প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে নতুন শিক্ষাক্রম: অ্যাসাইনমেন্ট নির্ভরতা ও ডিভাইসে আসক্তি; বিতর্ক কিছুতেই থামছে না
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ১১ জুন, ২০২৪, আপডেট ১৬:৩০
নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে আন্দোলনরত অভিভাবকদের দাবি শিক্ষার্থীরা কিছুই শিখছে না। মন্ত্রণালয় বলছে, মুখস্ত নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার পদক্ষেপ। সিরাজুল ইসলাম’র প্রতিবেদন
গতানুগতিক ধারা বদল; আলোচনা-সমালোচনা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের তিন শ্রেণির পর আরও চার শ্রেণিকে নতুন শিক্ষাক্রমের আওতায় নিয়ে আসার পর বিতর্ক যেন থামছেই না। রাস্তায় কর্মসূচি পালন ছাড়াও এর বিরোধীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন শিক্ষাক্রমের কাঁটাছেড়া করছেন। নানামুখী ট্রলের মুখে ‘অপপ্রচার ঠেকাতে’ আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করে কর্তৃপক্ষকে বিজ্ঞপ্তি দিতে হচ্ছে। নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে সা¤প্রতিক তৎপরতাকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার’ হিসেবে দেখছেন সরকারের কর্মকর্তারা। নতুন শিক্ষাক্রমের সমালোচনাকারীরা দাবি করছেন, এর মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার চাপ কমিয়ে নতুন প্রজন্মকে পাঠবিমুখ করে ‘গুরুত্বহীন বিষয়ে’ ব্যস্ত রাখা হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, পরীক্ষা ও মুখস্ত নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শেখার মাধ্যমে নতুন শিক্ষাক্রমে পাঠ প্রক্রিয়া হয়েছে আনন্দময়। সবচেয়ে বেশি বিতর্ক চলছে ফেইসবুক-ইউটিউবে। এসব কর্মকাÐকে ‘অপপ্রচার’ হিসেবে বর্ণনা করে তা ঠেকাতে মামলাও করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড- এনসিটিবি। দেশে গত বছর (২০২৩ সাল) থেকেই নতুন শিক্ষাক্রম শুরু হয়। বর্তমানে প্রাথমিকে প্রথম থেকে তৃতীয় এবং ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীরা নতুন শিক্ষাক্রমে অধ্যয়ন করছে। পর্যায়ক্রমে ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণিতে চালু হবে নতুন শিক্ষাক্রম। গত বছর প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা হয়। আর চলতি বছর বাস্তবায়ন করা হয় দ্বিতীয়, তৃতীয়, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে। এরপর ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণিতে, ২০২৬ সালে একাদশ এবং ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণিতে এই শিক্ষাক্রম চালু হবে।
পরিবর্তন কোথায়, গুরুত্ব কীসে: বাংলাদেশে এতদিন যে শিক্ষাক্রম চালু ছিল, মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সেটিতে পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু নতুন শিক্ষাক্রমে সেই জায়গা থেকে সরে আসা হয়েছে। এখন পরীক্ষার চেয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর শিখনকালীন মূল্যায়ন বা ধারাবাহিক মূল্যায়নকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক স্তর, অর্থাৎ নার্সারি ও প্লে-তে শিশুদের জন্য এখন আর কোনও বই থাকবে না। শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষকরাই তাদেরকে সরাসরি শেখাবেন। এরপর প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত তাদেরকে মাত্র তিনটি বই পড়ানো হবে। তবে কোনও পরীক্ষা নেওয়া হবে না। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে বছরব্যাপী চলা বিভিন্ন শিখন কার্যক্রমের ভিত্তিতে। পরবর্তী শ্রেণিগুলোর মূল্যায়ন পদ্ধতিতে অবশ্য পরীক্ষা ও ধারাবাহিক শিখন কার্যক্রম – দুটোই থাকছে। এক্ষেত্রে শ্রেণিভেদে ত্রিশ থেকে ষাট ভাগ পর্যন্ত মূল্যায়নই করা হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিখনকালীন সময়ে। বাকিটা আগের মতোই পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে। শিখনকালীন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগের দক্ষতা, উপস্থাপন, ক্লাস অ্যাসাইনমেন্ট বা বাড়ির কাজসহ বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার কর হবে। নতুন শিক্ষাক্রমে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট দশটি বিষয়ে পড়ানো হবে। বিষয়গুলো হচ্ছে- ভাষা ও যোগাযোগ, গণিত ও যুক্তি, বিজ্ঞান ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, জীবন ও জীবিকা, সমাজ ও বিশ্ব নাগরিকত্ব, পরিবেশ ও জলবায়ু, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। এর মধ্যে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান এবং সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে ৬৫ শতাংশ।

অভিভাবকরা যা বলছেন: নতুন যে শিক্ষাক্রম চালু করা হয়েছে তা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মেধা ও নৈতিকতা ধ্বংসকারী হিসেবে উল্লেখ করে বাতিলের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা। শিক্ষাক্রম-২০২১ বাতিল, সন্তানদের সার্বিক শিক্ষা জীবন নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের নামে মিথ্যা মামলা ও হয়রানির প্রতিবাদে আয়োজিত এক মানববন্ধনে এ দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা। সোমবার (১০ জুন) ভিকারুননিসা নুন স্কুলের সামনে এ মানববন্ধনের আয়োজন করেন অভিভাবকরা। মানববন্ধনে শিক্ষা নিয়ে পুতুল খেলা চলবে না, আমাদের শিশুরা পুতুল না; রাষ্ট্রে শিক্ষা ব্যবস্থা দেশ-বিদেশি এজেন্সি দাস হতে পারে না; শিক্ষা পুতুল খেলা না, আমাদের বাচ্চারা পুতুল নয়; রাত জেগে অ্যাসাইনমেন্ট নাকি ডিভাইসে আসক্তি? সন্তানদের শিক্ষা নিয়ে অভিভাবকরা কথা বলবে না তো কে বলবে? আমরা সন্তানদের শিক্ষা ধ্বংস চক্রান্ত রাখবো, ভুলে ভরা পাঠ্যপুস্তক থেকে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে? প্রজেক্ট অ্যাসাইনমেন্টের নামে শিক্ষা ব্যয় বাড়ছে-সহ বিভিন্ন দাবি সম্বলিত ব্যানার-প্ল্যাকার্ড নিয়ে মানববন্ধনে অংশ নেন তারা। অভিভাবকদেও ভাষ্য, নতুন যে শিক্ষাক্রম চালু হয়েছে সেটি ক্ষতিকর। এই নতুন শিক্ষাক্রম অ্যাসাইনেমন্ট নির্ভর। শিশু শিক্ষার্থীরা বেসিক কিছু শিখছে না। কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন নেই। অভিভাবকদের দাবি, নতুন শিক্ষাক্রম সম্পর্কে আমাদের কোনো পূর্ব ধারণা নেই। মাউশি কোনো গাইডলাইন দেয়নি। মৌলিক শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থীরা সরে গেছে বিষয়টা এরকম নয় কারিকুলামে তাদেরকে এ ধরনের কোনো শিক্ষাই দেওয়া হচ্ছে না তাহলে বাচ্চারা কি শিখছে? অবিলম্বে নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল করে সংশোধন বিয়োজনে যুগোপযোগী করার দাবি জানান তিনি।
