বাবরি মসজিদ থেকে রাম মন্দির: ইন্ডিয়ায় ‘উগ্র হিন্দুত্ববাদ’র জয়জয়কার
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৩:০০
সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে আইকন ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধন করেছেন। এ নিয়ে সিরাজুল ইসলাম’র প্রতিবেদন
বিতর্কিত মন্দির উদ্বোধন করলেন নরেন্দ্র মোদী: ইন্ডিয়ার উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় সোমবার (২২ জানুয়ারি) রামমন্দির উদ্বোধন করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এরপর এদিন দুপুর ১২টা ২৯ মিনিট ৮ সেকেন্ড থেকে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট ৩২ সেকেন্ডের মধ্যে গুনে গুনে ঠিক ৮৪ সেকেন্ড; এই সময়ের মধ্যেই বিগ্রহের ‘প্রাণপ্রতিষ্ঠা’ করেন তিনি। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী একে বলে ‘অভিজিৎ মুহূর্ত’। এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে হিন্দু শাস্ত্রে। হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী, ভগবান রাম এই মুহূর্তে পৃথিবীতে আবিভর্‚ত হয়েছিলেন। সারা দিনে দু’বার ‘অভিজিৎ মুহূর্ত’ আসে। শ্রীকৃষ্ণেরও জন্ম হয়েছিল মধ্যরাতের ‘অভিজিৎ মুহূর্তে’। জ্যোতিষশাস্ত্র বলে, সারা দিনে ৩০টি মুহূর্ত রয়েছে। তার মধ্যে ‘অভিজিৎ মুহূর্ত’ অষ্টম। রামমন্দির উদ্বোধনের পর রামলালার ‘প্রাণ প্রতিষ্ঠার’ জন্য এই ৮৪ সেকেন্ড নির্ধারিত করা হয়েছিল। সেই নির্ঘণ্ট মেনে এদিন বেলা ১২ টা ৫ মিনিট থেকে চ‚ড়ান্ত অনুষ্ঠান শুরু হয়। পুরো অনুষ্ঠানটি টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, বহু শতাব্দী ধরে অপেক্ষার পরে ভগবান রাম আবার আমাদের মাঝে এসেছেন। রামলালা আর অস্থায়ী গৃহে নয়, এবার দিব্য মন্দিরে থাকবেন। রামমন্দির উদ্বোধনের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আটাওয়ালে বলেছেন, এটি একটি আনন্দের দিন। সারা বিশ্বের মানুষ প্রাণ প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। এই অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিক রঙে রাঙাতে নারাজ তিনি।কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুপ্রিয়া প্যাটেল উপস্থিত ছিলেন এদিন অযোধ্যাতে। তিনি বলেছেন, কোনও দেশ নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে রক্ষা না করে উন্নতি করতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বে আমাদের সরকার আমাদের সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে এবং আমাদের ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করার জন্য ক্রমাগত অনুপ্রাণিত করছে। অন্যদিকে, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়া বলেছেন, আজ মোদীর পুজো দেওয়ার ঈশ্বর প্রদত্ত সুযোগ। রামমন্দির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিতি ছিলেন দেশ-বিদেশের অতিথিরা- যাদের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে শিল্পপতি, খেলা ও চিত্রজগতের তারকারাও ছিলেন।
