মাছ ধরতে বাঁধ কাটায় ডুবছে আমন বীজতলা
উত্তরদক্ষিণ। শুক্রবার, ২৫ জুলাই, ২০২৫, আপডেট ১০:০০
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় মাছ ধরার জন্য বাঁধ কেটে দিয়েছে একটি প্রভাবশালী চক্র। ফলে জোয়ারের পানিতে চাষাবাদ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কৃষকের। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন তিনটি গ্রামের বাসিন্দারা। অপরদিকে বাঁধ সংকুচিত করে মাছ ধরার কারণে জলাবদ্ধতায় পড়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার তিন গ্রামের মানুষ।
জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় জনসাধারণের জানমাল রক্ষায় মুক্তিযুদ্ধের আগে বেড়িবাঁধ নির্মিত হয় পটুয়াখালীর কলাপাড়ায়। নানা ঝড়-ঝঞ্ঝা সামলে টিকে আছে সেই বেড়িবাঁধ। গত জুনের শেষ সপ্তাহে জলাবদ্ধতার নিরসনের নাম করে উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নের দশকানি গ্রামে বাঁধের একটি অংশ কেটে দেওয়া হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে জাহাঙ্গীর মাদবর ও হোসেনের লোকজন শুরুতে ১০-১২ হাত বাঁধ কেটে ফেলেন। জলাবদ্ধতার নিরসনের কথা বলা হলেও মূলত বাঁধটি কাটা হয়েছে জাল পেতে মাছ ধরায় সুবিধার জন্য।
স্থানীয় বাসিন্দা রহমান মৃধা, মনির মৃধা ও শাহজাহান মোল্লাসহ কয়েকজন জানান, ওই বেড়িবাঁধটি সড়ক হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। লোকজনের কাছে যা ওয়াপদার রাস্তা হিসেবে পরিচিত। লালুয়ার বানাতিবাজারে আসা-যাওয়ার জন্য দশকানি, মনির গুঠিয়া ও ছনখোলা গ্রামের মানুষ ব্যবহার করেন। বেড়িবাঁধ কেটে দেওয়ার জায়গাটি বাড়তে বাড়তে ২৫-৩০ হাত চওড়া হয়েছে। খালের মতো হয়ে যাওয়ায় সেখান দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে সব ডুবে যায়। তলিয়ে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে বীজতলা।
গতকাল বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে কথা হয় লালুয়া ইউপির ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য মহসিন হাওলাদারের সঙ্গে। তাঁর ভাষ্য, বেড়িবাঁধ কাটার কোনো নিয়ম নেই। পানি নামানোর কথা বলে মাসখানেক আগে ওই বাঁধটি কেটে দেওয়া হয়েছে। ১০-১২ দিন সেখান দিয়ে যোগাযোগ বন্ধ ছিল। পরে তিনি একটি গাছ দিয়ে সাঁকো তৈরি করেন। এখন সেটি দিয়েও চলাচল করা যায় না। কাটা জায়গা বেড়ে খাল হয়ে গেছে। কয়েকজন পড়ে আহতও হয়েছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে বাঁধটি ঠিক না করলে শত শত একর জমির আমন চাষাবাদ বন্ধ হয়ে যাবে।
বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনের দাবি, জলাবদ্ধতা নিরসনে জনগণ দাবি জানিয়েছিল। পানি নামানোর জন্যই কাটা হয়েছে। প্রয়োজন হলে এখন ঠিক করে দেবেন।
পাউবো কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শাহ আলম ভূঁইয়ার কাছে ওই বাঁধ কাটার সংবাদ পৌঁছায়নি। তিনি বলেন, এমন কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি।
ভারপ্রাপ্ত ইউএনও ইয়াসীন সাদেক বলেন, যারা জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন করবেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারা বিষয়টি জানতে তদন্ত করবেন।
রামগতির রাতাচোরা খালের প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশে মাছ শিকারের জন্য পানিপ্রবাহ সংকুচিত করেছে স্থানীয় কিছু লোক। এ কারণে টানা বর্ষণের পানি নামতে পারছে না। এতে জলাবদ্ধতার মুখে পড়েছে উপজেলার চর আলগী ইউনিয়নের চর সেকান্দর, চর পোড়াগাছা ও চর নেয়ামত গ্রাম। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, বীজতলা তলিয়ে গেছে।
সরেজমিন রাতাচোরা খালের স্লুইস গেট এলাকা থেকে গোঁট্টার খাল পর্যন্ত শতাধিক পয়েন্টে দুই পাশ থেকে বাঁধ দিয়ে মাছ শিকার করতে দেখা গেছে কিছু লোককে। তারা লোথা জাল, বেহুন্দী জাল ও বেল জাল বসিয়ে মাছ শিকার করছেন।
চর আলগী ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শাখায়েত উল্যাহ বলেন, এসব এলাকার বেশির ভাগ মানুষই প্রধানত জেলে ও ইটভাটার শ্রমিক। এই মৌসুম তারা বেকার অবস্থায় থাকেন। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা না করে তারা মাছ শিকারে ব্যস্ত। বাজারে এসব মাছের চাহিদা বেশি থাকায় লোভ সামলাতে পারছেন না তারা।
উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. সৌরভ-উজ-জামান বলেন, খালে বাঁধ দিয়ে শিকারিরা নিষিদ্ধ লোতাজাল, বেহুন্দী জাল ও বেলজাল দিয়ে মাছ ধরছেন। নিষিদ্ধ জাল ও বাঁধ অপসারণে শিগগিরই তারা যৌথ অভিযান চালাবেন।
ইউএনও সৈয়দ আমজাদ হোসেনের ভাষ্য, পানিপ্রবাহ বন্ধ করে মাছ শিকারের সুযোগ নেই। এসব অপসারণে দ্রুত অভিযান চালানো হবে।
ইউডি/কেএস

