খাদ্যে ভেজাল: মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের রুখবে কে?

খাদ্যে ভেজাল: মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের রুখবে কে?

উত্তরদক্ষি । সোমবার, ০৩ জুন, ২০২৪, আপডেট ১৭:১০

ভেজাল খাদ্যে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। কিন্তু ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। মো. শহীদ রানা’র প্রতিবেদন

রোগাক্রান্ত হচ্ছে পুরো জাতি : ভেজালমিশ্রিত খাদ্য মানুষের স্বাস্থ্যহানির বড় কারণ। অথচ দেশে বিশুদ্ধ খাবার খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজার থেকে কেনা কোনো খাদ্যই যেন আর বিশুদ্ধ নেই। বিভিন্ন গবেষণায় দেশের অনিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। পোলট্রি ফার্মের ডিমে ট্যানারি বর্জ্যের বিষাক্ত ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। আটায় মেশানো হচ্ছে চক পাউডার বা ক্যালসিয়াম কার্বনেট। আনারসে হরমোন প্রয়োগ করে দ্রুত বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলে আসছে বহুকাল ধরে। আম গাছে মুকুল ধরা থেকে শুরু করে আম পাকা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে রাসায়নিক ব্যবহার এখন ওপেন সিক্রেট। মিষ্টিজাতীয় খাবারে ব্যবহার করা হয় বিষাক্ত রং, সোডা, স্যাকারিন ও মোম। কাপড়ের বিষাক্ত রং, ইট ও কাঠের গুঁড়া মেশানো হয় খাবারের মশলায়।

তেল, আটা, চিনি, কেক, বিস্কুট কিছুই আজ ভেজালমুক্ত নয়। বাজারের ৮৫ শতাংশ মাছে ফরমালিন মিশিয়ে পচন রোধ করা হয়। শাক-সবজিতে বিষাক্ত স্প্রে, সব ধরনের ফলমূল দ্রুত পাকিয়ে রঙিন বানাতে সর্বত্র কার্বাইড, ইথোফেন, আর পচন রোধে ফরমালিন প্রয়োগ করা হচ্ছে। নকল ও ভেজাল ওষুধে ছেয়ে গেছে বাজার। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেয়া এবং ভেজাল খাদ্য বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ১৪ বছরের কারাদণ্ডেরও বিধান রয়েছে এ আইনে। ২০১৫ সালে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। মাঝে মধ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হলেও ভেজালকারী চক্রকে দমন করা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে ভেজালবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। এ ব্যাপারে প্রভাবশালী কাউকে ছাড় দেয়া যাবে না। ভেজালের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি। ভেজাল প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে অতি মুনাফালোভী, অসাধু খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে পারলে এ ক্ষেত্রে সুফল মিলতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ৬০ কোটি মানুষ ভেজাল ও দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এরমধ্যে মারা যায় ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষ। এ ছাড়া দূষিত খাদ্য গ্রহণজনিত কারণে ৫ বছরের কম বয়সের আক্রান্ত হওয়া ৪৩ শতাংশ শিশুর মধ্যে মৃত্যুবরণ করে ১ লাখ ২৫ হাজার। উন্নত দেশগুলোতে নিরাপদ খাদ্যপণ্য নিশ্চিত করতে কঠোর আইনের পাশাপাশি তা বাস্তবায়ন করা হয়। খাদ্যে ভেজাল দেওয়াকে মানুষ হত্যার কাছাকাছি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় ওই সব দেশে। অথচ, দেশে ভেজাল খাদ্য ও সকল পণ্য দিয়ে মানুষকে ক্রমেই মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যেই ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে সচেতনতার সঙ্গে সঙ্গে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কেননা, ভেজাল খাদ্যে পুরো জাতিকে রোগাক্রান্ত বানানোর প্রক্রিয়া চলছে।

এ এইচ এম সফিকুজ্জামান

দেশে সব পণ্যই নকল হচ্ছে, বলছে ভোক্তা অধিদফতর: ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেছেন, এমন কোনো পণ্য নেই; যা বাংলাদেশে নকল হয় না। কসমেটিকস থেকে শুরু করে শিশুখাদ্য, সবকিছুর নকল হচ্ছে। দেশের ভেতরেই হচ্ছে এগুলো। তিনি জনসাধারণের কাছে আহ্বান জানিয়ে বলেন, এসব তথ্যগুলো আমাদের কাছে দেন, আমরা ব্যবস্থা নেব। রবিবার (০২ জুন) সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরীর সভাপতিত্বে ভোক্তা অধিকার আইন ও সংরক্ষণ বিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মহাপরিচালক বলেন, দেশে তৈরি এসব নকল পণ্যের তথ্য সারাবিশ্বে ছড়িয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের মানুষের কাছে বার্তা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ভেজাল পণ্য তৈরি হয়। আমাদের সব অর্জন ম্লান হচ্ছে এই ভেজালের কারণে। এর আগে সম্প্রতি তিনি বলেছেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স ও পণ্যের মাননিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই’র অনুমোদন ব্যতিত যে সকল প্রতিষ্ঠান খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন করছে, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। এ জন্য সারা দেশে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ভোক্তাদের সঙ্গে যারা প্রতারণা করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এগুলো শক্তভাবে দেখা হচ্ছে।