সোমবার সকাল থেকেই ‘রাম নগরী’ অযোধ্যায় সাজ সাজ রব ছিল। মন্দির সেজে উঠেছিল বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা আড়াই হাজার কুইন্টাল ফুল দিয়ে। কড়া সুরক্ষা বলয়ে ঢাকা ছিল অযোধ্যা। কড়া নজর রেখেছেন পুলিশ এবং কমান্ডোবাহিনী, গতিবিধির উপর নজর রাখতে মোতায়েন করা হয়েছে স্নাইপারও। উড়ছিল অত্যাধুনিক নজরদারি ড্রোন। নিরাপত্তার মোটা চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছে পুরো এলাকাকে। শুধুমাত্র মন্দির নির্মাণের জন্য আনুমানিক ১৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর প্রাঙ্গণটি ৭০ একর জুড়ে বিস্তৃত, মূল মন্দির রয়েছে ৭.২ একর জায়গা জুড়ে।মনোরম তিন তলা মন্দির গড়া হয়েছে গোলাপি বেলেপাথর দিয়ে, নীচের দিকে রয়েছে কালো গ্রানাইট পাথর। প্রায় ৭০ হাজার স্কোয়ার ফুট জুড়ে ধবধবে সাদা মার্বেল পাথর পাতা হয়েছে। মার্বেল পাথরের বেদিতে বসানো হবে ৫১ ইঞ্চি উঁচু রামের মূর্তি। এই মন্দিরকে অনেক হিন্দুত্ববাদী নেতা হিন্দু ভ্যাটিকান সিটি বলছেন।
গেরুয়া রাজনীতির বিশাল অর্জন: ইন্ডিয়ায় সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি অনেকেই করেছেন; এখনো করেন। তবে তাদের মধ্যে আইকনে পরিণত হয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করে তিনি অনেক ফায়দা লুটেছেন। সবশেষ তিনি জাতীয় ভোটের আগে রাম মন্দির উদ্বোধন করে হিন্দুদের মনজয় করার চেষ্টা করছেন। এর পেছনের উদ্দেশ্য ভোটে জয়লাভ করা। বর্তমান ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ১৯৯০ সালে ছিল ছোট একটি রাজনৈতিক দল। তারা তখন হঠাৎ বাবরি মসজিদের স্থলে রামমন্দির গড়ে তোলার গণপ্রচার শুরু করে।

নরেন্দ্র মোদী
মূলত ওই ক্যাম্পেইনের পর বিষ্ময়করভাবে বিজেপি অপরাজেয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষে পরিণত হয়। বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদীর জীবনের শুরুটা ছিল একেবারেই সাদামাটা। ছোটবেলায় তার বাবা যখন গুজরাটের ভাডনগর স্টেশনে চা বিক্রি করতেন, তখন বাবাকে সেই কাজে সাহায্য করতেন নরেন্দ্র মোদী। কিশোর বয়সে তিনি যোগ দেন কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘে (আরএসএস)। এটি বিজেপির মুগুর হিসেবে পরিচিত। বহু বছর ধরে তিনি তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। সেখান থেকেই রাজনীতিতে তার ধাপে ধাপে উত্থান। নিজ রাজ্য গুজরাটে একজন ক্ষমতাবান রাজনীতিক হয়ে উঠেন। দশ বছরেরও বেশি সময় তিনি এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। নরেন্দ্র মোদিকে একজন উচ্চাকাঙ্খী, পরিশ্রমী এবং খুবই কঠোর প্রকৃতির রাজনীতিক হিসেবে বর্ণনা করেন তার ঘনিষ্ঠজনরা। ভিন্নমতকে তিনি মোটেই সহ্য করেন না, এমনকি তার নিজের দলের ভেতরও নয়।
তার নেতৃত্বে গুজরাটে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু ২০০২ সালে গুজরাটে এক ভয়ংকর দাঙ্গার সময় মুসলিমদের রক্ষায় তিনি কিছুই করেননি বলে অভিযোগ উঠে। ওই দাঙ্গার জন্য তিনি কখনোই দুঃখ প্রকাশ করেননি এবং তার ভ‚মিকার জন্য ক্ষমা চাননি। একজন সফল ব্যবসা-বান্ধব রাজনীতিক হিসেবে মোদীর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তিনি নিজেকে খুবই বলিষ্ঠ এবং দ্রæত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম নেতা হিসেবে তুলে ধরেন। শহরাঞ্চলের তরুণদের তিনি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হন। রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দারুণ সাফল্যের পরিচয় দেন তিনি। তার টুইটার বার্তা অনুসরণ করতেন দেশটির হাজার হাজার তরুণ। ২০১৪ সালে তিনি ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হন।
