মাধ্যমিক স্তরে আশঙ্কাজনক হারে শিক্ষার্থী কমছে, নেপথ্যে যা
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২৯ মার্চ, ২০২৪, আপডেট ১২:০০
গত চার বছরে দেশের মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী কমার সংখ্যা আশঙ্কাজনক বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ নিয়ে সাদিত কবির’র প্রতিবেদন
২০১৯-২০২৩-চালচিত্র: করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শুরুর আগের বছর ২০১৯ সালে দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিল ৯২ লাখ ৩ হাজার ৪২৭ জন। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮১ লাখ ৬৬ হাজার ১৮৮ জনে। অর্থাৎ এই চার বছরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১০ লাখের বেশি। শিক্ষার্থী কমার এই সংখ্যা আশঙ্কাজনক বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। বৃহস্পতিবার (২৮ মার্চ) এ তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)। সংস্থাটি শিক্ষার্থী কমার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করেনি। ব্যানবেইস বলছে, সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তা উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে ব্যানবেইসের নিজস্ব কোনো পর্যালোচনা নেই। এই তথ্য নিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তর কাজ করতে পারে। প্রতি বছরই দেশে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। সাধারণত প্রাথমিক শিক্ষা শেষ না করতেই ঝরে পড়ার সংখ্যা শুরু হয়। সবচেয়ে বেশি ঝরে পড়ে অষ্টম শ্রেণি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকে যারা পাস করতে ব্যর্থ হন তাদের নামও রয়েছে ঝরে পড়ার তালিকায়। আবার অনেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগের অভাবে ঝরে পড়ছে।
যে সকল স্তরে বাড়ছে শিক্ষার্থী সংখ্যা: মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষার্থী কমলেও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৮০ হাজারের মতো বেড়েছে। একই সময়ে মাদ্রাসায় প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থী বেড়েছে। একইভাবে কারিগরি ও ইংরেজি মাধ্যমেও শিক্ষার্থী বেড়েছে। ব্যানবেইসের তথ্য বলছে, মাধ্যমিকে কমে যাওয়া শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫৫ শতাংশই ছাত্রী। এই শিক্ষার্থীরা দেশের ১৮ হাজার ৯৬৮টি বিদ্যালয়ে পড়ত। ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে বলা হয়, চার বছরের ব্যবধানে সরকারের অধীনে থাকা মাদ্রাসাগুলোতে (দাখিল ও আলিম ধারার মাদ্রাসা) আড়াই লাখের বেশি শিক্ষার্থী বেড়েছে। বর্তমানে মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থী ২৭ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ছাত্রী প্রায় ৫৪ শতাংশ। সরকার কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। বর্তমানে ৫ হাজার ৩৯৫টি (এর মধ্যে ৫৮৮টি সরকারি) কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থী প্রায় সাড়ে ৭ লাখ। চার বছর আগে যা ছিল ৭ লাখের মতো। ওই সময় কারিগরি প্রতিষ্ঠান ছিল ২ হাজার ৩০৯টি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যায় সমতা এলেও কারিগরিতে ছাত্রীদের হার এখনো অনেক কম। কারিগরিতে যত শিক্ষার্থী পড়ে, তার মধ্যে ২৯ শতাংশের মতো ছাত্রী। ব্যানবেইসের খসড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ১২৩টি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করছে ২৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী; যা চার বছর আগে ছিল ২৬ হাজারের বেশি।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো
কেন এত শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে: ব্যানবেইসের খসড়া প্রতিবেদনে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার চিত্র উঠে এসেছে। মাধ্যমিকে এখন ঝরে পড়ার হার কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ, যা চার বছর আগে ছিল প্রায় ৩৭ শতাংশ। মাধ্যমিক পেরোতে পারলে উচ্চমাধ্যমিকে গিয়ে ঝরে পড়ার হারটি কম থাকে। তবে চার বছরের ব্যবধানে উচ্চমাধ্যমিকে এই হার বেড়েছে। উচ্চমাধ্যমিকে ঝরে পড়ার হার এখন ২১ শতাংশের বেশি, যা চার বছর আগে ছিল ১৮ শতাংশের বেশি। কেন এত শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে? এর প্রধান কারণ দরিদ্রতা। এছাড়া কারণ হিসেবে রয়েছে অভিভাবকের অসচেতনতা, মেয়েশিশুর প্রতি অবহেলা, বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম ও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। বিশেষ করে, আমাদের দেশের বেশির ভাগ পরিবারই দারিদ্র্যের সঙ্গে বসবাস করে। অনেক পরিবারেই দেখা যায়, সন্তান একটু বড় হয়ে উঠলেই তাকে উপার্জনে পাঠান অভিভাবকরা। ফলে অনেকেই পড়ালেখা না করে কর্মজীবনে প্রবেশ করে একরকম বাধ্য হয়েই। এ কারণেই কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। আবার যারা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হতে পারেননি তারা অনেক সময় পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে এদের বড় একটি অংশ চলে যায় কর্মসংস্থানে। অনেকে কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশেও যায়। এটা প্রায় প্রতি বছরই নিয়মে পরিণত হয়েছে। তবে শঙ্কার খবর হলো, এর সংখ্যাটা দিন দিন শুধুই বাড়ছে। অথচ দেশের সার্বিক অগ্রগতির পথে এটা একটি বড় বাধা। বিভিন্ন সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। ঝরে পড়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, দিনদিন যেভাবে সংসার খরচ বাড়ছে, সেখানে সংসার পরিচালনা করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারমধ্যে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাতে পারছিলাম না, এজন্য তাদের স্কুলে না পাঠিয়ে বিভিন্ন কাজে লাগাচ্ছি। যাতে সংসার পরিচালনা একটু সহজ হয়। আবার কেউ কেউ বলছেন, এমনিতেই আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তার মধ্যে শিক্ষা ব্যয় দিনদিন বাড়ছেই। এজন্য আমাদের সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারছি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, সাধারণ ধারার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে আর্থসামাজিক পরিস্থিতি থাকতে পারে। অনেকে কাজে নিয়োজিত হচ্ছে। গবেষণার মাধ্যমে কারণগুলো বের করে এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
সমাধানে বড় ধরনের গবেষণার তাগিদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান মনে করেন, প্রাথমিকের পর থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ৫০-৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী কেন ঝরে পড়ছে, তা নিয়ে গবেষণা করাটা সরকারের দায়িত্ব। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, প্রাথমিকে ঝরে পড়াদের নিয়ে প্রকল্প আছে, সেটার কিছু সফলতাও আছে। কিন্তু সেকেন্ডারিতে তেমনভাবে কাজ হচ্ছে না। ঝরে পড়াদের ফিরিয়ে আনতে চাইলে বড় ধরনের গবেষণা করে সঠিক কারণটা জানা না গেলে কোনো উদ্যোগই ভালো ফল বয়ে আনবে না। তিনি এর পেছনে মেয়েদের বাল্যবিয়ে এবং ছেলেদের শ্রমবাজারে ঝুঁকে পড়াকে কারণ হিসেবে দেখছেন। এর সঙ্গে রয়েছে মাদকাসক্তি। নিজের গবেষণার প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক হাফিজ বলেন, আমি দেখলাম, যখন বিভিন্ন এলাকায় ইকোনোমিক জোন ডেভেলপ করছিল, তখন ওই এলাকাগুলায় নবম-দশম শ্রেণির অনেক বাচ্চা ড্রপ আউট হয়েছে। এই শিক্ষক বলছেন, এসব সমস্যার মধ্যেও তার গবেষণায় বড় হয়ে ধরা পড়েছে শিক্ষকদের দুর্বলতা ও স্কুলের শিক্ষাদান পদ্ধতির গলদ। যে কারণে শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ধরে রাখা যাচ্ছে না। প্রাথমিকের শিক্ষকরা মাধ্যমিকের শিক্ষকদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি ট্রেইনড। মাধ্যমিকের শিক্ষকরা গতানুগতিকভাবে পড়াটা শেষ করিয়ে দেন। স্কুলে শিক্ষার্থীকে ধরে রাখার জন্য যে রকমভাবে পড়ানো দরকার, সেটা আমরা গবেষণাতে তেমন পাইনি। শিক্ষার্থীরা ক্লাসের পড়ার সঙ্গে জীবনের মিল খুঁজে পায় না। ক্লাসে যা পড়ছে, তা জীবনে চলার পথে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো ভ‚মিকা রাখছে কিনা সে বিষয়ে শিক্ষকরা শিক্ষা দিতে পারছেন না। শিক্ষকরা কনটেন্ট পড়াচ্ছেন, কিন্তু কনটেক্সটের সাথে তেমন রিলেট করতে পারছেন না।”

মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল
গতানুগতিক পদ্ধতির বাইরে গিয়ে চিন্তা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়: শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করা ও ধরে রাখার জন্য সরকার প্রতি বছর উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই, খাবার দেওয়াসহ অন্যান্য খাতে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। এরপরও বিভিন্ন পর্যায়ে এত অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন ঝরে পড়ছে- এ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নতুন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এ বিষয়ে বেশি মনোযোগ দেবেন জানিয়ে বলেছেন, ২০১০ এর শিক্ষানীতির আলোকে নি¤œ মাধ্যমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক অথবা স্বল্পমূল্যে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কোনো শিক্ষার্থী যাতে নি¤œ মাধ্যমিক থেকে ঝরে না পড়ে, সেই প্রয়াস থাকবে। তিনি আরো বলেছেন, মাধ্যমিকে কেন ঝরে পড়ছে, এটা মোটামুটি আমরা সবাই জানি। কিন্তু সমাধান হচ্ছে না। তাই ঝরে পড়া রোধে আমি গতানুগতিক