অনুমোদন বিহীন ভবনের ফাঁদে রাজধানী ঢাকা
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২৮ জুন, ২০২৪, আপডেট ১৪:৪৫
রাজধানী ঢাকায় অবৈধভাবে প্রচুর ভবন গড়ে উঠছে। এসব ভবন এক একটি মৃত্যু ফাঁদ। শহীদ রানা’র প্রতিবেদন
বাড়ছে নানা দুর্ঘটনা, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: রাজধানী ঢাকায় অবৈধভাবে প্রচুর ভবন গড়ে উঠছে। এসব ভবন এক একটি মৃত্যু ফাঁদ। বিভিন্ন সময়ে এসব ভবন ধসে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন। প্রতি বছর রাজধানীতে বাড়ছে অনুমোদনহীন এসব ভবনের সংখ্যা। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন এলাকায় যারা অনুমোদন নিয়েছেন, এর মধ্যে ৯০ ভাগেরই নেই অকুপেন্সি বা ব্যবহারের সনদ। যার কারণে নকশার বিচ্যুতি করে গড়ে ওঠা এসব ভবনে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। রাজউক থেকে নকশার অনুমোদন একরকম নিলেও সেটি মানা হচ্ছে না।
নিয়ম না মানায় ভবনগুলো একদিকে ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে এগুলো নিয়ে বিরোধ লেগেই আছে। নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত ইমারত (ভবন) নির্মাণে আইন থাকলেও তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেই। ১৯৫২ সালে প্রণীত আইনের আওতায় তৈরি করা হয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা। অথচ, ৫ যুগ পরেও আইনটি বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা সমন্বিত কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। এতে করে সারা দেশেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ প্রবণতা বেড়েই চলেছে।
ঢাকা ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) আওতাধীন এলাকায় প্রতি বছর গড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার ভবন নির্মাণের নকশার অনুমোদন দেওয়া হয়। এর বাইরেও প্রতি বছর শত শত বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে কোনো প্রকার নকশা অনুমোদন ছাড়াই। অনুমোদনবিহীন এসব ভবন একদিকে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে তেমনি বিরোধপূর্ণ। নিয়ম না মানার কারণে ভবনের মালিকরা তাদের খেয়াল-খুশিমতো জায়গা না ছেড়েই ভবন নির্মাণ করছেন। কেউবা রাস্তার জায়গা বা অপরের জায়গার উপর ভবন নির্মাণ করছেন। এসব কারণে বিরোধ লেগেই আছে। বিরোধপূর্ণ এ ধরনের ভবন নিয়ে রাজউকে প্রতিদিনই লিখিত অভিযোগ জমা পড়ছে। রাজউক এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থাও নিচ্ছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজউকের নোটিশের পরেও ভবন নির্মাণের কাজ থেমে নেই, বরং দ্রæত গতিতে চলছে ভবন নির্মাণের কাজ। রাজউক বলছে, এসব ভবনের বিচ্যুতি নিয়ন্ত্রণে বছরে গড়ে ৫ হাজার নোটিশ দেয় তারা। গত বছর রাজউকের পক্ষ থেকে বিচ্যুতি প্রতিরোধে ১ হাজার ৮৯০টি ভবনে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
বৈশ্বিক তালিকায় পিছিয়ে ঢাকা : বাসযোগ্য শহরের বৈশ্বিক তালিকায় আরও পিছিয়ে পড়েছে ঢাকা। বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রকাশিত দ্য গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স-২০২৪ অনুযায়ী, ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান এবার ১৬৮তম। গত বছর ১৬৬তম স্থানে থাকা ঢাকার অবস্থান দুই ধাপ পিছিয়েছে। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা এ তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে। ভিয়েনার চমৎকার অবকাঠামো, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, বিনোদন, এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা শীর্ষস্থান পেতে ভ‚মিকা রেখেছে। এছাড়া কোপেনহেগেন (ডেনমার্ক), জুরিখ (সুইজারল্যান্ড), মেলবোর্ন (অস্ট্রেলিয়া) এবং ক্যালগেরি (কানাডা) রয়েছে পরবর্তী শীর্ষস্থানীয় শহরগুলোর মধ্যে। শীর্ষ দশের মধ্যে এশিয়ার একমাত্র শহর জাপানের ওসাকা, যার অবস্থান নবম। ওসাকার পয়েন্ট ৯৬, আর ঢাকার পয়েন্ট ৪৩। বাসযোগ্যতার দিক থেকে তালিকার একেবারে শেষের দিক থেকে ষষ্ঠ অবস্থানেবাংলাদেশের রাজধানী। ইআইইউ তালিকাটি তৈরি করেছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো এবং পরিবেশসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ভিত্তিতে।

জরিপের তথ্যে ‘ভয়ঙ্কর’ বার্তা: ২০২২ সালে গেজেটভুক্ত হওয়া রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) জরিপের তথ্যমতে, রাজউক এলাকায় প্রায় ২১ লাখ ৪৫ হাজার ভবন রয়েছে। এর মধ্যে একতলা থেকে বহুতলা ভবন রয়েছে ৫ লাখ ১৭ হাজার। এসব ভবনের মধ্যে মাত্র ২ লাখের অনুমোদন রয়েছে, বাকি প্রায় ৩ লাখ ১৭ হাজার ভবনের কোনো অনুমোদন নেই। পাশাপাশি ১৬ লাখের বেশি সেমিপাকা ভবনও অবৈধ। রাজউকের আওতাধীন এলাকা ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৩০৫ বর্গকিলোমিটার, সাভার উপজেলা, কেরানীগঞ্জ উপজেলা, নারায়ণগঞ্জ, ভুলতা ও গাউছিয়া। রাজউক সূত্র বলছে, দুই সিটির ভেতরে যেসব স্থানে অবৈধ ভবন রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে ডেমরা, বসিলা, ঢাকা উদ্যান, কামরাঙ্গীরচর, সারুলিয়া, নাসিরাবাদ, ডুমনি, উত্তরখান, দক্ষিণখান, হরিরামপুর, ভাটারা, বাড্ডা ও পুরান ঢাকা। আর ঢাকার দুই সিটির বাইরে সাভার, কেরানীগঞ্জ, ভুলতা, গাউছিয়া ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় শত শত ভবন অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে। রাজউকের কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই হাউজিং প্রকল্পের নামে কেরানীগঞ্জে অর্ধশত আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে। মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ভবনে বসবাস বা ব্যবহারের আগে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে ব্যবহার বা বসবাস সনদ নিতে হবে। ২০০৮ সালে এই আইন চালুর পর ১০ ভাগ ভবনও এই সনদ নেয়নি বলে জানা যায়।
রাজউকের পদক্ষেপ : রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও মুখপাত্র মো. আশরাফুল ইসলাম সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশে নকশার বিচ্যুতিকরা হয়েছে। রাজউক এলাকায় মাত্র ২ লাখের মতো ভবন তৈরি হয়েছে নকশা অনুমোদন নিয়ে। রাজউকের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, হাজার হাজার অবৈধ ভবন ভেঙে ভবন নির্মাণকাজ শৃঙ্খলায় আনা রাজউকের পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য অবৈধ ভবনগুলোকে বৈধ করে দিতে চায় রাজউক। এজন্য ড্যাপের প্রস্তাব রয়েছে। তার আলোকে একটি নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে।
তারা জানান, অবৈধ ভবনকে বৈধ করতে চারটি ক্যাটাগরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে রাজউক। যারা জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে ভবন নির্মাণ করেছে, তারা স্বল্প পরিমাণ জরিমানা দিয়ে ভবনের অনুমোদন পাবে। আর যাদের বিল্ডিং অনুমোদন ও নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের হার বেশি থাকবে, তাদের জরিমানার পরিমাণ বেশি হবে। পাশাপাশি জলাশয় ভরাট করে নির্মাণ করা ভবন বা অনেক বেশি নিয়ম লঙ্ঘন করা হলে সেখানে কোনো ধরনের নিয়ম অনুসরণ করা হবে না। অন্যদিকে ঢাকার ভবনগুলোর দুর্ঘটনা রোধ ও নকশা অনুযায়ী নির্মাণ নিশ্চিত করতে ‘থার্ড পার্টি এন্ট্রি (টিপিই)’ নিয়োগ দেওয়ার কথা ভাবছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এজন্য সংশ্লিষ্ট সব আইন ও বিধি পর্যালোচনা করে গাইডলাইনও তৈরি করবে সংস্থাটি। রাজউক সূত্রে জানা যায়, টিপিইর মাধ্যমে ভবনের ফিটনেস যাচাই করে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ নয়, ঝুঁকিপূর্ণ, রেট্রোফিটিং বা পুনর্র্নিমাণ করার সুপারিশ করবে। থার্ড পার্টির পরিদর্শকদের রাজউক পরিচয়পত্র দেবে, যা তাদের ইমারত পরিদর্শনের অধিকার দেবে। তবে অনুমোদনহীন ভবনগুলোর ফিটনেস যাচাই করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত রাজউক গ্রহণ করবে। সূত্র আরো জানায়, ভবনসংক্রান্ত রাজউকের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা অথরাইজড অফিসার ও সহকারী অথরাইজড অফিসারের তত্ত¡াবধানে থাকবে ‘থার্ড পার্টি এন্ট্রি’ (টিপিই)। এই কর্মকর্তারা যেকোনো সময় টিপিইদের কার্যক্রম তদারক করতে পারবেন। এসব কার্যক্রম তদারকি কৌশল শেখাতে তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনবে রাজউক।