বাবরি মসজিদ থেকে রামমন্দির, পেছনের কথা: মন্দিরটি যেখানে তৈরি হয়েছে, অযোধ্যার সরযূ নদীর তীরের সেই স্থানটি ইন্ডিয়ার সব থেকে বিতর্কিত ধর্মীয় স্থানগুলোর অন্যতম। ওখানেই একসময়ে ছিল ষোড়শ শতাব্দীতে তৈরি বাবরি মসজিদ। রাম মন্দির ধ্বংস করে ওই মসজিদ গড়া হয়েছিল, এই দাবি তুলে হিন্দু জনতা ১৯৯২ সালে মসজিদটি ভেঙ্গে দিয়েছিল। তারপরে সারা দেশে শুরু হয়েছিল সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা; তাতে মারা গিয়েছিলেন প্রায় দুই হাজার মানুষ। গত শতাব্দীর ছবিগুলোতে বাবরি মসজিদের যে অবয়ব দেখা যায়, সেই কাঠামো আর নেই। প্রাচীন স্থাপনার আদলে একই জায়গায় গড়ে উঠেছে আধুনিকতার ছোঁয়ায় নান্দনিক স্থাপনা। দেয়ালে দেয়ালে বসেছে কারুকাজ আর দেব-দেবীর প্রতিমূর্তি। আলোয় ঝলমলে স্থাপনার গম্বুজের মত চ‚ড়াগুলোতে উড়ছে গেরুয়া পতাকা। অনেক হিন্দু মনে করেন, রাম ওই স্থানে জন্ম নিয়েছিলেন। সেখানে এক সময় রাম মন্দির ছিল। সেটা ভেঙে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল।
মুঘল সম্রাট বাবরের নামে প্রতিষ্ঠিত বাবরি মসজিদটি সম্রাটের সেনাপতি মীর বাকি নির্মাণ করেছিলেন বলে জনশ্রæতি আছে। মসজিদ নির্মাণের স্থানটিকে রামের জন্মভ‚মি বলে দাবি করে আসছেন অনেকে। একটি পুরনো মন্দির ভেঙে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে তাদের দাবি। এসব নিয়ে যুগের পর যুগ চলা বিতর্কের মধ্যে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর হিন্দু ‘করসেবকরা’ পুরনো মসজিদটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। এই ঘটনাকে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের ‘ভিতে আঘাত’ বলেই মনে করা হয়। পরে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। ২০১৯ সালে ইন্ডিয়ার সুপ্রিম কোর্ট ওই জমির মালিক হিন্দুদের দিয়ে দেয়। সেখানে রাম মন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় দেওয়া হয় এবং অন্য স্থানে মসজিদ নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দের নির্দেশ দেওয়া হয়। সহিংসতা এড়াতে তখন হিন্দু-মুসলিম উভয় পক্ষ আদালতের আদেশ মেনে নেয়। ওই ধ্বংসযজ্ঞ চালানোতে অংশ নিয়েছিলেন সান্তোষ দুবে নামে এক ব্যক্তি। স¤প্রতি বিবিসি’কে তিনি বলেন, সেটি ছিল ধর্মীয় কাজ। আর এটি সম্পূর্ণ করার জন্যই পৃথিবীতে আমার আসা। এতে কোনো অপরাধ বা পাপ নেই।

শিল্পীর তুলিতে রাম মন্দির
সান্তোষ নিজেও একজন ‘করসেবক’। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদে ধ্বংসে অংশ নেওয়া হাজারো ‘করসেবকদেরই’ একজন তিনি। আর সেই দিনটি ছিল স্বাধীন ইন্ডিয়ার অন্ধকারতম এক দিন; যা ঘিরে চলা বিতর্ক আর ধর্মীয় ফাটলে সৃষ্ট সহিংসতায় হাজারো মানুষের প্রাণ গেছে।
অপরদিকে সাধারণ নির্বাচনের আগ দিয়ে বিতর্কিত রামমন্দিরের উদ্বোধনকে প্রধানমন্ত্রী মোদীর তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার অনানুষ্ঠানিক প্রচার হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সান্তোষ দুবে বলেন, তখন যদি আমরা সেটা (বাবরি মসজিদ ধ্বংস) না করতাম, এই মন্দির নির্মাণ হত না। সংবিধানের চেয়ে ধর্মীয় অনুভ‚তি বড়। আমি এখন চরম খুশি। আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম- যতক্ষণ না ভগবান রাম তার বাড়ি পাচ্ছেন, ততক্ষণ আমি আমার বাড়ি মেরামত করব না। বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সান্তোষ দুবেসহ কয়েকডজন হিন্দুত্ববাদী জেল খেটেছেন, তবে তাদের কাউকেই দোষী সাব্যস্ত হতে হয়নি। ধ্বংসলীলা চালানোতে কোনো আইন ভঙ্গ হয়েছে বলে মনেও করেন না সান্তোষ।
তার কথায়, যারা বলে মসজিদ ধ্বংসের সঙ্গে হিন্দুরা ছিল না, তারা গর্দভ। তারা ধর্মদ্রোহী, বামপন্থী, চরমপন্থী ও সন্ত্রাসবাদী। আমরা অন্য দেশে গিয়ে তাদের প্রার্থনা স্থল ধ্বংস করতে যাইনি। কিন্তু যদি তারা আমাদেরটা ধ্বংস করে, তাহলে সেটি ফিরিয়ে আনা আমাদের অধিকার।
হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক ব্যবহার, সোচ্চার বিরোধীরা: রামমন্দির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বিরোধী দলের নেতা-মন্ত্রীদেরও। কেউ নিমন্ত্রণ ‘রক্ষা’ করতে পারবেন না আগেই জানিয়েছিলেন, কেউ বা প্রধানমন্ত্রী মোদীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক স্বার্থে ‘মেরুকরণের’ অভিযোগ তোলেন।এই তালিকায় রয়েছেন সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব। তিনি আগেই জানিয়েছিলেন, ২২ জানুয়ারি (সোমবার) তার পক্ষে অযোধ্যা যাওয়া সম্ভব নয়, পরে অন্য কোনও সময় তিনি মন্দিরে যাবেন। তিনি বলেন, আমি আগেই বলেছি, রাম মন্দিরে যাওয়ার জন্য কোনও নির্দিষ্ট দিনের প্রয়োজন নেই। হৃদয়ে রয়েছেন রাম।

রাহুল গান্ধী
রাম মন্দির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাননি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি এদিন ‘ভারত জোড়ো ন্যায়যাত্রা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম সফরে এসেছিলেন। তবে তিনি ওই অনুষ্ঠান নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। এদিন তাকে বটদ্রাব সাতরা মন্দিরে যেতে বাধা দেওয়া হয়। তার মা সোনিয়া গান্ধী কিংবা দলের কোনোও নেতা ওই অনুষ্ঠানে যাননি।

একই তালিকায় রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। এদিন ‘সংহতি মিছিলের’ ডাক দিয়েছিলেন তিনি।মুখ্যমন্ত্রী মমতা বলেছিলেন, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। আমি সর্বধর্ম সমন্বয়ের মিছিল করছি। কর্মসূচিতে সমস্ত ধর্মের মানুষ; বাউল, মুরশিদি ও ফকিরি গানের একাধিক গোষ্ঠী ও শিল্পী এবং পশ্চিমবঙ্গ সনাতন ব্রাহ্মণ ট্রাস্টের সদস্যরা অংশ নেন। এই সংহতি মিছিলের প্রাক্কালে রবিবার নিজের এক্স হ্যান্ডলে একটি বার্তায় দিয়েছেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরুদ্বার যা-ই হোক, ঘৃণা, হিংসা ও নিরীহ মানুষের মৃতদেহের উপর তৈরি কোনও উপাসনাস্থল মেনে নিতে আমার ধর্ম আমায় শেখায়নি। এরপর রামমন্দিরের অনুষ্ঠান ‘লাইভ স¤প্রচারকে’ ঘিরে আবার বিতর্ক শুরু হয়। তামিলনাড়ুর ডিএমকে সরকার রাম মন্দিরের অনুষ্ঠানের লাইভ স¤প্রচারে সম্মতি দেয়নি।
প্রসঙ্গত, দক্ষিণ ভারতে বিজেপি যেখানে ক্ষমতায় নেই, এমন রাজ্যগুলি ২২ জানুয়ারি রামমন্দির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষ্যে সরকারি ছুটি ঘোষণার আহবানে সাড়া দেয়নি। রামমন্দির প্রতিষ্ঠাকে একটি ‘সামাজিক উৎসব’ হিসাবে দেখার জন্য সবাইকে আহবান জানিয়েছে কলকাতার নাখোদা মসজিদ কর্তৃপক্ষ। এই উৎসব নিয়ে নাখোদা মসজিদ কর্তৃপক্ষ মুসলিম স¤প্রদায়ের কাছে আবেদন করেছেন, এই অনুষ্ঠান নিয়ে যেন কোনও খারাপ মন্তব্য এবং বিরোধিতা যেন না করা হয়।
বাবরি মসজিদ হারিয়ে মুসলিমরা নির্বাক: বর্তমানে অযোধ্যায় বসবাস করেন ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ। তাদের মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ৩২ বছর পর আজ নতুন প্রতিষ্ঠিত রাম মন্দিরের উদ্বোধনের পর দেশজুড়ে সা¤প্রদায়িক বিভাজন আরও প্রকট হবে কি না- এমন আশঙ্কায় ভুগছেন অনেক ভারতীয় মুসলিম।
অযোধ্যার বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী মাওলানা বাদশাহ খান সিএনএন’কে জানিয়েছেন, ৩২ বছর আগের সেই ভয়াবহ দাঙ্গার ক্ষত এখনও ভুলতে পারেননি অনেক মুসলিম। মন্দির উদ্বোধনের দিন বাড়ি থেকে বের হবেন না বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, আমরা যতই নীরব থাকি না কেন, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ক্ষত কখনও শুকাবে না। নতুন ভারতে মুসলিমদের অবস্থান আসলে কোথায়— রাম মন্দির তার সর্বশেষ উদাহারণ।মন্দিরের এমন জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও অনেক মুসলিমের মধ্যে আতঙ্ক ধরাচ্ছে বলে জানিয়েছেন অযোধ্যার মুসলিমদের স্থানীয় নেতা আজম কাদরি। তিনি বলেন, যখনই আমরা অযোধ্যায় নতুন লোকজনের আগমন ঘটে, আমরা আতঙ্কিত হই। ৩২ বছর আগের দাঙ্গায় হারিয়ে যাওয়া স্বজন, সঞ্চয় ও পরিচিতির দুঃসহ স্মৃতি আমাদের মনে পড়ে যায়। সবকিছু ভুলে নতুন করে জীবন শুরু করা খুব সহজ কাজ নয়। ১৯৯২ সালের দাঙ্গায় নিজের পরিবারের দুই সদস্যকে হারানো হাজি মাহবুব বলেন, গত কয়েক বছর ধরে যে হারে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন দেখা দিয়েছে, আমার ভয় হচ্ছে হয়তো আর কিছুদিন পর অযোধ্যা থেকে মুসলিমদের বহিষ্কার করা হবে। অযোধ্যা থেকে নির্বাচিত ক্ষমতাসীন বিজেপির সংসদ সদস্য লাল্লু সিং অবশ্য এই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে তিনি বলেন, সবার নিরাপত্তা দেওয়া হবে। সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের কারও আশঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। তার কথায়, যেভাবে অযোধ্যার অন্য বাসিন্দারা থাকছেন, সংখ্যালঘুরাও সেভাবেই থাকেন, থাকবেন। নিজেদের মধ্যে স¤প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখি আমরা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো যা কাজ করছেন, সবার উন্নতির জন্যই করছেন। সেখানে কেউ এটা বলতে পারবে না যে এই ধর্মের মানুষের জন্য বাড়তি কিছু করা হয়েছে বা অন্য ধর্মের জন্য কম করা হয়েছে। আমাদের সংগঠন কখনই আমাদের বলেনি যে কারও থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চল, কারণ ভারতের নাগরিক তো সবাই। তবে এমপির কথায় তেমন ভরসা পাননি হাসান আলী। ১৯৯২ সালের ভয়াবহ দাঙার সময় নিজের পরিবার পরিজনকে হারিয়েছেন তিনি। আত্মরক্ষার জন্য স্থায়ী পুলিশ স্টেশনে আশ্রয় নেওয়া