশটির পশ্চিম সীমান্তের দুর্বল অবস্থার কথা বিবেচনায় নিলে, অন্য দেশগুলোর পক্ষে সহজেই যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলা চালানো সম্ভব। ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয় বাড়াতে হবে তা নিশ্চিত। বাইডেন প্রশাসন প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের পরিবর্তে জলবায়ু নীতি বা সামাজিক খাতে ব্য়য় করে চলেছে। এ মুহূর্তে এ কৌশল কোনো সুফল এনে দেবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১৭ জানুয়ারি ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

সামরিক খাতে কতটা শক্তিশালী রাশিয়া?:বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রাশিয়া। সামরিক শক্তির বিচারে ১৪০টি দেশের মধ্যে এটি দ্বিতীয়। বিভিন্ন দেশের সামরিক শক্তি পর্যবেক্ষণকারী গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের তথ্য বলছে, রাশিয়ার সেনার সংখ্যা ৮ লাখ ৫০ হাজার। রিজার্ভ সেনা রয়েছে আরো ২ লাখ ৫০ হাজার। রাশিয়া সামরিক খাতে প্রতি বছর ব্যয় করে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। দেশটির আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজার। দেশটির সামরিক আকাশযান রয়েছে ৪ হাজার ১৭৩টি। যুদ্ধ বিমান রয়েছে ৭৭২টি। শুধু আক্রমণকারী বিমান রাশিয়ার রয়েছে ৭৩৯টি। পরিবহন বিমান রয়েছে ৪৪৫টি। হেলিকপ্টার রয়েছে ১ হাজার ৫৪৩টি। অ্যাটাক হেলিকপ্টার রয়েছে ৫৪৪টি। রাশিয়ার ট্যাংক রয়েছে ১২ হাজার ৪২০টি। আমর্ড ভেহিকেল রয়েছে ৩০ হাজার ১২২টি। স্বয়ংক্রিয় আর্টিলারি আছে ৬ হাজার ৫৭৪টি। মোবাইল রকেট প্রজেক্টর রয়েছে ৩ হাজার ৩৯১টি। রাশিয়ার নৌ সামরিক যান রয়েছে ৬০৫টি। একটি বিমানবাহী রণতরী রয়েছে দেশটির। রাশিয়ার ৭০টি সাবমেরিন রয়েছে। ডেস্ট্রয়ার রয়েছে ১৫টি। ফ্রিগেট রয়েছে ১১টি। মাইন ওয়ারফেয়ার নৌযান রয়েছে ৪৯টি। রাশিয়ার করভেট রয়েছে ৮৬টি। পেট্রোল ভেসেল রয়েছে ৫৯টি। ১ হাজার ২১৮টি বিমানবন্দর রয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজ রয়েছে ২ হাজার ৮৭৩টি। এর বাইরে রাশিয়া পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। রাশিয়ার এস-৪০০ নামের অত্যন্ত শক্তিশালী মিসাইল সিস্টেম রয়েছে; যা আকাশ প্রতিরক্ষায় খুবই কার্যকর। পারমাণবিক ইউনিটকে যুদ্ধের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এআই অস্ত্র তৈরিতে বাড়তি নজর: এ বছর রাশিয়ার অন্যতম এজেন্ডা অস্ত্র ভান্ডার আরও সমৃদ্ধ করা। সমরভান্ডার ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির। রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু জানান, এ বছর বৃদ্ধি করা হবে ড্রোন উৎপাদন। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) অস্ত্র তৈরিতেও বাড়তি নজর দেওয়া হবে। ৯ জানুয়ারি রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এসব পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
তুরস্কের সংবাদ মাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমাদের তোয়াক্কা না করেই প্রায় দুই বছর ধরে ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযান চালাচ্ছে রাশিয়া। বর্তমানে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও আমেরিকাসহ মিত্রদের ব্যাপক সামরিক সহায়তা পাওয়া ইউক্রেনকে মোকাবেলায় মস্কোর ক্ষয়ক্ষতিও কম হয়নি। ফিনল্যান্ডকে সদস্যপদ দিয়ে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী আরও একটি দেশে নিজেদের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করেছে আমেরিকা নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটো। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বছর নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোকে লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছে রাশিয়া। গত বছর পশ্চিমাদের সাথে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে হওয়া একাধিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছে রাশিয়া। যার ফলে বেড়েছে ভয়ঙ্কর এই অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি। এমন পরিস্থিতিতে, পারমাণবিক অস্ত্র চালানোয় পারদর্শী বিশেষ বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুত রাখাকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছে মস্কো। ২০২৩ সালে রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেন তাদের সামরিক বাহিনীর ২ লাখ ১৫ হাজার সদস্য হারিয়েছে বলেও দাবি রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর। এসময় ধ্বংস হয়েছে কিয়েভের অন্তত ২৮ হাজার সমরাস্ত্র। তবে নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তিনি দেয়নি মস্কো।

ইউডি/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading