দুই শিশুর মৃত্যুর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা, রাজশাহীতে ‘অজানা ভাইরাস’ আতঙ্ক: রোগ নির্ণয় অনিশ্চিত
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১২:৫০
রাজশাহীর দুই শিশুর মৃত্যুর কারণ এখনো জানা যায়নি। ফলে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। রোগ নির্ণয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সিরাজুল ইসলাম’র প্রতিবেদন
উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরাও: রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার চুনিয়াপাড়া গ্রামের দুই শিশু মুনতাহা মারিশা (২) এবং মুফতাউল মাসিয়ার (৫) মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করতে পারেননি চিকিৎসকরা। কুড়িয়ে আনা বরই খাওয়ার পর তারা অসুস্থ হয় এবং মারা যায়। আইসোলেশনে থাকা তাদের মা-বাবার নিপাহ ভাইরাস, করোনা ও ডেঙ্গু টেস্ট রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। এসব রিপোর্ট ওই দুই শিশুরও নেগেটিভ এসেছিল। এ জন্য অজানা ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন চিকিৎসকরাও। খেজুর রস এড়িয়ে চলাসহ ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ে রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) একটি বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল টিম রাজশাহীতে গেছেন। তারা সার্বিক বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। দেশে নিপাহ ও ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ মাত্র কয়েকটি ভাইরাস পরীক্ষার পদ্ধতি আছে। আর কোভিড-১৯-এর সময় করোনাভাইরাস পরীক্ষা শুরু হয়। অন্য কোনও ভাইরাস পরীক্ষার সক্ষমতাই নেই। এ অবস্থায় শিশু দুটি কোন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল তা আদৌ জানা যাবে কি-না তা নিয়েই অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে একজন চিকিৎসক জানিয়েছেন।
আইসোলেশনে শিশু দুইটির মা-বাবা: মারা যাওয়া দুই শিশু মুনতাহা মারিশা (২) এবং মুফতাউল মাসিয়াকে (৫) পাশাপাশি কবর দেওয়া হয়েছে। তাদের মা-বাবাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। মৃত শিশুদের বাবার নাম মঞ্জুর হোসেন (৩৫) এবং মায়ের নাম পলি খাতুন (৩০)। তাদের বাড়ি রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার চুনিয়াপাড়া গ্রামে। মঞ্জুর রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষক। পরিবার নিয়ে তিনি ক্যাডেট কলেজের কোয়ার্টারে থাকেন।
হাসপাতালে মঞ্জুর-পলি দম্পতির পাশে আছেন তাদের স্বজন রইস উদ্দিন। তিনি বলেন, এ ঘটনার পর বাড়িতে মঞ্জুরের মা মুমুর্ষূ হয়ে পড়েছেন। কিছুতেই তার আহাজারি থামছে না। এদিকে, হাসপাতালে শিশু দুটির মা পলি আহাজারি করছেন। তাকেও কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। জানা গেছে, মারা যাওয়া দুই শিশুকে বুধবার গাছতলা থেকে বরই কুড়িয়ে এনে খেতে দিয়েছিলেন গৃহকর্মী। বরইগুলো ধোয়া ছিল না। পরদিন বৃহস্পতিবার ছোট মেয়ে এবং শনিবার বড় মেয়ের মৃত্যু হয়। দুই শিশুর হঠাৎ জ্বর আর বমির লক্ষণ দেখা দেয়। মৃত্যুর আগে ও পরে দুজনেরই শরীরে ছোপ ছোপ কালো র্যাশ দেখা দিয়েছিল। আর আইসোলেশনে থাকা শিশুদের মা-বাবার এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনও লক্ষণ প্রকাশ পায়নি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
শিশুদের মা পলি খাতুন জানিয়েছেন, মঙ্গলবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে কোয়ার্টারের গৃহকর্মী কলেজ ক্যাম্পাসের গাছ থেকে বরই কুড়িয়ে এনে দুই মেয়েকে খেতে দিয়েছিলেন। না ধুয়েই ওই বরই খেয়েছিল মারিশা আর মাসিয়া। সেদিন তারা ভালোই ছিল। পরদিন সকাল ১১টার দিকে ছোট মেয়ে মারিশা জ্বরে আক্রান্ত হয়। বারবার পানি খাচ্ছিল। দুপুরের পর শুরু হয় বমি। তখন তারা মাইক্রোবাসে রাজশাহীর সিএমএইচ হাসপাতালে যাওয়ার পথে কাটাখালী এলাকায় মারা যায় মারিশা। শুক্রবার সকাল থেকে দুর্গাপুরের বাড়িতে মাসিয়ারও একই লক্ষণ দেখা দেয়।দ্রুতই তাকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে রাজশাহী সিএমএইচে নেওয়া হয়। রাতে মাশিয়ারও পুরো শরীরে র্যাশ দাগ উঠতে শুরু করে। তা দেখে সিএমএইচের চিকিৎসকরা রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। রাত ৯টায় সেখান আনা হলে চিকিৎসকরা তাকে দ্রæত আইসিইউতে ভর্তি নেন। শনিবার বিকালে মাসিয়াও মারা যায়।

সব ভাইরাস নির্ণয়ের ব্যবস্থা দেশে নেই :নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজশাহীর একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক বলেন, দেশে নিপাহ ও ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ মাত্র কয়েকটি ভাইরাস পরীক্ষার পদ্ধতি আছে। আর কোভিড-১৯-এর সময় করোনাভাইরাস পরীক্ষা শুরু হয়। অন্য কোনও ভাইরাস পরীক্ষার সক্ষমতাই নেই। এ অবস্থায় শিশু দুটি কোন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল তা আদৌ জানা যাবে কিনা তা নিয়েই অনিশ্চয়তা রয়েছে।
রামেক হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, আমরা নিপাহ ভাইরাস আর মিশেরিয়া ব্যাকটেরিয়ার আশঙ্কা করেছিলাম। পরীক্ষায় এ দুটো রিপোর্টই নেগেটিভ এসেছে। আমরা আশঙ্কা করছি, কুড়িয়ে আনা বরই না ধোয়া অবস্থায় খেয়েই অজানা কোনও ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল শিশু দুটি। এভাবে জ্বর, বমির পর র্যশি উঠে দ্রতুই রোগী মারা যাওয়া আগে কোনও রোগের ক্ষেত্রে আমি দেখিনি। তিনি বলেন, এটি কী ভাইরাস, সরকার চাইলে তা বের করতে পারবে। এ জন্য মাশিয়া মারা যাওয়ার আগেই তার পাকস্থলী থেকে কিছু খাবার বের করে সংরক্ষণ করেছি। রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট চাইলে এটি আমরা দিতে পারবো। পরীক্ষা করলে কিছু জানা যেতেও পারে।
রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, শিশু দুটির নিপাহ ভাইরাস রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। তারা কোন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল তা এখনই বলা যাবে না। এ জন্য নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতেই থাকবে। রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) একটি বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল টিম রাজশাহীতে গেছে। নিপাহ ভাইরাস রিপোর্ট নেগেটিভ হওয়ার পরই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই দলটি দ্রুতই রাজশাহী পৌঁছাবে।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এএফএম শামীম আহম্মদ বলেন, পরীক্ষায় যখন কিছু পাওয়া গেলো না; তখন আমিই স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (প্রশাসন) কাছে অনুরোধ করলাম। যেন একটা বিশেষজ্ঞ দলকে রাজশাহী পাঠানো হয়।
রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. আবু সাইদ মোহাম্মদ ফারুক বলেন, আমরা আগে থেকেই নিপাহর সংক্রমণ রোধে কাঁচা খেজুর খাওয়া রোধে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছিলাম। কাঁচা খেজুর রস খাওয়া বন্ধ করেছি। আর ওই দুই শিশুর মৃত্যুর কারণ হিসেবে নিপাহ ভাইরাস ধারণা করা হচ্ছিল। সেটির রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। এ নিয়ে আইইডিসিআর কাজ করছে। তবে খেজুর রস না খাওয়া এবং ফল ভালোভাবে পরিষ্কার খাওয়ার বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে। নগরীর বেশ কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনায় জানা গেছে, এই দুই শিশুর মৃত্যুতে তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
রাজশাহীতে কাজকরছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল: মারা যাওয়া দুই বোন মুনতাহা মারিশা (২) ও মুফতাউল মাসিয়া (৫) নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত ছিল না। এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর চিকিৎসকেরা এখন জানার চেষ্টা করছেন, এই দুই শিশু অন্য কোনো ভাইরাস অথবা ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল কি না। শিশু দুটির মা–বাবাকে এ জন্য হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হয়নি। রবিবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাতে রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রাজশাহী মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে পৌঁছায়। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফ এম শামীম আহাম্মদ বলেন, মাইনুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রাজশাহীতে এসেছেন। তারা ইতিমধ্যে তার সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা বিভিন্ন রকম নমুনা ও হিস্ট্রি সংগ্রহ করছেন। তারা হাসপাতাল এবং পাশাপাশি এলাকায়ও যাবেন। শিশু দুইটির বাবার নাম মঞ্জুর হোসেন (৩৫) ও মা পলি খাতুনের (৩০) সঙ্গে হাসপাতালে আছেন তার স্বজন রইস উদ্দিন। তিনি বলেন, প্রতিনিধিদলের সদস্যরা শিশু দুটির মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা খুঁটিনাটি সবকিছু জানতে চেয়েছেন। কখন, কীভাবে, কী হয়েছিল। গায়ে কী রকম দাগ দেখা গেছে। তারা ক্যাডেট কলেজেও যাবেন।
শিশু দুইটির শরীরে যে সব লক্ষণ ছিল: জানা গেছে, জ্বর, বমির পর সারা শরীর ভরে গিয়েছিল ছোপ ছোপ কালো দাগে। এমন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে দুই বোন। চিকিৎসা দূরের কথা, রোগ শনাক্তের সময়ও পাননি চিকিৎসকরা। তারা ধারণা করছেন, অজানা কোনও ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন তারা।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দুই শিশু গৃহকর্মীর এনে দেওয়া বরই খেয়েছিল। গাছতলা থেকে কুড়িয়ে বরই এনে দিয়েছিলেন গৃহকর্মী। এরপর বুধবার সকালে ছোট মেয়ে মারিশার জ্বর আসে। বিকেলে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মাইক্রোবাসে সে মারা যায়। মৃত্যুর পর মা-বাবা লক্ষ করেন, মারিশার গায়ে কালো ছোপ ছোপ দাগ উঠেছে। ওই দিন রাতেই তাকে দাফন করা হয়। এরপর শুক্রবার বড় মেয়ে মাসিয়ার একই লক্ষণসহ জ্বর আসে। সেও ছোট বোনের মতো বমি করছিল আর ঘন ঘন পানি খাচ্ছিল। লক্ষণ বুঝতে পেরে মা-বাবা দেরি করেননি। রাজশাহীর সিএমএইচে ভর্তি করেন। ওই দিনই তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরের দিন শনিবার বিকেলে একইভাবে সেও মারা যায়।রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, দুই মেয়ে বরই খেয়েছিল। তিনি তাদের বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বরইগুলো ধুয়ে দেওয়া হয়েছিল কি না। তাদের বাবা বলেন, গৃহকর্মী গাছতলা থেকে কুড়িয়ে এনে দিয়েছিলেন, ধোয়া হয়নি।
অজ্ঞাত ভাইরাসে মরেছিল শত গরু: রাজশাহীতে গত বছরের জুন ও জুলাই মাসে অজ্ঞাত ভাইরাস দেখা দেয়। সেসময় গোদাগাড়ী উপজেলার খারিজাগাতির চরে শতাধিত গরু মারা যায়। ভাইরাস তাড়াতে চাষিরা ধূপ ও আগরবাতি ব্যবহার করেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শে স্বেচ্ছাসেবীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন। চাষিদের অভিযোগ, চিকিৎসায় কোনো কাজই হয়নি। এটা একটা ‘ভাইরাস’। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের খারিজাগাতি, নিমতলা, কোমরপুর, বিজয়নগর ও শেখপুর গ্রামের মানুষ পদ্মা নদীর চরে গরু-মহিষ পালন করেন। এটিই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের পেশা। গোদাগাড়ী উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, ২০২১ সালে দেওপাড়া ইউনিয়নে গরুর সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৭৩১টি। এর অধিকাংশই খারিজাগাতি চরে পালন করা হয়। এই সংখ্যা গত দুই বছরে আরও বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি গরু মারা গেছে বিজয়নগর গ্রামের চাষি আশরাফুল ইসলামের (এলাকায় বাবু নামে পরিচিত)। তার ১০টি গরু মারা গেছে।
গোদাগাড়ী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রিপা রানী বলেন, লক্ষণ না দেখে কী রোগ তা বলা যাবে না। তিনি এলাকায় গিয়েছিলেন। কোনো চাষি ‘অন দ্য স্পট’ তাকে অসুস্থ গরু দেখাতে পারেননি।
চাষিরা বলছেন, বেশির ভাগ গরুই মারা যায় পদ্মা নদীর চরে। লক্ষণ বোঝার পর আর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় পাওয়া যায়নি। গরুর জ্বর ছিল। মাংসপেশি ফুলে যেত। ফোলা জায়গায় চাপ দিলে ‘পুড়পুড়’ শব্দ হচ্ছে। এই লক্ষণের কথা শুনে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বললেন, এটা বাদলা রোগের লক্ষণ। সাধারণত এ সময় গলাফোলা ও বাদলা রোগ হয়। এই রোগের টিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চাষিরা বলেন, টিকাতেও রক্ষা হয়নি। টিকা দেওয়া গরুও মারা যাচ্ছে।
কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, গবাদিপশুর মারাত্মক রোগগুলোর মধ্যে বাদলা বা বø্যাক কোয়ার্টার অন্যতম। এ রোগে পশু মৃত্যুর হার অনেক বেশি। পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এ মৃত্যুর হার ১০০ ভাগই। প্রতিবছর বিশেষত বর্ষার পর এ রোগের প্রকোপ বেড়ে যায় অনেকাংশে। বাংলাদেশের অনেক গরুই এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এটি একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত মারাত্মক সংক্রামক রোগ। ঘাতক এ রোগটির জন্য দায়ী ক্লসট্রিডিয়াম চোউভি নামের ব্যাকটেরিয়া। এ জীবাণু সহজেই সংক্রমিত হতে পারে।
গোদাগাড়ী উপজেলার নিমতলা গ্রামের আবদুল হান্নানের পাঁচটি গরুর মধ্যে দুটি মারা গিয়েছিল। রোগের লক্ষণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘গরু হাইলছে, রইয়ে থাকতে পারছে না। প্যাট চড়হে (ফুলে) যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরেই মুখ দিয়ে ছ্যাবড়া-ট্যাবড়া বারিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে।’ একই গ্রামের ইয়াকুব আলী বলেন, তার ৪০-৪২ হাজার টাকা দামের এঁড়ে বাছুর মাঠে চরছিল। হাঁটতে পারছে না দেখে ঘাড়ে করে নদী পার করে এনে ওষুধ খাওয়ান। তার পরদিনই মারা যায়।
নিমতলা গ্রামের রাসেল বলেন, তার গরু অসুস্থ হওয়ার পর ডাক্তার (স্বেচ্ছাসেবী) ইনজেকশন দিল। তারপরই প্যাট চড়হে গেল। প্যাট চড়হার ১৫ মিনিটের মধ্যেই গরু মইরে গেল।
নিমতলা গ্রামের চাষিরা জানান, সবচেয়ে বেশি গরু মারা গেছে বিজয়নগর গ্রামের চাষি আশরাফুল ইসলামের (এলাকায় বাবু নামে পরিচিত)। তার ১০টি গরু মারা গেছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কাছে তার একটি গরুর মৃত্যুরও খবর নেই। উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের স্বেচ্ছাসেবী রফিকুল ইসলাম এই এলাকায় গরুর কৃত্রিম প্রজনন করান। তিনি অবশ্য এতো গরুর মারা যাওয়ার খবর পাননি বলে জানান।
অজ্ঞাত রোগ শনাক্তে তারা তৎপর: অজ্ঞাত রোগ শনাক্ত করার কাজ করে রোগতত্ত¡, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) বিশেষায়িত একটি দল। নাম ‘র্যাপিড রেসপন্স টিম’। দেশের কোথাও অজ্ঞাত রোগে মানুষ বা পশুপাখি আক্রান্ত হওয়ার খবর শুনলেই চার ঘণ্টার প্রস্তুতিতে অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়তে পারে দলটি।