র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী
ইকো-ফ্রেন্ডলি অবস্থান তৈরি করতে হবে: রাজধানী ঢাকার প্রায় ৯৫ শতাংশ বাড়িঘর অনুমাদনহীন বলে মন্তব্য করেছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। ‘টেকসই শহর তৈরি: বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও বাধা’ শীর্ষক সেমিনারটি আয়োজন করে বিআইআইএসএস। সেমিনারে স্থপতি ইকবাল হাবিবের বরাত দিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেছেন, ঢাকা শহরের প্রায় ৯৫ শতাংশ বাড়িঘর অনুমোদনবিহীন। এ অনুমোদনবিহীন বাড়িঘরগুলোকে যাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অনুমোদনের আওতায় আনা যায়, এজন্য একটি কমিটি আছে। এমন একটি কমিটি আছে, তা গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী হওয়ার আগে আমি জানতামই না। তিনি আরও বলেন, ঢাকাই বাংলাদেশ নয়, ঢাকার বাইরেও বাংলাদেশ আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা যারা ঢাকায় থাকি, তারা ঢাকার বাইরে বাংলাদেশ আছে, সেটা বুঝতে চায় না। এমনকি যারা গ্রামে থাকে তারাও মনে করে ঢাকায় চলে যাওয়া ভালো, ওটাই বাংলাদেশ। তিনি বলেন, নগরায়নকে শুধু বিল্ডিং তোলা এবং কিছু মানুষের বসবাসের সুবিধা ও জীবন-জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করলে চলবে না। নগরায়নের সঙ্গে এখন প্রকৃতির বিস্তৃতির কথাও খেয়াল রাখতে হবে। ইকো-ফ্রেন্ডলি একটি অবস্থান তৈরি করতে হবে।
প্রকৃতিকে ধ্বংস করে দিয়ে নগরায়ন করা হচ্ছে মন্তব্য করে র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী আরো বলেন, নগরায়ন করতে গিয়ে প্রকৃতির কথা খেয়াল রাখা হচ্ছে না। নগরায়নের ক্ষেত্রে শুধু বিল্ডিং তুললেই হবে না, আরো অনেক কিছু দেখতে হবে। আমরা নগরায়নের নামে বুড়িগঙ্গাকে শেষ করে দিয়েছি। শুধু বুড়িগঙ্গা নয়, পুরো পানি ব্যবস্থাটাকেই আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি। এটাকে কিভাবে উদ্ধার করা যায়, সেটাকেও নগরায়নের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা চিন্তা করতে হবে। প্রতিদিন কৃষিজমি নগরায়নের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আমরা নগরায়ন করতে গিয়ে যত কৃষি জমি আছে, যত জলাশয় আছে, সব তো ধ্বংস করে দিয়েছি। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা খুবই কঠিন। তাই বলে বসে থাকলে চলবে না। আমাদের এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এজন্য মহাপরিকল্পনা দরকার।
তিনি বলেন, প্রকৃতি ধ্বংস না করে নগরায়ন করা সম্ভব, শুধু যারা কাজটি করবেন, তাদের মধ্যে দেশপ্রেম থাকতে হবে। তাদের এ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হব, দেশটা তার এবং তার ভবিষ্যৎ বংশধরদের। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মনমানসিকতা থাকতে হবে।
রাজনীতিবিদ ও আমলাদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, আমাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এক জায়গা থেকে সব পরিকল্পনা হওয়া উচিত। সেটা না হলেও অন্তত সমন্বয় থাকা উচিত। আমাদের সবাইকে দেশপ্রেমের জায়গা থেকে বিষয়গুলো দেখা উচিত।
তিনি বলেন, প্রকৃতি ধ্বংসের দায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জাতীয় পার্টির ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। এ কাজটি আমরা সবাই মিলে করেছি। আমরা সবাই মিলে যে দুষ্কর্মটা করেছি, সেই দুষ্কর্ম থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে। নিজেদের দায়িত্বটা সঠিকভাবে পালন করতে হবে।
বাড়ছে বিল্ডিং কোড না মানার প্রবণতা: রাজধানী ঢাকা যেসব বড় সমস্যার মুখে রয়েছে তার ভেতরে আছে বিল্ডিং কোড না মানার প্রবণতা। ভয়াবহ এ প্রবণতার কারণে পুরো ঢাকা শহর এখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। কোনো বিল্ডিংকে যেকোনো ঝুঁকি সহনীয় করে গড়ে তুলতে বিল্ডিং কোডের প্রয়োগ করা হয়। অথচ,ঢাকার জন্য যে বিল্ডিং কোড রয়েছে, তা কৃর্তপক্ষ যথাযথভাবে দেখে না। ভবন নির্মাণে কাঠামো কৌশল,স্থাপত্য কৌশল,ভিত্তি কৌশল,অগ্নি প্রতিরোধ,প্লাম্বিং,তড়িৎ কৌশল,যন্ত্র কৌশল ইত্যাদি বিষয়ে বিল্ডিং কোডে সুস্পষ্টভাবে দিক নির্দেশনা থাকতে হয়। এক্ষেত্রে আইন আছে কাগজে কলমে;বাস্তবে তার দেখা মেলা ভার। ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড অনুসরণের বালাই নেই; জায়গাও ছাড়া হয় না। রানা প্লাজা ধসের পর রাজধানীর ধানমÐি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় একটি টেকনিক্যাল জরিপ চালিয়েছে বুয়েট। জরিপে দেখা যায়,ধানমন্ডি এলাকার ৬৭ শতাংশ ভবনই সাত মাত্রার ভ‚মিকম্প সহনশীল নয়,আর মোহাম্মদপুর এলাকায় তা ৭০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এখন যদি পুরান ঢাকা ও বাসাবো,খিলগাঁও, শাজাহানপুর এলাকায় প্রায় ৮০ শতাংশ ভবনই ভ‚মিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম বিল্ডিং কোড তৈরি করা হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। পরে ২০০৬ সালে এটি পার্লামেন্ট থেকে গেজেট আকারে প্রকাশ পায়,পরিণত হয় আইনে। বিল্ডিং কোডে সব ধরনের ভবনের জন্যই আলো-বাতাস চলাচল করার ব্যবস্থা,নিরাপত্তাব্যবস্থা,ভার বহন ক্ষমতা,নির্মাণপ্রক্রিয়া ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত নীতিমালা উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় বিল্ডিং কোড তথা ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় বলা হচ্ছে- ৭ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের সময় ফায়ার সার্ভিস,পরিবেশ অধিদপ্তর,গ্যাস ও বিদ্যুত বিভাগের ছাড়পত্র নেয়া বাধ্যতামূলক। ১৯৯৩ সালে হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউশনের মাধ্যমে সব পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিল্ডিং কোড প্রণীত হয়,যা মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগের জন্য ২০০৬ সালে আইনগত ভিত্তি পায়। কিন্তু বিল্ডিং কোড প্রয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অদ্যাবধি কোনো প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয় নি।
আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই: কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইমারত নির্মাণ আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই। গেল পাঁচ বছরে মামলা হয়েছে মাত্র ১২টি। এর মধ্যে তদন্তাধীন দুটি আর বিচারাধীন ১০টি মামলা রয়েছে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ইমারত আইনে মাত্র ১২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণখান থানায় ৫টি, কোতোয়ালি থানায় ২টি, বংশালে ১টি, যাত্রাবাড়ীতে ১টি, শ্যামপুরে ১টি, সূত্রাপুরে ১টি, কদমতলীতে ১টি মামলা হয়েছে। বিচার শেষ হয়নি একটিরও। ইমারত নির্মাণ আইনের ৩(ক) ধারায় বলা হয়েছে, ভবন নির্মাণ যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছে সে উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। অর্থাৎ আবাসিক বাড়ির জন্য ভবন নির্মাণের অনুমতি নিলে ওই ভবনকে অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। এতে আরও বলা হয়েছে, আইন ও বিধিমালার ব্যত্যয় করে কেউ ভবন নির্মাণ করলে সরকারের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ সেটি ভেঙে ফেলার বা অপসারণের নির্দেশ দিতে পারবে।
