ট্রাম্পের শুল্ককাণ্ড-আমেরিকার ইতিহাসে নজিরবিহীন: কোন পথে বিশ্ববাণিজ্য, বাংলাদেশ এখন কী করবে?
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৫, আপডেট ১৬:৪৫
বাণিজ্যযুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ছে, অস্থিরতা তুঙ্গে
আসাদুজ্জামান: আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক ঘোষণার ফলে বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নেমেছে। আমেরিকার ইতিহাসে নজিরবিহীন এই শুল্কনীতির জেরে ২০২৫ সালে বিশ্ববাণিজ্য প্রায় ১ শতাংশ কমতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপে বাণিজ্যযুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ছে। এরই মধ্যে শেয়ারবাজার, মুদ্রাবাজার ও স্বর্ণবাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের বিভিন্ন নেতা ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন। আমেরিকার বাজারে প্রবেশ করা সব আমদানি পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ হারে বেসলাইন ট্যারিফ বা সাধারণ শুল্ক এবং বাংলাদেশসহ অর্ধশতাধিক দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে উচ্চ শুল্কহার আরোপ করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শনিবার (০৫ এপ্রিল) থেকে মার্কিন বন্দরগুলোতে আসা সব আমদানি পণ্যের ওপর থেকে ১০ শতাংশ হারে সাধারণ শুল্ক কেটে নেওয়া শুরু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৫৭টি বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর উচ্চ শুল্কহার আগামী সপ্তাহ থেকে কার্যকর হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বজনস্বীকৃত শুল্ক হারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রায় ১০০ বছরের রেকর্ড ভেঙে গত বুধবার হোয়াইট হাউস থেকে সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়। ট্রাম্পের আগের মেয়াদে হোয়াইট হাউসের বাণিজ্য উপদেষ্টা কেলি অ্যান শ বলছেন, তার জীবদ্দশায় এত বড় আর বিস্তৃত একক বাণিজ্য পদক্ষেপ দেখেননি। বিশ্বের প্রতিটি দেশের সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কে বিরাট ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এটি। ‘রিসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ’ নামে ট্রাম্পের আগ্রাসী শুল্কনীতি বিশ্ববাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এর ফলে বড় বড় প্রায় সব শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে; তেল-সোনাসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ব্যাপক দরপতন হয়েছে। বিশ্ববাণিজ্যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আমেরিকার অর্থনীতি চাঙা করতে এই পাল্টা শুল্কারোপ করার দাবি করেছেন ট্রাম্প।
মার্কিন প্রশাসনের জন্য শত শত বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আনতে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে জানান। আমেরিকার শুল্ক কর্মকর্তারা শনিবার (০৫ এপ্রিল) থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফাভাবে আরোপিত নতুন ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক সংগ্রহ শুরু করেছেন। মার্কিন সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ও শুল্ক গুদামে এই বেসলাইন বা ন্যূনতম শুল্ক কার্যকর হয় স্থানীয় সময় শনিবার রাত ১২টা ১ মিনিটে। প্রথম ধাপে ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা, মিশর ও সৌদি আরব। তবে যেসব পণ্য শনিবার রাত ১২টা ১ মিনিটের আগে প্লেন বা জাহাজে করে আমেরিকার পথে রওয়ানা দিয়েছে, তাদের জন্য ৫১ দিনের একটি ‘গ্রেস পিরিয়ড’ রাখা হয়েছে। এসব পণ্যকে ২৭ মে’র মধ্যে পৌঁছাতে হবে, তা না হলে নতুন শুল্কের আওতায় পড়বে। পরবর্তী ধাপে আগামী বুধবার (০৯ এপ্রিল) থেকে শুরু হবে আরও উচ্চমাত্রার শুল্কগুলো-১১ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত।
আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ
আরেফিন বাঁধন: আমেরিকার শুল্ক আরোপের বিষয়ে দেশটির সঙ্গে আলোচনা করেই একটা ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেনটেটিভ খলিলুর রহমান। তিনি বলেছেন, ব্যাপারটা আকস্মিক নয়, আমরা এর জন্য প্রস্তুত। শনিবার (০৫ এপ্রিল) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে এক ব্রিফিংয়ে খলিলুর রহমান এ কথা বলেন। এর আগে মার্কিন শুল্ক আরোপ নিয়ে যমুনায় বৈঠক হয়।খলিলুর রহমান বলেন, এটা আমাদের জন্য আকস্মিক কোনো বিষয় না। ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই আমেরিকা সরকারের সঙ্গে বৈঠক করতে বলেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। সেই সূত্রে তিনি (খলিলুর) ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সপ্তাহে ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র দপ্তরের অনেকের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তখন থেকে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ক্রমাগত এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, সুতরাং ব্যাপারটা আকস্মিক নয়, আমরা এর জন্য প্রস্তুত। শিগগিরই আমরা একটা ব্যবস্থা নেব এবং সেটা মার্কিন প্রশাসনের সাথে আলোচনা করেই নেব।

বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেনটেটিভ খলিলুর রহমান
এদিকে, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেছেন, সংকট কাটাতে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায় সরকার। তিনি বলেন, আমেরিকার আরোপ করা শুল্ক ইস্যুতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই দেশটির প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, আমদানি বৃদ্ধির মাধ্যমে মার্কিন আমেরিকার সঙ্গে ঘাটতি কমানোর প্রচেষ্টা করা হবে।
বৈঠক শুরুর আগে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, বাংলাদেশের রপ্তানি কমবে না, বরং আরও বাড়বে। শফিকুল আলম বলেন, আশা করি আমাদের রেসপন্স ইতিবাচক হবে। এখন যা রপ্তানি হচ্ছে এর থেকে আরও বাড়বে এবং সেভাবেই পদক্ষেপ নেয়া হবে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বাংলাদেশ রপ্তানি করে এমন সব দেশেই রপ্তানি বাড়বে। এ বিষয়ে প্রেস সচিব বলেন, প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে আজ বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসেছিল। তাদের তিনঘণ্টা বৈঠক হয়েছে। সেখানে রপ্তানিকারকদের বক্তব্যকেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। সার্বিক বিষয় নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার জরুরি বৈঠকে অর্থ, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব, প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি প্রেস সচিব, এনবিআর চেয়ারম্যানসহ শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
শুল্ক কমাতে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ
দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানোর লক্ষ্যে আমেরিকার আরোপিত শুল্ক কমাতে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। শনিবার (০৫ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নিজ কার্যালয়ে আমেরিকার আরোপিত শুল্ক ও ঢাকা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন নিয়ে বৈঠকে এ পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। এতে উপস্থিত ছিলেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকনোমিক মডেলিং (সানেম) এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান।
বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, আমরা ভেবেছিলাম চীনের ওপর ট্রাম্প প্রশাসন বাড়তি শুল্ক আরোপ করায় দেশে বিনিয়োগ বাড়বে। এখন আমাদের ওপরও শুল্ক বসিয়েছে। আমরা বলেছি, এত শুল্ক থাকলে আমাদের দেশে বিনিয়োগ আসবে না। বৈঠকে ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এহসান দ্রুতই সরকারের পক্ষ থেকে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন। সানেম’র নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, আমরা বলেছি- সরকারকে দ্রুতই একটা ইতিবাচক বার্তা দিতে। আমরা কিছু পরামর্শও দিয়েছি কিভাবে দ্রুতই এসব পদক্ষেপ নেওয়া যায়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিনিদের ট্রাম্পের আশ্বাস: এটি একটি অর্থনৈতিক বিপ্লব, আমরা জিতব
আবদুল্লাহ সিফাত: আমদানি করা পণ্যের ওপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত একতরফা শুল্ক শনিবার থেকেই আদায় শুরু করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। স্বাভাবিকভাবেই চলতি সপ্তাহ থেকেই আমেরিকার বাজারে বিদেশি পণ্যের দাম বহু গুণে বেড়ে যাচ্ছে। তবে শুল্কের কারণে বর্তমানে দাম বাড়লেও ভবিষ্যতে আমেরিকার অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে-আশ্বাস দিয়ে নাগরিকদের কঠোর ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন ট্রাম্প।
শনিবার (০৫ এপ্রিল) ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে একটি পোস্টে লিখেছেন, আমেরিকার চেয়ে চীনের অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছে, যা আমেরিকার ধারেকাছেও নয়। তারা ও অন্যান্য অনেক দেশ আমাদের সাথে অস্থিতিশীলভাবে খারাপ আচরণ করেছে। আমরা বোকা এবং অসহায় হয়ে চাবুকের আঘাত পাওয়ার অবস্থানে ছিলাম, কিন্তু এখন আর নেই। মার্কিনিদের ভবিষ্যতের সফলতারি আশ্বাস দিয়ে ট্রাম্প লিখেছেন, প্রশাসন আগের মতো চাকরি ও ব্যবসা ফিরিয়ে আনছে। এটি একটি অর্থনৈতিক বিপ্লব এবং আমরা জিতব। শক্ত করে ধরে থাকুন কিন্তু শেষ ফলাফল হবে ঐতিহাসিক।
পাল্টা শুল্ক ঘোষণা : বিকল্প বাজার খুঁজবে চীন
কিফায়েত সুস্মিত :আমেরিকায় নিজেদের পণ্য প্রবেশে বাড়তি শুল্কারোপের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে পাল্টা শুল্ক ঘোষণা করেছে চীন। নিজেদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন স্বার্থ নিরাপদ রাখতে নানা ধরনের শক্তিশালী পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে বেইজিং। আমেরিকার শুল্কের বিরুদ্ধে ঘোষিত সরকারের নীতির আলোকে শনিবার (০৫ এপ্রিল) চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই কথা জানিয়েছে। ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন। চীনের ওপর আরোপ করা হয় অতিরিক্ত ৩৪ শতাংশ শুল্ক, যা ৯ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে। ফলে এখন চীন থেকে কোনো পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করতে গুনতে হবে ৫৪ শতাংশ শুল্ক। ট্রাম্পের বাড়তি শুল্ক ঘোষণার পর গত শুক্রবার আমেরিকার যেকোনো পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত ৩৪ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করে চীন। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ তীব্রতর হলো।

গুও জিয়াকুন
শনিবার সকালে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, পুঁজিবাজার কথা বলতে শুরু করেছে। সঙ্গে তিনি শুক্রবার আমেরিকার পুঁজিবাজারের দরপতনের একটি ছবি যুক্ত করেন। শনিবার এক বিবৃতিতে চীনের স্বাস্থ্যসেবা ও বস্ত্র থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিকস খাতের বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠন এক বিবৃতিতে এক জোট হয়ে আমেরিকার বিকল্প বাজার খোঁজার ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আমেরিকার মূল্যস্ফীতিকে আরও ভয়াবহ করবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
পাল্টা পদক্ষেপ নিয়ে কী ভাবছে দেশগুলো
আমেরিকার প্রায় সব বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর বহুল আলোচিত পাল্টা শুল্কারোপ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতির বিদ্যমান ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়ে বাণিজ্যযুদ্ধের সূত্রপাত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে যেকোনো ধরনের বাণিজ্যযুদ্ধ এড়িয়ে চলতে চান বলে অভিমত দিয়েছেন শুল্কের আওতাধীন কয়েকটি দেশের নেতারা। ভিন্নমতও রয়েছে অনেক দেশের।

জোনাথন রেনল্ডস
আমেরিকার মিত্রদেশ ব্রিটেনের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্কারোপ করেছেন ট্রাম্প। জবাবে দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী জোনাথন রেনল্ডস বলেন, ওয়াশিংটন এখনও তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র। দেশটির আরোপিত শুল্কের প্রভাব কমাতে ব্রিটেন একটি বাণিজ্যচুক্তি করতে আগ্রহী। রেনল্ডস বলেন, কেউই বাণিজ্যযুদ্ধ চায় না, আমাদের উদ্দেশ্য একটি চুক্তি নিশ্চিত করা।’ তবে বিকল্প পদক্ষেপ নিয়েও প্রস্তুতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সবকিছুই করবে ব্রিটেন প্রশাসন।
অনেকটা একই সুরে কথা বলেছেন আমেরিকার আরেক মিত্র জাপান। শুল্কারোপের বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার কথা জানিয়েছেন জাপানের প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব ইয়োশিমাসা হায়াশি। তিনি বলেন, প্রতিশোধমূলক কোনো পদক্ষেপ আমেরিকা-জাপানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই উদ্যোগ না আমেরিকার অর্থনীতির জন্য ফলপ্রসূ হবে, না যেসব দেশের ওপর শুল্কারোপ করা হয়েছে তাদের কোনো কাজে আসবে। এক ফেসবুক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী মেলোনি বলেন, বাণিজ্যযুদ্ধ ঠেকাতে শুল্কারোপের বিষয়ে একটি সমঝোতায় আসতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে তার প্রশাসন। অন্যদিকে, ট্রাম্পের আরোপিত ১০ শতাংশ শুল্কের জবাবে পাল্টা শুল্কারোপের কথা জানিয়েছে ব্রাজিল প্রশাসন। দেশটির পার্লামেন্টে এ সম্পর্কিত একটি বিলও পাশ করা হয়েছে বলে এপির খবরে বলা হয়েছে। একই পথে হাঁটতে চলেছেন কানাডার নতুন প্রধানমন্ত্রী ম্যাক কার্নি। তিনিও পাল্টা শুল্কারোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। হোয়াইট হাউস ঠিকঠাকভাবে হিসাব না করেই শুল্কারোপ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।
অষ্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্থনি আলবানিজ বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই শুল্কারোপ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, তবে ক্যানবেরা কোনো পাল্টা পদক্ষেপ নেবে না।আলবানিজ বলেন, ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি পাল্টা শুল্কারোপ করবেন। অষ্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, তা সত্তে¡ও তিনি ১০ শতাংশ শুল্কারোপ করেছেন, এটি হওয়ার কথা ছিল শূন্য। ট্রাম্প যেটি করেছেন, সেটি কোনো বন্ধুসুলভ আচরণ হতে পারে না। নিউজল্যান্ডের বাণিজ্যমন্ত্রী টড ম্যাকক্লেও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে তারা ২০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করেননি। তবে তারা কোনো পাল্টা পদক্ষেপ নেবেন না।
আইএমএফ’র সতর্কবার্তা: বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ‘ঝুঁকি’তৈরি করেছে
রিন্টু হাসান: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক বাস্তবায়ন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি’ তৈরি করেছে। কারণ বিশ্বব্যাপী আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীরা তাদের শেয়ার বিক্রির ফলে শেয়ার বাজারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিভা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধকে আরো তীব্র করা এড়িয়ে চলা আমেরিকা এবং তার বাণিজ্যিক অংশীদারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ক্রিস্টালিনা জর্জিভা
তিনি বলেছেন, আমরা এখনো ঘোষিত শুল্ক ব্যবস্থার সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করছি, তবে ধীর প্রবৃদ্ধির সময়ে এগুলো স্পষ্টতই বিশ্বব্যাপী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির প্রতিনিধিত্ব করে। বিশ্ব অর্থনীতির আরো ক্ষতি করতে পারে এমন পদক্ষেপ এড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আমেরিকা ও তার বাণিজ্যিক অংশীদারদের কাছে বাণিজ্য উত্তেজনা নিরসন এবং অনিশ্চয়তা কমাতে গঠনমূলকভাবে কাজ করার আবেদন করছি।
গত বুধবার ট্রাম্প তার ঘোষিত ‘মুক্তি দিবসে’ শুল্ক নীতি প্রকাশ করেন। তার এই নীতির ফলে প্রায় প্রতিটি দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি কর আরোপ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ার এবং বিশ্বের অন্যান্য আর্থিক কেন্দ্রগুলোতে শেয়ারের দাম ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি কমেছে। শুক্রবারও শেয়ারের দরপতন অব্যাহত ছিল। এদিন জাপানের নিক্কেই সূচক প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে, সপ্তাহের শেষে ৯ শতাংশ কমেছে, যেখানে টোকিওর টপিক্স ৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পিতে ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। ব্যাংকিং শেয়ারের দাম সবচেয়ে বেশি পতনের মধ্যে ছিল এশিয়া-কেন্দ্রিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। এর দর কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ। শুক্রবার তেলের আন্তর্জাতিক মানদø ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৬৭ দশমিক ৪৮ ডলারে নেমে এসেছে। এটি ২০২১ সালের ডিসেম্বরের শুরুর পর থেকে সর্বনিম্ন স্তর।
বাণিজ্য অস্থিরতা দুর্বল এবং দরিদ্রদের ক্ষতি করবে: আঙ্কটাড
অনেক জল্পনা-কল্পনার পর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে পণ্য আমদানিতে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। কয়েকটি দেশের ওপর সর্বনি¤œ ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছেন তিনি। গত বুধবার (০২ এপ্রিল) আমেরিকায় আমদানিকৃত প্রায় সব পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ ‘বেসলাইন কর’ ঘোষণা করে তার পারস্পরিক শুল্ক পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। এর ফলে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য যুদ্ধ যেমন তীব্র আকার ধারণ করেছে, তেমনি উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির পাশাপাশি দেখা দিয়েছে আমেরিকা এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হওয়ার আশঙ্কাও।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের শুল্ক বৃদ্ধির এ পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের সৃষ্টির পর এ বিষয়ে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিটিএডি-আঙ্কটাড) বলেছে, বর্ধিত বৈশ্বিক বাণিজ্য শুল্ক সবচেয়ে দুর্বল এবং দরিদ্র মানুষদের ক্ষতি করবে। শনিবার (০৫ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এক প্রতিবেদনে এ খবর প্রকাশ করে। আঙ্কটাডের মহাসচিব রেবেকা গ্রিনস্প্যান এক বিবৃতিতে বলেছেন, এর ফলে বাণিজ্য অস্থিরতা ‘দুর্বল এবং দরিদ্রদের ক্ষতি করবে। বাণিজ্য যেন অস্থিরতার আরেকটি উৎস হয়ে না ওঠে। এটি উন্নয়ন এবং বিশ্বব্যাপী প্রবৃদ্ধির জন্য কাজ করবে।
গত বুধবার (২ এপ্রিল) ট্রাম্প বেশ কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, যার ফলে চীনও প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করে। অন্যান্য দেশও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিচ্ছে। যা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। গ্রিনস্প্যান আরও বলেছেন, আজকের চ্যালেঞ্জগুলো প্রতিফলিত করার জন্য বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য নিয়মগুলো বিকশিত হতে হবে। তিনি বলেছেন, এখন সহযোগিতার সময়, উত্তেজনা বৃদ্ধির নয়।
বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১% কমবে: ডব্লিউটিও
আমেরিকার আগ্রাসী শুল্কনীতির কারণে চলতি বছর বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ শতাংশ কমবে বলে এরই মধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মহাপরিচালক এনগোজি ওকনজো-ইওয়ালা। এর ফলে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের ফলে বিশ্ব ব্যবস্থা একটি শুল্ক যুদ্ধের চক্রে ঘুরপাক খাবে বলে এক বিবৃতিতে তিনি সতর্ক করেন।

বিশ্ব বাণিজ্যের বিশাল অংশ ডব্লিউটিওর ‘মোস্ট ফেবারড ন্যাশন (এমএফএন)’ শর্তের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের ৭৪% বাণিজ্য এখন এই শর্ত মেনে হয়, যা বছরের শুরুতে ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে এই হার কমে গেছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৬ এপ্রিল, ২০২৫ । প্রথম পৃষ্ঠা
ডবিøউটিওর সব সদস্যকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, এত বড় পরিসরের বাণিজ্যিক পদক্ষেপ বড় উত্তেজনা তৈরি করবে। কিন্তু সেই চাপ দায়িত্বশীলতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে। বাণিজ্য বিরোধ ঠেকিয়ে উন্মুক্ত ও পূর্বাভাসযোগ্য বাণিজ্য পরিবেশের জন্য সংলাপের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ডব্লিউটিও গঠিত হয়। গঠনমূলক আলোচনার জন্য এই ফোরামকে ব্যবহার করে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
ইউডি/এজেএস