অভিভাবকরা জানান, শিক্ষা কারিকুলাম চালুর পর বাচ্চারা ডিভাইস নির্ভর হয়ে পড়েছে। নতুন অ্যাসাইনমেন্ট করার নামে মোবাইল ব্যবহার করছে গেম খেলছে, লাভ রিলেশনে জড়াচ্ছে। এর দায়ভার কে নেবে? নতুন করে কি কারিকুলাম চালু হবে জানা নেই। এই কারনে অধিকাংশ অভিভাবকদের দাবি এই নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল করতে হবে। তারা বলছেন, আমার সন্তান শুধু আমার ভবিষ্যৎ নয় দেশের ভবিষ্যৎ। সে কোনোভাবেই এই বয়সে মোবাইল নির্ভর হতে পারে না। নারী মুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত বলেন, যেটা চাচ্ছি না, যেটা যাচ্ছে না, যেটা হচ্ছে না, সেটা কেন আমরা মেনে চলব। তিনি বলেন, আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে এখানে আসিনি। আমরা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এখানে এসেছি। নতুন শিক্ষাক্রম চালু করার মধ্য দিয়ে শিক্ষার যে ব্যয় সেটা অভিভাবকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন শিক্ষাকারিকুলামে বিজ্ঞান অঙ্কের যে গুরুত্ব সেটা কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে এখনকার শিক্ষার্থীদেরকে অতীতের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তাদের অনেকে বোঝা হিসেবে উল্লেখ করতে পারেন। কিন্তু নতুন শিক্ষাকারিকুলামে ৯৫ জন শিক্ষার্থীকেই শিক্ষককে নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। নতুন শিক্ষাকারিকুলাম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের যে মেধা যে চরিত্র সেটা সঠিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। যা পড়ানো হচ্ছে শেখানো হচ্ছে তা অভিভাবকদের বোধগম্য নয়। অভিভাবকরা উৎকণ্ঠিত যে তাদের কোমলমতি শিশুরা ডিভাইসমুখী হয়ে পড়ছে। এই অবস্থার উত্তরণে অবশ্যই নতুন শিক্ষাকারী গোলাম চালু করতে হবে এই বিদ্যমান শিক্ষা কারিকুলাম বাতিল করতে হবে।

মহিবুল হাসান চৌধুরী
মূলনীতি হলো নলেজ ভ্যালুজ ও স্কিলস: বর্তমান শিক্ষাক্রমে মূলনীতি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেছেন, নলেজ, ভ্যালুজ ও স্কিলস-এই তিনটির সমন্বয়ে হবে আমাদের শিক্ষা। সা¤প্রদায়িকতামুক্ত, সমতা, জাতীয়তাবোধ, কর্মমুখী শিক্ষা, দক্ষতা ইত্যাদি মূল্যবোধ আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, নলেজ দেওয়ার জায়গায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, মূল্যবোধের জায়গায়ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এক্সেস ও ইকুইটি (সমতা) নিশ্চিত করতে হবে। প্রক্রিয়াগত কারণে অথবা অর্থের অভাবে যেন কোনো শিক্ষার্থী ঝরে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য স্মার্ট প্রজন্ম গড়তে শিক্ষায় যে রূপান্তরের কাজ চলছে, তার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত কম খরচে দেশের সব শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। বর্তমান কারিকুলামের শিখনপদ্বতি ভিন্ন। গতানুগতিক শিক্ষার ধারণা থেকে এ পদ্ধতি ভিন্ন। এটা অভিজ্ঞতানির্ভর। গতানুগতিক শিক্ষাকে যেভাবে দেখা হয়, শুধু কিছু তথ্য আমরা মুখস্ত করব, মেমোরি ড্রাইভেন প্রসেস; সেখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মুখস্তনির্ভর শিক্ষা ও স্মরণশক্তিকে মেধা বলে চালিয়ে দেওয়ার যে মানসিকতা, সেখান থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে আমরা স্মার্ট প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারব না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য উদ্ধৃত করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের বিশাল একটি অংশ যদি খুব কম বয়সে ঝরে পড়ে, তাহলে তো আমরা স্মার্ট প্রজন্ম তৈরি করতে পারব না। সে লক্ষ্যে আমরা অনেক উদ্যোগ নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাসহায়তা ট্রাস্টের মাধ্যমে বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে, যাতে করে শিক্ষার্থীরা অর্থের অভাবে ঝরে না পড়ে। মূল্যায়ন নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, যে প্রক্রিয়ায় আমরা মূল্যায়ন করছিলাম, সেটিও একটি চ্যালেঞ্জ।