হাসান আলীর বয়স সে সময় ছিল মাত্র ৯ বছর। সিএনএনকে তিনি বলেন, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সে সময় স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবও ছিল। এমনকি দাঙার সময় মুসলিমদের বাঁচাতে স্থানীয় হিন্দুরা এগিয়ে এসেছেন- এমন শত শত উদাহরণ রয়েছে। স্থানীয় হিন্দুরা এগিয়ে না এলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তো। কিন্তু এখনকার বাস্তবতা ভিন্ন। গত প্রায় দুই দশক ধরে মানুষের মনে যেভাবে সা¤প্রদায়িকতার বিষ ঢোকানো হয়েছে, তাতে কার মনে কী চিন্তা চলছে- তা আর এখন বোঝার উপায় নেই। সামনের দিনগুলোতে কী হবে- তাও বলার উপায় নেই।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৩ জানুয়ারি ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
মসজিদ নির্মাণ কাজ এখনও শুরু হয়নি: ধান্নিপুর গ্রামটি উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যা শহর থেকে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ছোট ছোট বাড়ি, কিছু দোকান, কয়েকটা মসজিদ এবং একটা মাদ্রাসা- সর্বসাকুল্যে এগুলোই চোখে পড়ে স্বল্প বসতির এই গ্রামটিতে। মসজিদটি নির্মাণের জন্য ওয়াকফ বোর্ডের তৈরি করা সংস্থাই হচ্ছে ‘ইন্দো-ইসলামিক কালচারাল ফাউন্ডেশন’। ‘রামাজন্মা ভ‚মি তীর্থক্ষেত্র ফাউন্ডেশন’ যখন বাবরি মসজিদের বিতর্কিত জায়গাটিতে রামমন্দির নির্মাণ করে ফেলেছে তখন মসজিদ নির্মাণের জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে কাজ শুরুর কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যদিও ইতিমধ্যে ওই জমিতে বেশ আগে নির্মিত পুরানো একটি দরগা সংস্কার করা হয়েছে। এর দেয়ালের গায়ে সংযুক্ত একটি ছবিতে নির্মিতব্য মসজিদের অবকাঠামো দেখানো হয়েছে। সেখানে মসজিদটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে ‘মসজিদ মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ’। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জমি নিয়ে বিরোধের মামলার বাদী ছিলেন ইকবাল আনসারি। মূলতঃ তার বাবা হাশিম আনসারিই একই মামলার বাদী ছিলেন। ২০১৬ সালে তার মৃত্যুর পর মি. ইকবাল মামলাটি চালিয়ে যান। মি. ইকবাল বর্তমানে নির্মাণাধীন রাম মন্দিরের খুব কাছেই একটি ছোট বাড়িতে থাকেন। দুজন সশস্ত্র পুলিশ সদস্য এখন তাকে সার্বক্ষণিকভাবে নিরাপত্তা দেন। ইকবাল বলেন, জমি ওয়াকফ বোর্ডকে বরাদ্দ করা হয়েছে। সেখানে মসজিদ নির্মাণের দায়িত্ব তাদের। এ জন্য তারা একটি ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেছেন। কিন্তু এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। মুসলমানরাও এটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করে না। তিনি দাবি করে যে, তার বাবা মি. হাশিম যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন বাবরি মসজিদের দেখাশোনা করেছেন। কাজেই তিনি চাইলে কোনো কথা না বলে চুপচাপ মসজিদের জমিতে ফসল চাষ করতে পারতেন এবং আশপাশের হিন্দু-মুসলিমদের সাথে সেই ফসল ভাগ করে নিতে পারতেন। তিনি বলেন, সেখানে মুসলমানরা নতুন মসজিদ নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন, কারণ তাদের পর্যাপ্ত সংখ্যক মসজিদ রয়েছে।
ইউডি/সিরাজ/এজেএস

