এক বছরের ব্যবধানে দেশে অপরাধ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, সাইবার ক্রাইম: প্রধান টার্গেট নারী
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ৩০ জুন, ২০২৪, আপডেট ১৪:৩০
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় অভিনব কৌশল: বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় পরিবর্তনের সুবাতাস বইছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনের ফলে মানুষের জীবনে শ্রম লাঘব হয়েছে, দূরত্ব ঘুচেছে, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়েছে। তবে তথ্যপ্রযুক্তির এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হচ্ছে এক নতুন ধরনের অপরাধ- যাকে বলা হচ্ছে সাইবার অপরাধ। দুষ্কৃতকারীরা অনলাইনে সাইবার প্রতারণা, অর্থ লোপাট, সাইবার অ্যাটাক, মাদক ও মানবপাচার, পর্নোগ্রাফি, হ্যাকিং, ফিশিং, ম্যালওয়্যার, র্যানসমওয়্যার, ডেটা ব্রিচ, সাইবার বুলিংসহ বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধ করছে। এক বছরের ব্যবধানে দেশে সাইবার অপরাধ বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। সাইবার অপরাধ একটি বাউন্ডারিলেস ক্রাইম। কারণ এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে এক দেশে বসে অপরাধ সংঘটিত করে আরেক দেশের নাগরিকদের ভিকটিম বানানো সম্ভব। তাই প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলছে সাইবার ক্রাইম। এক বছরের ব্যবধানে এ হার দ্বিগুণের বেশি বেড়ে মোট অপরাধের ১১.৮৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সাইবার অপরাধে ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৫৯ শতাংশই নারী। মোট সাইবার অপরাধের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২১.৬৫ শতাংশই হ্যাকিং সংক্রান্ত। ভুক্তভোগীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইনে অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের কারণে নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৭৮.৭৮ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
শনিবার (২৯ জুন) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নসরুল হামিদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে সাইবার অপরাধপ্রবণতা-২০২৪’ এবং ‘স্মার্ট বাংলাদেশ: উদীয়মান প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ (সিক্যাফ)। ‘সিক্যাফ সাইবার অপরাধ প্রবণতা-২০২৪’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে সাইবার অপরাধে যুক্ত হচ্ছে নতুন অপরাধ। গবেষণা জরিপে দেখা গেছে, নতুন ধরনের সাইবার অপরাধ বেড়েছে ২৮১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। আর এটা ঘটছে অসচেতনতার কারণে। বাংলাদেশে ২০২২ সালে সংঘটিত নতুন ধরনের অপরাধের মাত্রায় নিত্যনতুন ও অভিনব কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে সাইবার দুর্বৃত্তরা। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে নানা মাত্রিক প্রতারণা। যেমন চাকরি দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস, ভুয়া অ্যাপে ঋণ দেওয়ার ফাঁদ, সেবা বা পণ্য বিক্রির নামে প্রতারণা ইত্যাদি। ২০২২ সালে ভুক্তভোগীদের ১৪ দশমিক ৬৪ শতাংশই অনলাইনে পণ্য কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। সাইবার অপরাধে শিশু ভুক্তভোগীর হার বেড়েছে ১৪০ দশমিক ৮৭। ভুক্তভোগীদের ৭৫ শতাংশই তরুণ, যাঁদের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। লিঙ্গভিত্তিক তুলনামূলক পরিসংখ্যানে সাইবার অপরাধের ভুক্তভোগীদের মধ্যে নারীদের হার বেশি (৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ)। সিক্যাফ বলছে, ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সাইবার অপরাধে আক্রান্তের হার কমে হয়েছে ১৩.৬৫ শতাংশ। তবে সামাজিক লোক-লজ্জার ট্যাবুতে তা থাকছে অন্তরালেই। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে বাংলাদেশে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়া। সম্প্রতি সিআইডি সদর দপ্তরে ‘স্টুডেন্ট এনগেজমেন্ট টু কমব্যাট সাইবার ক্রাইম’ শীর্ষক সেমিনারের প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