মূল্যায়নের কারণে ও আর্থিক কারণে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। শিক্ষার সঙ্গে শিল্প ও অর্থনীতির সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার থেকে বলছি, উন্নয়ন হয়েছে দৃশ্যমান, এবার হবে কর্মসংস্থান। এডুকেশনের সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রি ও ইকোনমির মাধ্যমে আমরা এমপ্লয়মেন্টের দিকে যাব। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমান শিক্ষার্থীরা কীভাবে কর্মজীবনে সফলতা পাবে, কীভাবে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়বে, কীভাবে তারা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবে, এই বিষয়ে অ্যালামনাইদের একটা গুরু দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষার্থীদের সফট স্কিল নেয়ার ক্ষেত্রে নানাভাবে উৎসাহিত করতে হবে, যোগাযোগ সক্ষমতায় উন্নত করতে হবে।তিনি বলেন, অল্প সংখ্যক সরকারি চাকরির যে হাতছানি, সেটার দিকে শিক্ষার্থীদের তাকিয়ে থাকার যে মানসিকতা সৃষ্টি হয়েছে, এটা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ট্রলিং হচ্ছে।
মূল্যায়ন যেভাবে হতে যাচ্ছে: নতুন শিক্ষাক্রমে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা ও পারদর্শিতার পাশাপাশি আচরণগত দিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্বাভাবিক মূল্যায়নের মতো এ মূল্যায়নেও সাতটি স্তর বা সূচক থাকবে। রিপোর্ট কার্ডে ‘আচরণিক ক্ষেত্র’ নামে আলাদা একটি ছক থাকবে। বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে এই মূল্যায়ন করবেন শিক্ষকেরা। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) তৈরি করা ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২২ এর মূল্যায়ন কৌশল ও বাস্তবায়ন নির্দেশনা’ সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। সব প্রক্রিয়া শেষে এনসিসিসি সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। সেখানে চূড়ান্ত হলে সবাইকে তা জানিয়ে দেওয়া হবে।
এনসিটিবির প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, আচরণিক নির্দেশকগুলোতে শিক্ষার্থীর অর্জনের মাত্রা বছরে দুবার শিক্ষকেরা ‘নৈপুণ্য অ্যাপ’-এর মাধ্যমে ইনপুট দেবেন। এর মধ্যে একবার ষাণ¥াসিক মূল্যায়নের সময়, আরেকবার বার্ষিক সামষ্টিক মূল্যায়নের সময়। এরপর শিক্ষার্থীর ১০টি বিষয়ের আচরণিক নির্দেশকের অর্জিত মাত্রা সমন্বয় করে চূড়ান্ত ট্রান্সক্রিপ্ট এবং রিপোর্ট কার্ড নৈপুণ্য অ্যাপের মাধ্যমে প্রণয়ন করা হবে।
প্রতিটি বিষয়ে নির্ধারিত পারদর্শিতার (নৈপুণ্য) ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর অর্জন সাতটি স্কেল বা সূচকে মূল্যায়নের পর রিপোর্ট কার্ডে প্রকাশ করা হবে। সাতটি স্কেলের জন্য থাকবে সাতটি ছক। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক-সবাই শিক্ষার্থীর অবস্থান বুঝতে পারবেন। সাতটি স্কেল হলো অনন্য, অর্জনমুখী, অগ্রগামী, সক্রিয়, অনুসন্ধানী, বিকাশমান ও প্রারম্ভিক। সর্বোচ্চ স্কেল ‘অনন্য’ বলতে বোঝানো হবে, শিক্ষার্থী সব বিষয়ে পারদর্শিতার চূড়ান্ত স্তর অর্জন করেছে। আর ‘প্রারম্ভিক’ স্তর হলো সবচেয়ে নিচের স্তর। প্রতি শ্রেণির (ষষ্ঠ থেকে দশম) লিখিত মূল্যায়নে ওয়েটেজ ৬৫ শতাংশ এবং কার্যক্রমভিত্তিক মূল্যায়নে ৩৫ শতাংশ ওয়েটেজ থাকবে। এখানে কার্যক্রম বলতে বোঝানো হচ্ছে, অ্যাসাইনমেন্ট করা, উপস্থাপন, অনুসন্ধান, প্রদর্শন, সমস্যার সমাধান করা, পরিকল্পনা প্রণয়ন ইত্যাদি। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির মূল্যায়ন হবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, আর দশম শ্রেণি শেষে পাবলিক (এসএসসি) পরীক্ষা বা মূল্যায়ন শিক্ষা বোর্ডের তত্ত¡াবধানে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি বিষয়ে ষাণ্মাসিক, বার্ষিক মূল্যায়ন এবং পাবলিক মূল্যায়নের নির্ধারিত সময়সীমা হবে এক কর্মদিবসে সর্বোচ্চ ৫ ঘণ্টা।
নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী অনুষ্ঠিত মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অনুত্তীর্ণ হলেও শিক্ষার্থী শর্ত সাপেক্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারবে। তবে শিক্ষার্থীকে পরের দুই বছরের মধ্যে পাবলিক মূল্যায়নে অংশগ্রহণ করে অনুত্তীর্ণ বিষয়গুলোতে উত্তীর্ণ হতে হবে। এছাড়া একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েও কোন শিক্ষার্থী মান উন্নয়নের জন্য এক বা একাধিক বিষয়ে পাবলিক মূল্যায়নে (এসএসসি) অংশ নিতে পারবে।
তবে কোনো শিক্ষার্থী পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তরণের জন্য বিবেচিত না হলেও সব শিক্ষার্থী বছর শেষে পারদর্শিতার ভিত্তিতে ট্রান্সক্রিপ্ট পাবে। একই সঙ্গে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির রিপোর্ট কার্ডশিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকের মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকবে।ষাণ¥াসিক ও বার্ষিক মূল্যায়নের জন্য খাতা এবং বিষয়ের চাহিদা অনুযায়ী পরীক্ষণ, মডেল তৈরি, নকশা, গ্রাফ ইত্যাদির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর দশম শ্রেণির পাঠ শেষে যে পাবলিক পরীক্ষা (এসএসসি) অনুষ্ঠিত হবে, তার উপকরণ সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাকেন্দ্রে থাকবে।
শিক্ষাবিদদের যত পরামর্শ: শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ মনে করছেন নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল, সেটি না নিয়েই কাজ শুরু করেছে সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক মো. মজিবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের জায়গায় অনেক দুর্বলতা রয়ে গেছে। এ অবস্থায় নতুন শিক্ষাক্রমটি কতটা কাজে দিবে, সেটি নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এ ধরনের একটি উদ্যোগ গ্রহণের আগে প্রয়োজনীয় গবেষণার পাশাপাশি এর সাথে জড়িত প্রতিটি অংশীদারের সাথে আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শ করা উচিত ছিল বলে মনে করেন তিনি।
অভিভাবক এবং শিক্ষকরা এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় দুই অংশীদার। কিন্তু শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের আগে তাদের সাথে কি বসা হয়েছে? বসা হলে কয়জনের সাথে আলাপ-আলোচনা বা পরামর্শ করা হয়েছে? তাদের সাথে আলোচনা করে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়ন করা হলে এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না বলে আমি মনে করি। অনেকেই মনে করেন, নতুন শিক্ষাক্রমের আওতায় হরিণের পিঠে গাধার বোঝা চাপানোর মতো কাÐ করা হয়েছে। নতুন পদ্ধতির মূল্যায়নে তিনটি চিহ্ন দিয়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থান নির্ণয় করা হবে। যেমন ত্রিভুজ চিহ্ন দিয়ে বোঝানো হবে শিক্ষার্থী ‘দক্ষ’। বৃত্ত দিয়ে বোঝানো হবে অগ্রগামী বা মাঝারি এবং চতুর্ভুজ দিয়ে বোঝা যাবে পারদর্শিতার ‘প্রারম্ভিক স্তর’। একেকটি ক্লাসে এখনকার মতো বিপুল শিক্ষার্থী নিয়ে সঠিকভাবে শেখানো কঠিন। প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে অতিরিক্ত হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীরা কোথায় যাবে? আরও প্রশ্ন আছে, শিক্ষকদের দ্বারা মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও। নতুন নিয়মে শিক্ষকদের এখতিয়ার ও খবরদারি বাড়বে। ফলে তাদের হাতে শিক্ষার্থীরা অধিক মাত্রায় জিম্মি হয়ে পড়বে। তবে অনেকেই বলছেন, নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখা সত্যিই অনেক সম্ভাবনাময়। আধুনিক বিশ্বের শিক্ষা কখনোই চার দেয়ালে আবদ্ধ থাকা, শ্রেণিতে শিক্ষকের বর্ণিত বুলি গলাধঃকরণ ও পরীক্ষার খাতায় সেই বুলি উদগীরণের মাধ্যমে একটা সনদ উঁচিয়ে পাস করে যাওয়া নয়। এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হলে আমাদের দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই হতে পারে বিশ্বের বহু দেশের কাছে মডেলস্বরূপ। কিন্তু এদেশের শিক্ষার বাস্তব অবস্থা খুব হতাশজনক। আমাদের শিক্ষানীতি, শিক্ষাক্রম সুন্দর, যুগোপযোগী, আকর্ষণীয়। কিন্তু নেই তার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, বাজেট, অবকাঠামো এবং যোগ্য, দক্ষ, সৎ ও উদ্যমী লোকবল।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১১ জুন ,২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
ষান্মাসিক সামষ্টিক মূল্যায়ন জুলাইয়ে: নতুন কারিকুলামের ষষ্ট থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ষান্মাসিক সামষ্টিক মূল্যায়ন আগামী জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হবে। সামষ্টিক এ মূল্যয়ন কোন বিষয়ের কতটুক নেওয়া হবে তা নির্ধারণ করে দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তুক বোর্ড (এনসিটিবি)। আগামী ১২ জুনের মধ্যে শ্রেণি কার্যক্রম চলাকালে নির্ধারিত পাঠ শেষ করতে নির্দেশনাও দিয়েছে এনসিটিবি। নির্ধারিত সময়ে শেষ না করা গেলে প্রয়োজনে অনলাইনে শেষ করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সোমবার (১০ জুন) এনসিটিবি জানায়, গত ৬ জুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য এ ষান্মাসিক সামষ্টিক মূল্যায়ন-২০২৪ এর জন্য নির্ধারিত শিখন অভিজ্ঞতা সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়। নির্দেশনায় বলা হয়, ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ছয় মাসের সামষ্টিক মূল্যায়ন আগামী জুলাই মাসে শুরু হতে যাচ্ছে। দৈবচয়নের ভিত্তিতে সারা দেশের নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেণি কার্যক্রম সম্পন্ন করার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যে পর্যন্ত শিখন কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে সেই পর্যন্ত অভিজ্ঞতাগুলোকে বিবেচনা করে এই সামষ্টিক মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। নির্দেশনায় কোন ক্লাসের কোন বইয়ের কত পৃষ্ঠা পর্যন্ত মূল্যায়ন করা হবে তাও নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত এই পাঠ আগামী ১২ জুনের মধ্যে শেষ করতে বলা হয়। ১২ জুনের পরে ছুটির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে, বন্ধের আগে যদি মূল্যায়নের জন্য নির্ধারিত কোনও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন করা সম্ভব না হয় সেক্ষেত্রে বিকল্প উপায় অবলম্বন করুন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সময়ে বিকল্প উপায়ে পাঠ শেষ করার কথাও বলা হয়েছে। বন্ধের সময় কী কী করতে হবে সেব্যাপারে বন্ধের আগেই শিক্ষার্থীদের সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীর বিকল্প কোন কোন কাজ পর্যবেক্ষণ করে তার পারদর্শিতা যাচাই করা জবে তা জানিয়ে দিতে বলেছে এনসিটিবি।
ইউডি/এজেএস