এক বছরে মানহীন খাদ্য বাড়ল ১১৮টি, জানাচ্ছে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট: সরকারি সংস্থা জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০২৩ সালের এক নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন বলছে, ২০২২ সালের চেয়ে ২০২৩ সালে দেশে মানহীন খাবারের হার অনেকটাই বেড়েছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মানহীন খাদ্য বেড়েছে ১১৮টি। ২০২২ সালের ল্যাব পরীক্ষার ফলে যেখানে ৮১টি খাদ্যপণ্যের নমুনায় ভেজাল মেলে, সেখানে ২০২৩ সালের পরীক্ষায় সেটি বেড়ে হয়েছে ১৯৯টি। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালে সারা দেশ থেকে ১ হাজার ৩৯৮টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে থেকে ১ হাজার ৮২টি নমুনা পরীক্ষা করে দেখা হয়।

প্রতিষ্ঠানটির নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ ভেজাল রয়েছে ঘি’তে। অবশ্য গত বছর সবচেয়ে বেশি ৭৫ শতাংশ ভেজাল মিলেছিল সব ধরনের মিষ্টিতে। যেমন-চমচম, কালোজাম এবং রসগোল্লায় মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর নানা উপকরণ মিলেছিল। এ বছর মিষ্টিতে ভেজাল মিলেছে ১৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যপণ্য চালেও ভেজাল মিলেছে ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভেজালের ভিড়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে ঘি ও মিষ্টিজাতীয় পণ্য। যেমন চমচম, রসগোল্লা, কালোজাম, দই, ঘি, গুড়, মধু। আবার তিন বেলা যেসব খাদ্য খায় মানুষ তার অনেক উপকরণেও ভেজাল রয়েছে। যেমন গম, আটা, ডাল, আটা, লবণ, সয়াবিন তেল, হলুদ, মরিচ। এমনকি শিশুখাদ্যও রেহাই পাচ্ছে না ভেজালকারীদের হাত থেকে। শিশুখাদ্য গুঁড়া দুধেও মেশানো হয় নানারকম বিষাক্ত কেমিক্যাল।

ভেজালের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মসলাজাতীয় পণ্য গুঁড়া মরিচ। এতে ভেজালের হার ৪৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ। ভেজালের দিক দিয়ে এরপরই আছে গুড়। এতে ভেজাল ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। এরপর রয়েছে গুঁড়া হলুদ ৩৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ, নারিকেল তেল/অলিভ অয়েল ২০ দশমিক ৬০ শতাংশ, মিষ্টি, চমচম, কালোজাম, রসগোল্লায় ১৮ দশমিক ১৮ শতাংশ, বেসনে ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ধনিয়া গুঁড়ায় ১৬ দশমিক ১৩ শতাংশ, ব্রেড/পাউরুটিতে ১৫ দশমিক ৯২ শতাংশ, সয়াবিন তেলে ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ, লবণে ১০ দশমিক ৩৩ শতাংশ, ডাল/ছোলায় ৮ দশমিক ১১ শতাংশ, চিনিতে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ, চালে ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং সরিষার তেলে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ ভেজাল রয়েছে।