পদ্ধতির বাইরে গিয়ে চিন্তা করছি। নি¤œ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা একেবারে বিনামূল্যে না হলেও স্বল্পমূল্যে যাতে পড়াশোনা করতে পারে সে উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি ঝরে গেছে এমন শিশুদের কর্মমুখী একটি কোর্সের মাধ্যমে আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা থাকবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব সোলেমান খান গণমাধ্যমকে বলেন, মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ সবাই জানে। করোনা প্রতিঘাতের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে শিক্ষার্থীদের অনেকে কর্মজীবনে প্রবেশ করে। তাদের ক্লাস রুমে ফিরিয়ে আনার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
মাউশি’র জরিপ যা জানাচ্ছে: মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কর্মকর্তাদের দাবি, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭ শতাংশের বেশি নয়। মহামারীর পরে অধিদপ্তরের চালানো একটি জরিপ থেকে ওই হিসাব পাওয়ার কথা বললেন অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন শাখার পরিচালক অধ্যাপক আমির হোসেন। তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে আমরা কোভিডের সময় যে অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছি, ৯৩ ভাগ শিক্ষার্থীরা অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়েছে। এটা থেকে আমরা বলতে পারি, ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী এখনো আছে, ঝরে পড়েনি।” আর সবাই সেই অর্থে ঝরে পড়ে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “অনেক ছেলেমেয়ে ডিপ্লোমা বা নার্সিংয়ে চলে যায়। আমাদের একটা বিরাট অংশ কারিগরিতে চলে যাচ্ছে। একেবারে ঝরে যাচ্ছে, এটা কিন্তু বলা যাচ্ছে না। ঝরে পড়াদের ফিরিয়ে আনতে ‘মোটিভেশনাল কার্যক্রম ও গবেষণা’ চলছে বলেও জানান মাউশির এই কর্মকর্তা তিনি বলেন, “যারা পিছিয়ে যাচ্ছে, তাদের জন্য আমরা এক্সট্রা ক্লাসের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি। যাতে তাদের ঘাটতিটা ক্লাসেই পূরণ করতে পারে। আশা করি, অচিরেই আমরা পদক্ষেপ নিতে পারব। আমরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছি।
নেপথ্যের কারণ নিয়ে শিক্ষাবিদদের মত: শিক্ষাবিদরা বলেছেন, ঝরে পড়া শিক্ষার্থী রোধে সরকারকে আরো বেশি উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করতে হবে। যেহেতু এটা একটি বড় ধরনের সমস্যা। তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সবার মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি। বিশেষ করে এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ নিজ সন্তানকে যদি গড়ে তোলার দায়িত্ব তারা বোধ না করে, তবে শত চেষ্টাতেও এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাই সরকারের উচিত এ বিষয়ে অভিভাবকদের অনুপ্রাণিত করা। যাতে তাদের সন্তানরা স্কুলমুখী হয়। এছাড়া যথাযথ সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রচার-প্রচারণা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি সঠিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার পেছনে অতিমাত্রায় শিক্ষাব্যয়কে অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সমাজের দরিদ্র ব্যক্তিটিও চান, তার সন্তান লেখাপড়া করুক। কিন্তু শিক্ষা নিয়ে দেশে যে ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে; নোট-গাইড আর প্রাইভেট-কোচিংয়ের যে দৌরাত্ম্য চলছে- কম আয়সম্পন্ন পরিবারগুলো এ ‘ধাক্কা’ সামলাতে পারছে না বলেই ঝরে পড়ার ঘটনা ঘটছে। অবশ্য এক্ষেত্রে আর্থিক অসঙ্গতি যেমন দায়ী, তেমনি বাল্যবিয়ে ও কুসংস্কারসহ নানা ধরনের সমস্যাও রয়েছে। আইনগত বিধিনিষেধ থাকার পরও দেশে বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রম বন্ধ করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে; না হলে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুরা একদিন দেশের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করা ও ধরে রাখার জন্য সরকার প্রতিবছর ‘উপবৃত্তি’সহ অন্যান্য খাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। পাশাপাশি বিনামূল্যে বই ও খাবার দেয়া হচ্ছে। এরপরও বিভিন্ন পর্যায়ে এত অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন ঝরে পড়ছে, এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নকামী একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে শিক্ষাকে আরও এগিয়ে নেয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। অথচ মাধ্যমিকসহ অন্যান্য পর্যায়ে প্রচুরস্যংক শিক্ষার্থী শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়ছে, যা মেনে নেয়া