বছরে দেড় লাখ নারী বুলিংয়ের শিকার: সাইবারজগতে অপরাধের শিকার সবচেয়ে বেশি হচ্ছেন নারীরা। গবেষণা বলছে, ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৫৯ শতাংশই নারী। ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহার এবং অনলাইনের বাসিন্দা হতে কিংবা ডিজিটাল জগতে কীভাবে চলতে হবে, সেই সংস্কৃতি গড়ে না ওঠায় নারী ও শিশুদের সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’-সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি নারী সাইবার বুলিং ও অন্যান্যভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ নারীর বয়স ১৮ থেকে ৩০-এর মধ্যে। বাকিরা চল্লিশোর্ধ্ব। আর ভুক্তভোগীদের ৪০ শতাংশ ঢাকা বিভাগ বা ঢাকার আশপাশের বাসিন্দা। বাকি ৬০ শতাংশ নারী অন্যান্য বিভাগের। সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে ‘উইমেন’ সাপোর্ট সেন্টারে ১৫ হাজারের বেশি লিখিত অভিযোগ পড়ে এবং ফোনের মাধ্যমে আরও অভিযোগ পাওয়া যায়। সূত্র জানায়, এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সাইবার আক্রমণ, আইডি হ্যাক, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও করে বø্যাকমেইলিং, ইমপারসোনাল বø্যাকমেইলিং, ছদ্মবেশে হয়রানি, কৌশলে ফোন নম্বর নিয়ে হয়রানি, ক্রেডিট কার্ডে প্রতারণা, বিকাশ প্রতারণা, অনলাইনসহ নানা ধরনের প্রতারণা।
এসব অপরাধের নতুন উপকরণ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটি সাইবার স্পেসে প্রয়োগ করা হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এলআইসি (আড়িপাতা) শাখার পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডবিøউ) ইউনিট সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের শিকার হওয়ার অভিযোগ যারা করেছেন, তাদের মধ্যে ৩৯ শতাংশ নারী। এর মধ্যে ২২ শতাংশ নারী পদক্ষেপ নিলেও ৭৮ শতাংশই কোনো আইনি পদক্ষেপ নেননি। বরং তারা নিজেদের আইডি বন্ধ বা কনটেন্ট (বিষয়বস্তু) মুছে ফেলতেই বেশি আগ্রহী। পিসিএসডবিøউর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত সেবাপ্রত্যাশীদের মধ্যে ৩৫ হাজার ৫২৫ জন নারী সাইবার স্পেসে হয়রানির শিকার হয়ে সহায়তা নিয়েছেন। ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ হাজার ৩০৪টি অভিযোগের মধ্যে ভুয়া আইডির মাধ্যমে তথ্য ফাঁসের অভিযোগ পড়ে ৯ হাজার ৭১৪টি। এর পর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৩১২টি অভিযোগ পাওয়া যায়। ২ হাজার ৫২০ জন আইডি হ্যাকড হওয়ার শিকার, যা মোট অভিযোগের ১৯ শতাংশ। পিসিএসডবিøউর তথ্যমতে, গত এক বছরে যত অভিযোগ পড়েছে, তাতে ভুক্তভোগীর ১৪ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। পুলিশ সদর দপ্তরের এলআইসি শাখার পুলিশ সুপার খালেদা বেগম গণমাধ্যমকে বলেন, ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি ফাঁস হলেও ফেসবুক পেজ, হটলাইন নম্বর ও ই-মেইলে অভিযোগকারী নারীরা ভয়ে ও সামাজিক মর্যাদাহানির আশঙ্কায় ঘটনা গোপন রাখতে চান। আবার হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কায়ও অনেকে কিছু জানাতে চান না।

জুনাইদ আহমেদ পলক
চারটি মূল স্তম্ভ নিয়ে কাজ করছে সরকার: ডিজিটাল বাংলাদেশের যত অগ্রগতি হচ্ছে সাইবার জগতে অপরাধ প্রবণতা এবং ঝুঁকি ততই বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের এক সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে এ তথ্য জানান তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী। পলক বলেন, যতদ্রæত আমরা ডিজিটাইজেশন করেছি ততবেশি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। আমরা ২০১৮ সালে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট সংসদে পাস করেছিলাম। তার পরে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনের তাগিদে এখন নতুন আইন সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০২৩ এটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এরই আলোকে আমরা চারটি মূল স্তম্ভ নিয়ে কাজ করছি। প্রথমত প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি কাউন্সিল রয়েছে। সেখান থেকে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং অন্যান্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। দ্বিতীয় আমাদের যে ফরেন্সিক ল্যাব সেখানেও কাজ হচ্ছে। কোনো অপরাধ সংগঠিত হলে চিহ্নিত করা, অপরাধীদের চিহ্নিত করা এবং তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই বাছাই করার জন্য সেই ডিজিটাল ফরেন্সিক ল্যাব কাজ করছে।
তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের সাইবার রেসপন্স টিম, কাউন্টার টেরোরিজম এবং ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিসহ অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। এরই মধ্যে আমরা ২৩ হাজার (জয়ার সাইট, পর্নোগ্রাফি সাইট) বøক করেছি। ২৪ ঘণ্টা আমাদের বেশ কয়েকটি টিম কাজ করছে। তবে আমরা অনেক অপরাধ প্রতিরোধ করতে পারছি। কিন্তু এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। দেশবাসীকে অনুরোধ করবো তারা যেন ফোন করে তাদের অভিযোগ জানান। ফেক ফেসবুক আইডি খুলে জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ীদের চরিত্র হনন করা হচ্ছে। ইউটিউব চ্যানেল খুলে মানুষের সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এটা বন্ধে মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা পৃথিবীর সমস্যা। যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নতুন মাধ্যমে ভুল তথ্য, ফিশিং, মাসকিংসহ এ ধরনের অপরাধ করা হচ্ছে। অপপ্রচার, গুজব ছড়িয়ে অনেকের প্রাণহানি হচ্ছে, অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেচে নিচ্ছে। সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদদের নামে অপপ্রচার হয়। ছাত্রী, বোন, কন্যাদের অনেক ডিপফেক ভিডিও বানিয়ে অথবা ইমজে ফটোশপ করে অপপ্রচার, মানহানিকর কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যে কারণে অনেক ছাত্র-ছাত্রী, কিশোরীর জীবন দিতে হচ্ছে। এজন্য সময়ের প্রয়োজনে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট করেছি। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে যেন আইনের আশ্রয় নিতে পারে। মন্ত্রী-এমপিদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনাদের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, ইউটিউব চ্যানেল ভেরিফায়েডের জন্য পাঠান, তাহলে আমরা ফেরিফাই করে দেবো। ফলে ফেক আইডি দিয়ে আপনার নামে কেউ অপপ্রচার করতে পারবে না।
আইনের আশ্রয় নেয়ার প্রবণতা কম, নেপথ্যে: অপরাধ বাড়লেও আইনের আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা কম। অপরাধের শিকার অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষ হলেও মাত্র ১২ শতাংশ ভুক্তভোগী সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেন। বাকি ৮৮ শতাংশ ভুক্তভোগী আক্রান্ত হয়েও তা লুকিয়ে রাখেন। যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেন, তাদের মধ্যে ৮১.২৫ শতাংশ সাধারণ ডায়েরি এবং ১৮.৭৫ শতাংশ লিখিত অভিযোগ করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগকারীদের মধ্যে ১২.৫০ শতাংশ মন্তব্য করেননি। ৮৭.৫০ শতাংশ সুফল পাননি। সিক্যাফ’র উদ্যোগে পরিচালিত এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে আইনের আশ্রয় নেওয়ার সংখ্যা দিন দিন কমছে।
২০১৮ সালের জরিপে যেখানে অভিযোগকারীর সংখ্যা ছিল ৬১ শতাংশ, ২০২৩ সালে গিয়ে তা কমে ২০ দশমিক ৮৩ শতাংশে নেমেছে। আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত আইন সম্পর্কে না-জানা (২৪ শতাংশ), এরপরই আছে বিষয়টি গোপন রাখার প্রবণতা (২০ শতাংশ) এবং তিন নম্বর কারণ আইনি ব্যবস্থা নিয়ে উল্টো হয়রানির আশঙ্কার কথা জানিয়েছ ১৮ শতাংশ ভুক্তভোগী। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক পরিসংখ্যান বলছে, সাইবার অপরাধে আক্রান্ত ৭ শতাংশ ভিকটিম অভিযোগ দায়েরের জন্য আইনের দ্বারস্থ হন; ৫৪ শতাংশ ভিকটিম পুলিশের প্রতি নারাজ; ৪৪ শতাংশ মনে করেন, দোষী সাব্যস্ত হওয়া ব্যক্তিকে সঠিক আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করা হতো; ২৩ শতাংশ ভিকটিম পুনরায় হয়রানির ভয়ে আইনের দ্বারস্থ হতে ভয় পান; ২৩ শতাংশ ভিকটিম পত্রিকায় ছাপা হওয়ার ভয়ে আইনি সহায়তা নিতে ভয় পান; ১৭ শতাংশ ভিকটিম তাদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণœ হওয়ার ভয়ে সাইবার হয়রানি সম্পর্কিত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করতে চান না; ৩০ শতাংশ ভিকটিম জানেনই না অনলাইনে যৌন নির্যাতনের শিকার হলে কীভাবে আইনি সহায়তা পেতে পারেন; ২৫ শতাংশ ভিকটিম কোনো ইতিবাচক ফল আসবে না বিধায় কোনো অভিযোগ করতেই চান না।