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন বলেন, কাজটি করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। আমরা ঘটনা জানি বা শুনি, ঘটনা যাচাই করি, ঘটনাস্থলে র্যাপিড রেসপন্স টিম পাঠাই। এই কাজটি সারা বছর ধরে চলে। এই মহামারির সময়েও অন্য রোগের অনুসন্ধান বন্ধ থাকেনি।
আইইডিসিআরের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, বছরে গড়ে ২২টি ঘটনা তারা অনুসন্ধান করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর বলেন, নতুন বা অজ্ঞাত রোগের তথ্য আমরা পাই গণমাধ্যম থেকে। এ ছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বা জেলা সিভিল সার্জনদের কাছ থেকেও আমরা নতুন ঘটনা সম্পর্কে আনতে পারি। সূত্র যা-ই হোক, ছুটে যাই দ্রুত।

দৈনিক উত্তরদিক্ষণ । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
তিন স্তরের নেটওয়ার্ক : আইইডিসিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সারা দেশে র্যাপিড রেসপন্স টিমের তিন স্তরের একটি নেটওয়ার্ক আছে। সবচেয়ে নিচের স্তরে আছে উপজেলা র্যাপিড রেসপন্স টিম। ৯ সদস্যের এই দলের প্রধান হিসেবে কাজ করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা। এর ওপরে আছে জেলা র্যাপিড রেসপন্স টিম। ১৩ সদস্যের এই দলের প্রধান জেলা সিভিল সার্জন। ঢাকায় আইইডিসিআর কার্যালয়ে আছে ন্যাশনাল র্যাপিড রেসপন্স টিম। কেন্দ্রীয় দলটিতে কমপক্ষে সাতজন সদস্য থাকে। এর নেতৃত্বে থাকেন প্রতিষ্ঠানের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।
বিশেষায়িত অনুসন্ধান: কেন্দ্রীয় এই দলটি প্রয়োজনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদেরও সঙ্গে নেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানী ও গবেষক নিয়মিতভাবে আইইডিসিআরের দলে যুক্ত হয়ে সারা দেশে কাজ করেন। আইসিডিডিআরবির সংক্রামক ব্যাধি বিভাগের সহকারী বিজ্ঞানী ও প্রাদুর্ভাব অনুসন্ধান দলের প্রধান ডা. সৈয়দ মইনুদ্দিন সাত্তার বলেন, কাজটির সবটাই কারিগরি বিষয়। দল গঠন, প্রস্তুতি, যাত্রা শুরু, মাঠের কাজ- সবকিছু হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে। এই কাজে যুক্ত প্রত্যেকেরই প্রশিক্ষণ থাকতে হয়।
আইইডিসিআরের দেওয়া তথ্য অনুসারে ২০০৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৩১০টি ঘটনার অনুসন্ধান করেছে তারা। এসব অনুসন্ধান থেকে দেশের মানুষ নিপাহ, বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লুর মতো রোগ সম্পর্কে প্রথম জানতে পারে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ডিফথেরিয়ার প্রাদুর্ভাব শনাক্ত করেছিল আইইডিসিআরের র্যাপিড রেসপন্স টিম।
নতুন রোগ শনাক্ত করে বা রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণ নির্ণয় করে দায়িত্ব শেষ করে না আইইডিসিআর। এরপর তারা মানুষের জন্য স্বাস্থ্য বার্তা তৈরি করে, মানুষকে সচেতন করার জন্য নিয়মিত বুলেটিন প্রচার করে, সংবাদ ব্রিফিং করে, বিভিন্ন রোগনিয়ন্ত্রণ কিটের যথার্থতা যাচাই করে, রোগটির ঝুঁকির বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে এবং সরকারকে করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দেয়।
রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান দীর্ঘদিন এই অনুসন্ধান কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখন স্বাধীন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ৫০ বছর আগে রোগের বিষয়ে অনুসন্ধান আজকের পদ্ধতিতে হতো না। প্রাথমিক স্বাস্থ্য কর্মসূচির আওতায় কাজগুলো হতো। এখন নতুন রোগ শনাক্ত করা বা প্রাদুর্ভাবের কারণ জানার পাশাপাশি অনুসন্ধানের একটি উদ্দেশ্য থাকে রোগটি যেন দ্রুত ছড়িয়ে না পড়ে। সময় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। র্যাপিড রেসপন্স টিম যত দ্রæত কাজ করে, রোগনিয়ন্ত্রণ তত সহজ হয়।
ইউডি/সিরাজ/এজেএস