ছয় মাস থেকে ৫ বছরের জেল : ভেজাল খাদ্য বা নকল পণ্য প্রতিরোধে দেশে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ নামে একটি আইন আছে। এই আইনে বিষাক্ত দ্রব্যের ব্যবহার, তেজস্ক্রিয়, ভারী ধাতু ইত্যাদির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, ভেজাল খাদ্য বা খাদ্যোপকরণ উৎপাদন, আমদানি, বিপণনসহ নিম্নমানের খাদ্য উৎপাদন, খাদ্য সংযোজন দ্রব্য বা প্রক্রিয়াকরণ সহায়ক দ্রব্যের ব্যবহার, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত তেল, বর্জ্য, ভেজাল বা দূষণকারী দ্রব্য ইত্যাদি খাদ্য স্থাপনায় রাখা, মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণ, বৃদ্ধি প্রবর্ধক, কীটনাশক, বালাইনাশক বা ওষুধের অবশিষ্টাংশ, অণুজীব ইত্যাদির ব্যবহার, বংশগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনকৃত খাদ্য, জৈব খাদ্য, ব্যাবহারিক খাদ্য, স্বত্বাধিকারী খাদ্য ইত্যাদি খাদ্য মোড়কীকরণ ও লেবেলিং, মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিবেচিত প্রক্রিয়ায় খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, বিক্রয়, রোগাক্রান্ত বা পচা মৎস্য, মাংস, দুগ্ধ বিক্রয়, হোটেল-রেস্তোরাঁ বা ভোজনস্থলের পরিবেশনসেবা, ছোঁয়াচে ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তির দ্বারা খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত, নকল খাদ্য উৎপাদন, বিক্রয়, সংশ্লিষ্ট পক্ষগণের নাম, ঠিকানা ও রসিদ বা চালান সংরক্ষণ ও প্রদর্শন, অনিবন্ধিত অবস্থায় খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, বিক্রয় ইত্যাদি বিজ্ঞাপনে অসত্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, মিথ্যা বিজ্ঞাপন প্রস্তুত, মুদ্রণ বা প্রচারসংক্রান্ত বিধিনিষেধের সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে।

পাশাপাশি এ আইনের ব্যত্যয় হলে শাস্তির বিধিবিধানও আছে। প্রসঙ্গত, এই আইনের অধীন জারি করা পরোয়ানা তল্লাশি, গ্রেফতার ও আটকের বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান প্রযোজ্য হয়। এখানে দ্রæত বিচারের ব্যবস্থাও রয়েছে। ন্যূনতম ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং ন্যূনতম ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে এই আইনে। আর অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে অপরাধীকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে নিরাপদ খাদ্য আদালত। যদিও এই আইনের খসড়ায় প্রথমবার কেউ অপরাধ করলে সাত বছর এবং দ্বিতীয়বার ধরা পড়লে ১৪ বছরের কারাদণ্ডের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল।

সব অঙ্গের ক্ষতি : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যপণ্যে অনেক রকম বিষাক্ত উপাদান মিশিয়ে খাদ্যপণ্যটিকে ভেজাল বানানো হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে টেক্সটাইল কেমিক্যাল ও টেক্সটাইল রং। এ ছাড়া ইউরিয়া, হাইড্রোজ, কার্বাইড, ফরমালিন ও প্যারাথিয়ন মেশানো হয় বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে। বেকারি কারখানায় উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্য সতেজ রাখতে মেশানো হয় ফ্যাটি অ্যাসিড, ইমিউসাইল্টিং টেক্সটাইল রং। এ ছাড়া এসব পণ্যে নিম্নমানের আটা, পচা ডালডা, তেল ও ডিমের ব্যবহার করা হয়। মসলায় মেশানো হয় কাপড়ের বিষাক্ত রং, দুর্গন্ধযুক্ত পটকা মরিচের গুঁড়া, ধানের তুষ, ইট, কাঠের গুঁড়া, মটর ডাল ও নিম্নমানের সুজি। দীর্ঘ সময় সতেজ রাখার জন্য দুধে মেশানো হয় ফরমালিন। এ ছাড়া পানি গরম করে তাতে অ্যারারুট মিশিয়ে তৈরি করা হয় নকল দুুধ। শুধু তাই নয়, নকল দুধ তৈরিতে ছানার ফেলনা পানি, ময়লাযুক্ত পানি, থাইসোডা, পার-অক্সাইড, ময়দা, ভাতের মাড় ও চিনি মেশানো হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেক্সটাইল রং ও কেমিক্যাল খাদ্য বা পানীয়ের সঙ্গে মিশে মানব শরীরে প্রবেশের পর এমন কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেই যার ক্ষতি করে না।

কমে গেছে গড় আয়ু : ভেজাল খাদ্যের কারণে কারণে ক্যানসার, লিভার সিরোসিসসহ নানা রকম অসংক্রামক রোগে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের ১৬ ভাগ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত; যার মূল কারণ রাসায়নিক পদার্থমিশ্রিত খাদ্যগ্রহণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস প্রতিবেদন- ২০২৩ বলছে, দেশে শিশুমৃত্যুর হার বেড়েছে এবং কমেছে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু। এই পরিস্থিতির পেছনে ভেজাল খাদ্যেরও দায় অনেক। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের এক গবেষণা তথ্যে দেখা যায়, কেবল ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয় ১ লাখ ৫০ হাজার। কিডনি রোগে আক্রান্ত হয় ২ লাখের ওপর মানুষ। এ ছাড়া অন্তঃসত্ত¡া মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ।

বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম বেড়েছে: নানা ধরনের বিষাক্ত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রস্তুতকৃত নিম্নমানের শিশু খাদ্য গ্রহণ করে আগামী প্রজন্ম বিভিন্ন গুরুতর অসুখের ঝুঁকি নিয়ে বড় হচ্ছে। কিংবা কেউ কেউ শিশুকালেই আক্রান্ত হচ্ছে জটিল কোনো রোগে। ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্যে সব সময়ই শিশুর মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে। গর্ভবতী নারীরা জন্ম দিতে পারে বিকলাঙ্গ শিশু, গর্ভস্থ শিশু প্রতিবন্ধী হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এসব খাবার খাওয়ার ফলে বয়স্ক ও শিশুদের মধ্যে ক্যানসারসহ জটিল রোগের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কিছু খাবার এমনই বিষাক্ত যে তা ডিএনএকে পর্যন্ত বদলে দিতে পারে। কিডনি ফাউন্ডেশনের এক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৬ ভাগ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। আর এই রোগ হচ্ছে রাসায়নিক পদার্থমিশ্রিত খাদ্য গ্রহণের ফলেই। প্রতি মাসে ক্যানসার, কিডনি ও লিভার রোগী দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। দীর্ঘদিন বিষাক্ত খাদ্যগ্রহণের ফলে গর্ভবতী মা ও তার পেটের ভ্রƒণের ক্ষতি হয়, সন্তানও ক্যানসার, কিডনিসহ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্ন ও প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হচ্ছে। খাদ্যের সঙ্গে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ গ্রহণের পর নিঃশেষ না হয়ে দেহের ভেতর দীর্ঘদিন জমা থাকে। ফলে এই বিষক্রিয়া বংশ থেকে বংশে স্থানান্তর হয়।

সাম্প্রতিক ভোক্তা অধিকারের জরিপে দেখা যায়, শিশুদের কোমল পানীয়, জুস, আইসক্রিম প্রভৃতি তৈরিতে নানান ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হচ্ছে; যা অনেক ভীতিকর। এজন্য খাদ্যদ্রব্যের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্তকতা বাড়াতে হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার মেম্বার-চেয়ারম্যানদের তৎপরতা ও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। ভেজাল খাদ্যপণ্য বিক্রি ও তৈরির কোনো কারখানা দেখলে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবগত করতে হবে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৩ জুন ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

বিশেষজ্ঞরা যে আহ্বান জানান : ভেজাল খাদ্য ও নকল পণ্য প্রতিরোধে জরুরী ভিত্তিতে ভেজাল রোধে উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (পুলিশ), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, খাদ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করে রুটিন মাফিক তদারকি ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি ফরমালিনসহ রাসায়নিক দ্রব্যাদি, কীটনাশক, ভেজাল মিশ্রণ আমদানিকারক, বিক্রেতা ও ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করতে হবে। এসব পণ্যের বাজার মনিটরিং করতে হবে। পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদন, প্রস্তুত, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত মানুষদের মধ্যে এমন অপরাধপ্রবণতা কীভাবে এত প্রকট হলো, সে বিষয়ে সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীদের অনুসন্ধান ও সঠিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভেজাল প্রতিরোধে কঠোরতার অভাবে ভেজাল ক্রমে সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে। খাদ্যে ভেজাল রোধে আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব সরকারের। সাধারণ মানুষের পক্ষে ভেজাল খাদ্য চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব কাজ। তারা বলছেন, তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকেই তা করতে হবে। প্রয়োজনে খাদ্যমান নিশ্চিতকরণ এবং ভেজাল নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি তাদের কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান নিয়মিত করতে হবে এবং বাড়াতে হবে আদালতের সংখ্যা। খাদ্যে ভেজালের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এর পাশাপাশি সৃষ্টি করতে হবে গণসচেতনতা। তবেই এ প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে।ভেজাল বা নকল খাদ্যপণ্য ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইন এবং সচেতনতা- দুটোই একসঙ্গে প্রয়োজন। আইনের কাজ হলো খুব দ্রুততার সঙ্গে এসব ভেজাল পণ্য চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের শাস্তি এমন হতে হবে; যাতে অন্য ব্যবসায়ীরা এই কাজ করতে সাহস না পায়। অন্যকে যারা বিষ খাইয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে তারা কেন কঠিনতম শাস্তির হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সরকার আরও কঠোর হচ্ছে। খাদ্যে ভেজাল, নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য বিক্রিতে জারি হচ্ছে কঠোর বিধিনিষেধ। এজন্য প্রণীত নিরাপদ খাদ্য আইনের কঠোর বাস্তবায়নে প্রণয়ন করা হয়েছে নিরাপদ খাদ্য প্রবিধিমালা। নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস এখন সময়ের দাবি।

ইউডি/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading