ধুম্রজালের জালে কি বন্দী ইন্ডিয়া ঋণের প্রকল্প!
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ১৬ মার্চ, ২০২৫, আপডেট ১৪:২০
ইন্ডিয়ান ঋণে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলির বেশিরভাগেরই কাজ স্থবির, কারণ দেশটির পক্ষ থেকে যথাযথ অনুমোদন ও চিঠির জবাব আসছে না।
একদিকে কমেছে অর্থছাড়, অন্যদিকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতিও মিলছে না। প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে, এবং অনেক প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি নেই। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার একদিকে কমিটমেন্ট চার্জ গুনছে, অন্যদিকে প্রকল্পের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্পটির জন্য ইন্ডিয়ান এক্সিম ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন এখনও পাওয়া যায়নি। এতে প্রকল্পটির কাজ শুরু করা দূরের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) মাত্র আট কোটি ডলারের মতো অর্থছাড় করেছে ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়ার গুচ্ছ ঋণ বা লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় এই অর্থ দিচ্ছে দেশটি।
অনেক ক্ষেত্রে, এই প্রকল্পগুলির জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া, চূড়ান্ত অনুমোদন, কিংবা অর্থছাড়ের প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য, সম্প্রতি বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়ান প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এর ফলস্বরূপ কিছু প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাতিল হওয়া প্রকল্প: বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কয়েকটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে তিনটি রেলওয়ে প্রকল্প রয়েছে: বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ, পার্বতীপুর-কাউনিয়া রেলপথ নির্মাণ,খুলনা-দর্শনা রেলপথ নির্মাণ।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য থেকে এই চিত্র পাওয়া গেছে। এদিকে এলওসির অর্থে নেওয়া প্রকল্পগুলো যাচাই-বাছাই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য দুই দেশের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।
গত আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেশ কয়েকটি প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে আশুগঞ্জ-আখাউড়া চার লেনের সড়কের ইন্ডিয়ান ঠিকাদার কর্মীদের নিয়ে দেশে ফিরে যান। ফলে চার মাসের মতো প্রকল্পটির কাজ বন্ধ ছিল। এমন আরও কয়েকটি প্রকল্প আছে, যেখানে ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন কিংবা কাজের গতি কমে গেছে। এসব কারণে মূলত এলওসির অর্থছাড় কমে গেছে বলে মনে করেন ইআরডি কর্মকর্তারা। বর্তমানে ইন্ডিয়ান ঋণে পরিবহন ও অবকাঠামো খাতের আটটি প্রকল্প চলমান আছে।
ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাই-জানুয়ারি এই সাত মাসে এলওসির আওতায় মাত্র ৮ কোটি ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার ছাড় করেছে। এ সময়ে দেশটি নতুন ঋণের কোনো প্রতিশ্রুতিও দেয়নি। গত অর্থবছরের পুরো সময়ে যত অর্থছাড় হয়েছে, চলতি অর্থবছরের সাত মাসে ওই অর্থের চার ভাগের এক ভাগ ছাড় হয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ইন্ডিয়া এলওসি ঋণের প্রকল্প বাস্তবায়নে অনেক সময় লাগে। প্রত্যেক এলওসিতে ১৫ – ১৬টা করে প্রকল্প থাকে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করতে অনেক সময় নেয় বাংলাদেশ। আবার বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিযোগ আছে, এতগুলো প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি একসঙ্গে করা সম্ভব না। এখানে সক্ষমতার বিষয় জড়িত। ফলে ইন্ডিয়ান প্রকল্পে অর্থছাড় অনেক কম।
কোন বছর কত এল
গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বশেষ তিন বছরে ৩০ কোটি ডলারের বেশি অর্থছাড় করেছে ইন্ডিয়া। ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশটির এক্সিম ব্যাংক ৩১ কোটি ১৪ লাখ ডলার ছাড় করেছে। এর আগের দুই অর্থবছরে যথাক্রমে ৩৩ কোটি ৭০ লাখ ও ৩২ কোটি ৯৩ লাখ ডলার ছাড় হয়েছে। কোভিডের প্রথম দুই অর্থবছরে অর্থছাড় বেশ কম ছিল। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৪ কোটি ১১ লাখ ডলার দিয়েছিল, তার আগের বছরে ছাড় হয়েছিল ১৪ কোটি ৮ লাখ ডলার।
প্রকল্প তালিকা যাচাই-বাছাই হবে
তিনটি এলওসিতে সড়ক ও রেল যোগাযোগ, জ্বালানি, রাস্তাঘাট নির্মাণসহ অবকাঠামো খাতে এ পর্যন্ত ৩৬টি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি শেষ হয়েছে। চলমান আছে আটটি প্রকল্প। বাকি ১৩টি প্রকল্প পরামর্শক ও ঠিকাদার নিয়োগ কিংবা প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরির পর্যায়ে রয়েছে। এখন এসব প্রকল্প যাচাই-বাছাই করার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ।
ঋণ পরিশোধ ও শর্ত নিয়ে যেখানে উদ্বেগ
পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মো. মামুন -আল- রশিদ বলেন, ইন্ডিয়ান এলওসি ঋণের প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আবার এর ফলে সরকারি তহবিলের অর্থের অপচয় হচ্ছে। তাই এর থেকে বের হওয়া আমাদের জন্য মঙ্গলজনক। ঋণের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ার মূল কারণ হলো- বিভিন্ন পর্যায়ে ইন্ডিয়ান কর্তৃপক্ষের সম্মতি আদায়ে সময়ক্ষেপণ হওয়া। আমব্রেলা প্রকল্পে কারণে ঋণের প্রকল্পে গ্রেস পিরিয়ড ও ঋণ পরিশোধের সময়ও পাওয়া যায় না। অন্যদিকে ঠিকাদার ও পণ্য সামগ্রী ইন্ডিয়া থেকে নেওয়া বাধ্যতামূলক।
এলওসি চুক্তি অনুযায়ী, ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ এলওসি ঋণ পরিশোধ করতে বাংলাদেশ সময় পাবে ২০ বছর। তবে কোনো একটি এলওসির প্রথম অর্থছাড় থেকেই গ্রেস পিরিয়ড ও পরিশোধ শুরু হয়ে যায়। ফলে এলওসির বেশিরভাগ ঋণের পরিশোধের সময় খুবই কম পাচ্ছে বাংলাদেশ।
উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, দ্বিতীয় এলওসির প্রথম অর্থছাড় অনুযায়ী, ঋণ পরিশোধের সময় শেষ হবে ২০৩৮ সালের ৯ অক্টোবর। ২০ বছরের পরিশোধ সময়ের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫ বছর সময় চলে গেছে। কিন্তু, এপর্যন্ত ২০০ কোটি ডলারের সামান্যই (৫১ কোটি ৮৮ লাখ ডলার) ছাড় হয়েছে।
তৃতীয় এলওসির ঋণ পরিশোধ নিয়েও প্রতিক‚ল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ। কোনো প্রকল্পের কাজ শেষ না হলেও সুদ, আসল ও কমিটমেন্ট ফি দিতে হচ্ছে সরকারকে।
চুক্তিতে ঋণ পরিশোধের সমস্যা
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে সই হওয়া তৃতীয় এলওসির তালিকাভুক্ত ১৩ প্রকল্পের কোনটিই শেষ হয়নি। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত তৃতীয় এলওসির অর্থ ছাড় হয়েছে মাত্র ৫১ কোটি ৩১ লাখ ডলার। এরমধ্যে ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় আসল পরিশোধ দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। আসলের সঙ্গে সুদ ও কমিটমেন্ট ফি বাবদ সরকার ইতোমধ্যে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ (১৩ মিলিয়ন) ডলার পরিশোধ করেছে। এ অবস্থায় তৃতীয় এলওসির কোনো অর্থ যদি এখন ছাড় হয়, তাহলে ঋণের গ্রেস পিরিয়ডের সুবিধা পাওয়া যাবে না, আবার ঋণ পরিশোধেও ২০ বছরের কম সময় পাবে বাংলাদেশ।
টেকনিক্যাল কমিটি
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, এলওসি থেকে যেসব প্রকল্প বের হবে— তা আরো যাচাই-বাছাইয়ে দুই দেশের একটি কারিগরি কমিটি কাজ করবে। যেমন কিছু প্রকল্পে বাস্তবায়ন শুরু হলেও— পরামর্শক নিয়োগসহ বিভিন্ন কারণে নির্মাণ কাজ শুরু করা যায়নি। সম্ভাব্য সমাধান বের করতে এসব প্রকল্প আরও বিশদ পর্যালোচনা করা হবে। এক্ষেত্রে ইআরডি, ইন্ডিয়ান হাইকমিশন, দেশটির এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধি এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো এই টেকনিক্যাল কমিটিতে থাকবে।
অর্থনৈতিক প্রভাব: এই প্রকল্পগুলির জেরে কমিটমেন্ট চার্জের পাশাপাশি খরচও বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকল্পগুলির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে ঋণ এবং সুদের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
অন্য প্রকল্পগুলির অগ্রগতি
অন্যদিকে, ঋণে আরও কিছু প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও তার অবস্থাও আশাব্যঞ্জক নয়। বিশেষ করে, আখাউড়া-আগরতলা রেলপথ এবং খুলনা-মোংলা রেলপথের প্রকল্পগুলোতেও কার্যক্রম ঠিক মতো এগিয়ে যাচ্ছে না। এই প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সমঝোতা
ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশ এখন একমত হয়েছে যে, কয়েকটি প্রকল্প বাতিল করা হবে এবং অন্যান্য প্রকল্পের ভবিষ্যত নির্ধারণের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এই বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বাংলাদেশের সরকারের জন্য সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, এবং দেশীয় অর্থায়নের বিকল্প পথ খোঁজা হচ্ছে।
ইউডি/ আরকে