আইন অনুযায়ী ঢাকা মহানগরে বহুতল ভবন নির্মাণে ফায়ার সার্ভিস থেকে ছাড়পত্র নিতে হবে। মূলত ভবনের সামনে সড়কের প্রশস্ততা,নকশা অনুসারে ভবনের অগ্নি নিরাপত্তা পরিকল্পনা,ভবন থেকে বের হওয়ার বিকল্প পথ,কাছাকাছি পানির সংস্থানে গাড়ি ঢুকতে পারবে কিনা- এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করে ছাড়পত্র দেয় ফায়ার সার্ভিস। তারপরই ওই ছাড়পত্র দেখিয়ে রাজউক থেকে ভবনের নকশার অনুমোদন নিতে হয়। এরপর ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করতে হয়। নির্মাণকাজ আংশিক বা পুরোপুরি শেষ হওয়ার পর ভবনটি ব্যবহারের জন্য রাজউকের কাছ থেকে বসবাস বা ব্যবহারের সনদ নিতে হয়। বিদেশে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসসহ সকল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান মেয়রের নিয়ন্ত্রণে থাকে। নগর সরকার গঠন করে নগরের সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নগর সরকারের একক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে রাজউকের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। এজন্যই জাতীয় নির্মাণ বিধি অমান্য করেই ঢাকা মহানগরীতে গড়ে উঠছে ব্যাঙের ছাতার মতো বহুতল ভবন নামের মৃত্যুকূপ।

ইকবাল হাবিব
টেকসই শহর তৈরি বৈশ্বিক অগ্রাধিকার : নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই শহর তৈরি করা বিশ্বব্যাপী একটি হয়ে উঠেছে। দ্রুত নগরায়ন, অবকাঠামোগত অগ্রগতি ও শহরমুখী অভিবাসন বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করেছে, যার ফলস্বরূপ শহরগুলোতে প্রকৃতি, মানব জীবন এবং সম্পদের উপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশের বড় শহরগুলো যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ু-জল-মাটি দূষণ এবং ভ‚মিকম্পের ঝুঁকিতে ভুগছে। পরিকল্পিত এবং টেকসই নগরায়ন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত এবং এসডিজি ১১ এ বর্ণিত এই প্রয়োজনীয়তাকে বাংলাদেশ গুরুত্ব প্রদান করে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ। ২৮ জুন ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণ নেতৃত্বে সরকার সেই লক্ষ্যগুলি বাস্তবায়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং তা অর্জনে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সরকারের এসব প্রচেষ্টার অগ্রভাগে রয়েছে। বক্তা ও প্যানেলিস্টরা নগরায়ণের ফলে উদ্ভূত সমস্যাদি মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং অন্যান্য মহানগরের ক্ষেত্রে গৃহীত সর্বোত্তম কার্যপদ্ধতিগুলো থেকে শিক্ষালাভের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়নের প্রসারের জন্য পরামর্শ প্রদান করেন। নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, অপ্রশস্ত রাস্তা, কেমিক্যাল গোদাম, অপরিকল্পিত ভবনের কারণে সবসময় ঢাকা ঝুঁকিতে থাকে। এই ঝুঁকিমুক্ত হতে সবার আগে ঢাকাবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। পাশাপাশি বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ, রাস্তা প্রশস্ত করা, আধুনিক গ্যাস লাইন ব্যবস্থা, ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী ঢাকা পুনর্গঠন করতে হবে। একইসঙ্গে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে প্রত্যেক ভবনে বসবাসযোগ্য নবায়নযোগ্য সার্টিফিকেট ব্যবস্থা চালু করতে হবে। নিজের বাড়ি ও প্রতিবেশীর বাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বাসিন্দাদের উদ্যোগী হতে হবে। তিনি আরও বলেন, এসব দুর্ঘটনার পেছনে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের গাফিলতি রয়েছে। ঢাকাকে ঝুঁকিমুক্ত করতে রানা প্লাজা ধ্বংসের পর গার্মেন্টস সেক্টর যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, গ্রিন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে বিশ্বের সেরা হয়েছে, সে রকমভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কার্যকরী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে।
ইউডি/এজেএস