বড় ধরনের ঝুঁকিতে শিশু-কিশোররা: বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু-কিশোররা। গত পাঁচ বছরে দেশে সাইবার অপরাধে শিশু ভুক্তভোগীর সংখ্যা বেড়েছে দেড় গুণেরও বেশি। সিক্যাফ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে সাইবার অপরাধপ্রবণতা ২০২৩’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্রই। গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, দেশের মোট সাইবার অপরাধ ভুক্তভোগীদের মধ্যে ১৪ দশমিক ৮২ শতাংশের বয়সই ১৮ বছরের কম। ২০১৮ সালে প্রকাশিত সিক্যাফের করা জরিপের তুলনায় যা শতকরা ১৪০ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেশি। মূলত ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে শিশুরা। ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের করা এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যবহার করা শিশুদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ শিশু যেকোনো ধরনের সাইবার নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।
অপরাধের মাত্রা কোন দেশে কেমন: বিশ্বব্যাপী সাইবার ক্রাইমের একটি সূচক সম্প্রতি প্রকাশ করেছে জার্নাল প্লাস ওয়ান। সাইবার ক্রাইমের দিক থেকে তালিকার শীর্ষে রয়েছে রাশিয়া এবং ১০তম স্থানে রয়েছে ইন্ডিয়া। এ ছাড়া তালিকায় উঠে এসেছে ব্রিটেনের নামও। সম্প্রতি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে দেশগুলোর তালিকা প্রকাশ করা হয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল এই গবেষণাটি করে। তিন বছর ধরে প্রথমবারের মতো এই গবেষণাটি করেন গবেষকেরা। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ একটি দল এই গবেষণাটি করে। বিশ্বের দেশগুলোর জাতীয় স্তরে সাইবার অপরাধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলোকে সূচকে চিহ্নিত করে এই গবেষণাটি প্রকাশ করা। এই গবেষণার তালিকায় রাশিয়ার পরেই রয়েছে ইউক্রেন ও চীন, চতুর্থ স্থানে রয়েছে আমেরিকা। নাইজেরিয়া ও রোমানিয়ার মতো দেশকে পেছনে ফেলে অষ্টম স্থানে রয়েছে ব্রিটেন। সা¤প্রতিক সাইবার ক্রাইমের কার্যকলাম নিয়ে প্রকাশিত এই তালিকায় ১০তম স্থানে রয়েছে ইন্ডিয়া। সাইবার ক্রাইম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও তদন্তের একটি বৈশ্বিক জরিপে অংশ নেন বিশেষজ্ঞরা।

তানভীর হাসান জোহা
সচেতনতায় জোর ও আইন সংশোধনের তাগিদ: সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যে বিষয়টিতে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা উচিত তা হচ্ছে, সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। জনসচেতনতা তৈরির কাজে রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তি সবার দায় আছে। ব্যক্তিকে যেমন তার পারিবারিক পর্যায় থেকে জনসচেতনতা তৈরির কাজ করতে হবে, পরিবারের কেউ ভুক্তভোগী হলে তার পাশে থেকে সহানুভ‚তির হাত বাড়িয়ে তার ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কাজ করে যেতে হবে, ঠিক তেমনি রাষ্ট্রকে ব্যাপক আকারে এই সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে কাজ করতে হবে। সাইবার অপরাধ করা সহজ হলেও নতুন আইনে অপরাধীকে ধরা ও অপরাধ প্রমাণও কঠিন হয়ে গেছে। সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় তাই ব্যক্তি পর্যায়েই সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনের কিছু ধারা সংশোধনের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিটিআরসি’র (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যক্তিগতভাবে যত সচেতনতা বাড়ানো যাবে ততই কমানোর সম্ভব এই সাইবার ক্রাইম। নতুন যে সাইবার নিরাপত্তা আইন হয়েছে, তার বেশ কিছু ধারার সংশোধন করা প্রয়োজন রয়েছে। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির গেøাবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্নেন্স (জি.এস.জি) বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ এ. হুসেইন বলেন, সাইবার হামলা এমন হয়ে গেছে যে, পিওর বলে আর কিছু থাকছে না। আমাদের সচেতনতার সঙ্গে দরকার অ্যাটেনশন।

দৈনিক উত্তরদিক্ষণ । ৩০ জুন ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, সাইবারজগতে আর্থিক প্রতারণার মূল কারণ ভুয়া এনআইডি দিয়ে বিকাশ, নগদ ও রকেট অ্যাকাউন্ট খোলা। ফলে তাকে নির্ণয় করা কঠিন হয়ে যায়। তাই অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক হতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ কথা অনস্বীকার্য যে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দায় আসলে সবার। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাইকে সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সবার সম্মিলিত দৃঢ় প্রতিরোধই পারে এই অপরাধকে নিয়ন্ত্রণ করতে।
(প্রতিবেদনটি করেছেন আসাদ এফ রহমান, শহীদ রানা, সাদিত কবির, আরাফাত রহমান ও আশিকুর রহমান)
ইউডি/এজেএস