কষ্টকর। শিক্ষা খাত নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনামূলক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে মোট শ্রমশক্তির সাড়ে ৮৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। মূলত জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরাই এ শ্রমশক্তির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এর পেছনে রয়েছে দারিদ্র্য। দারিদ্র্য দূর করা না গেলে শিক্ষা ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনের স্বপ্ন সুদূরপরাহত থেকে যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাছাড়া স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রেও দরিদ্র ও বিত্তবানদের মধ্যে এখনও বড় ধরনের ফারাক রয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বৈষম্য দূর করার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এ পর্যন্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গবেষণা ও কথাবার্তা কম হয়নি; যার অধিকাংশই অব্যবস্থাপনা, অদূরদর্শিতা, দুর্নীতি ও রাজনীতিকরণের ঘূর্ণাবর্তে ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে। মাধ্যমিকসহ অন্যান্য পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করতে হলে এগুলো সযতেœ পরিহারের পাশাপাশি সরকার এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।
বাজেটে শিক্ষা খাতে ১৫% বরাদ্দের দাবি: টাকার অঙ্কে বাজেটে শিক্ষার বরাদ্দ বাড়লেও শতাংশে বরাদ্দ কমেছে। আর তাই আসন্ন বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। বৃহস্পতিবার (২৮ মার্চ) ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গণসাক্ষরতা অভিযানের উদ্যোগে মালালা ফান্ড ও জিপিই-এর সহযোগিতায় ‘শিক্ষায় ন্যায্যতাভিত্তিক বাজেট: আমাদের প্রত্যাশা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এ দাবি জানানো হয়। প্রসঙ্গত, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় মিলিয়ে ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে প্রস্তাব করা হয়েছিল জাতীয় বাজেটের ১১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তি খাতের বরাদ্দ যোগ করে এই হার দাঁড়িয়েছিল ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আসন্ন ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের বাজেটে দুই মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বরাদ্দ কমপক্ষে ১৫ শতাংশ দাবি করা হয়েছে গণসাক্ষরতা অভিযানের মতবিনিময় সভায়। এডুকেশন ওয়াচের চেয়ারপারসন ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী।বাজেট বিষয়ক আলোচনাপত্র উপস্থাপন করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের উপ-পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। আলোচনাপত্রে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বৃদ্ধি হলেও শতাংশে বরাদ্দ কমেছে। আবার যে অর্থ বরাদ্দ হয় তাও আবার শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। উল্টোদিকে সময়মত অর্থছাড় না হওয়াকেও কেউ কেউ দুষছেন। গত কয়েকদিন আগেও আমরা দেখেছি সংশোধিত বাজেটে শিক্ষা খাত থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা ফেরত নেওয়া হয়েছে। আমাদের দাবি অন্ততপক্ষে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। অর্থ সংস্থানের জন্য প্রয়োজনে এডুকেশন সারচার্জ চালু করা এবং বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সিএসআর ফান্ডের অর্থ ব্যবহার করা যেতে পারে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৯ মার্চ ২০২৪ প্রথম পৃষ্ঠা
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষার মানোন্নয়নে সমন্বিতভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি পেয়েছে, এবার গুণগত মান নিশ্চিতে আমাদের কাজ করতে হবে। সরকার অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে, ভবন দিচ্ছে– এখন শুধু সমন্বয় করে বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাস্তবায়নের দায়িত্বে যারা আছেন তাদের অদক্ষতার জন্য যদি টাকা ফেরত যায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। শিক্ষকতায় তরুণদের আকর্ষিত করতে হলে সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিসহ প্রশিক্ষণ, চাকরির পরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে নইলে তারা অন্য পেশায় চলে যাবেন। শিক্ষা আইনের খসড়া কেন আলোর মুখ দেখছে না এ ব্যাপারে আমি উদ্যোগ নেবো। উপবৃত্তির অর্থবৃদ্ধির দাবিও যৌক্তিক। আমি এর সঙ্গে একমত এবং এই সুপারিশটিও যথাযথ জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবো। এসব ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দৃষ্টি দেওয়ার আহŸান জানাচ্ছি।
ইউডি/এজেএস

